পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভায় তীব্র বিতর্কের মধ্যে পাস হয়েছে ওবিসি (অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী) সংরক্ষণ কাঠামো সংশোধনের দুটি বিল। সোমবার (২৯ জুন) পাস হওয়া এই বিল দুটির মাধ্যমে ২০১০ সালের আগের ওবিসি তালিকা পুনর্বহাল করা হয়েছে। এর ফলে রাজ্যের মোট ওবিসি সংরক্ষণ কোটা ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ডজন ডজন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, যার মধ্যে ৬৫টিই প্রান্তিক মুসলিম সম্প্রদায়।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অনগ্রসর ও বঞ্চিত মুসলিম জনগোষ্ঠীর সামাজিক-অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ওপর এক বড় আঘাত এসেছে। রাজ্য বিধানসভায় 'স্টেট ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস কমিশন (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬' এবং 'ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (রিজার্ভেশন অফ ভ্যাকেন্সিস ইন সার্ভিসেস অ্যান্ড পোস্টস) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬' নামে দুটি বিতর্কিত সংশোধনী বিল পাস হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টের ২০২৪ সালের একটি রায়কে কার্যকর করার অজুহাতে এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলো। নতুন এই আইনি কাঠামোর কারণে রাজ্যের ওবিসি তালিকা থেকে এক ধাক্কায় ৬টি মুসলিম সম্প্রদায়কে বাদ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তালিকাভুক্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের সংখ্যা ৭৭ থেকে কমে মাত্র ১২-তে এসে দাঁড়িয়েছে।
নতুন এই সংশোধিত আইন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে এখন ওবিসি ক্যাটাগরিতে মাত্র ৬৬টি জনগোষ্ঠী টিকে রইল। এর মধ্যে ৫৪টি হিন্দু সম্প্রদায় এবং মাত্র ১২টি মুসলিম সম্প্রদায়।
ওবিসি তালিকার ইতিহাস
পশ্চিমবঙ্গে ওবিসি সংরক্ষণ ব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল মূলত মন্ডল কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে। তৎকালীন জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিকভাবে ৬৬টি সম্প্রদায়কে অনগ্রসর হিসেবে চিহ্নিত করে ওবিসি তালিকাভুক্ত করেছিল। দীর্ঘ বছর ধরে এটাই ছিল রাজ্যের সংরক্ষণের মূল ভিত্তি।
পরবর্তীতে ২০১০ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বামফ্রন্ট সরকার এই তালিকা ব্যাপক সম্প্রসারিত করে আরও ৪২টি নতুন সম্প্রদায়কে যুক্ত করে, যার ফলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৮-এ। একই সাথে ওবিসি ক্যাটাগরিকে দুটি উপ-ভাগে ভাগ করা হয়— ওবিসি-এ (১০% সংরক্ষণ) এবং ওবিসি-বি (৭% সংরক্ষণ)। তৎকালীন সরকার সামাজিকভাবে অনগ্রসর মুসলিমদের জন্য সরকারি চাকরিতে ১০ শতাংশ সংরক্ষণের ঘোষণা দেয়। সেই ১০৮টি সম্প্রদায়ের মধ্যে ৫৩টিই ছিল মুসলিম জনগোষ্ঠী।
২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) সরকার ক্ষমতায় আসার পরও এই সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া জারি থাকে। ২০১২ সালে রাজ্য সরকার আরও ৩৫টি সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল সরকারের যৌথ উদ্যোগে চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছিল ১১৩টি উপ-গোষ্ঠী, যার মধ্যে ৭৭টি ছিল মুসলিম এবং ৩৬টি ছিল হিন্দু সম্প্রদায়।
যে রায়ের ভিত্তিতে এই বিপর্যয়
উগ্র ডানপন্থী ও স্বার্থান্বেষী মহলের পক্ষ থেকে ওবিসি তালিকায় মুসলিমদের অন্তর্ভুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে দীর্ঘদিন ধরে আদালতে মামলা চালানো হচ্ছিল। ২০২৪ সালের মে মাসে কলকাতা হাইকোর্ট এক রায়ে ২০১০ এবং ২০১২ সালের সম্প্রসারণের সময় অন্তর্ভুক্ত হওয়া ৭৭টি সম্প্রদায়ের ওবিসি মর্যাদা বাতিল করে দেয়। আদালতের দাবি ছিল, এই সম্প্রদায়গুলোকে ওবিসি মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি ও পদ্ধতিগত নিয়ম সঠিকভাবে মানা হয়নি।
যদিও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালত শুধু আইনি প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিগত ত্রুটিকেই সামনে এনেছে, কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়কে নয়; কিন্তু বাস্তবে এর মাশুল গুনতে হচ্ছে রাজ্যের বঞ্চিত মুসলিম সমাজকেই। আদালতের এই রায়ের ফলে ২০১০ সালের পর ইস্যু করা প্রায় ১২ লাখ ওবিসি শংসাপত্র (Certificate) সরাসরি প্রভাবিত হয়েছে। তবে যারা ইতিমধ্যে এই সংরক্ষণের আওতায় চাকরি পেয়েছেন, তাদের চাকরি সুরক্ষার কথা বলা হলেও নতুন চাকরিপ্রার্থীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের মুখে পড়েছে।
সংশোধনে যা কিছু পরিবর্তন হলো
নতুন দুটি বিল পাসের মাধ্যমে রাজ্য সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১০ সালের আগের ৬৬টি সম্প্রদায়ের তালিকায় ফিরে গেছে। এর ফলে প্রান্তিক মুসলিমদের জন্য বরাদ্দকৃত ‘ওবিসি-এ’ ক্যাটাগরি এবং এর আওতাধীন ১০ শতাংশ কোটা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেল। ফলে রাজ্যের মোট ওবিসি কোটা ১৭% থেকে কমে ৭% হয়েছে।
এর আগে পশ্চিমবঙ্গের মোট সংরক্ষণ ব্যবস্থা ছিল— তপশিলী জাতি (SC) ২২%, তপশিলী উপজাতি (ST) ৬%, ওবিসি-এ ১০%, ওবিসি-বি ৭% এবং প্রতিবন্ধী কোটা ৩%। ওবিসি-এ বাতিলের ফলে রাজ্যের সামগ্রিক চাকরি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে সংরক্ষণের পরিধি ১০ শতাংশ কমে গেল।
যে ১২টি মুসলিম সম্প্রদায় টিকে রইল
সংশোধিত তালিকায় যে ১২টি মুসলিম সম্প্রদায় ওবিসি মর্যাদা ধরে রাখতে পেরেছে, তারা ২০১০ সালের অনেক আগে থেকেই তালিকায় ছিল এবং তারা কেন্দ্রীয় ওবিসি তালিকারও অন্তর্ভুক্ত। এদের মধ্যে রয়েছে জোলা বা জুলাহা (তাঁতি), ফকির বা সাঁই (সুফি ঐতিহ্যবাহী), রাইন বা কুঞ্জরা (সবজি বিক্রেতা), নাই বা হাজ্জাম (নাপিত), ধুনিয়া বা মনসুরি (তুলা ও লেপ-তোশক কর্মী), কসাই বা কুরেশি (মাংস ব্যবসায়ী), শাহ বা শাহজি, শেরশাবাদিয়া, চডুলি মুসলিম, পাহাড়িয়া মুসলিম এবং ওস্তাগর।
অধিকার বঞ্চিত ৬৫টি মুসলিম সম্প্রদায়
তালিকা থেকে বাদ পড়া ৬৫টি মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে অন্যতম হলো— হালদার, মুসলিম সানপুই, মুসলিম মালি, ঘোষী (মুসলিম), মুসলিম দর্জি, ইদ্রিসী, মুসলিম রাজমিস্ত্রি, মুসলিম বাতিয়ারা, মুসলিম মোল্লা এবং ঢালী (মুসলিম)। উল্লেখ্য, এই সম্প্রদায়গুলোর অনেকে উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও মধ্যপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোতে এখনও ওবিসি হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি ও সুবিধা পাচ্ছে, অথচ পশ্চিমবঙ্গে তাদের বঞ্চিত করা হলো।
বঞ্চিত সম্প্রদায়ের ক্ষোভ ও উদ্বেগ
অনগ্রসর মুসলিমদের এই অধিকার হরণের ঘটনায় রাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। একটি অনগ্রসর মুসলিম সংগঠনের প্রতিনিধি অত্যন্ত হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, "এই সম্প্রদায়গুলোর হাজার হাজার দরিদ্র শিক্ষার্থী এবং চাকরিপ্রার্থীরা এই সংরক্ষণের ওপর ভরসা করে বুক বেঁধেছিল। এই সিদ্ধান্তের পর তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত।"
মুর্শিদাবাদের এক বিশিষ্ট মুসলিম সমাজসেবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "খাতার কলমে আমাদের ওবিসি স্ট্যাটাস কেড়ে নিলেই কি আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা রাতারাতি দূর হয়ে যাবে? বহু মানুষ মনে করছেন, তাদের পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।" মুসলিম মানবাধিকার কর্মীরা দাবি তুলেছেন, সুবিধা বাতিলের আগে এই জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত অবস্থা মূল্যায়নের জন্য অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ ও নতুন সমীক্ষা চালানো হোক।
বিষয় : ভারত পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু

বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুলাই ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভায় তীব্র বিতর্কের মধ্যে পাস হয়েছে ওবিসি (অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী) সংরক্ষণ কাঠামো সংশোধনের দুটি বিল। সোমবার (২৯ জুন) পাস হওয়া এই বিল দুটির মাধ্যমে ২০১০ সালের আগের ওবিসি তালিকা পুনর্বহাল করা হয়েছে। এর ফলে রাজ্যের মোট ওবিসি সংরক্ষণ কোটা ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ডজন ডজন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, যার মধ্যে ৬৫টিই প্রান্তিক মুসলিম সম্প্রদায়।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অনগ্রসর ও বঞ্চিত মুসলিম জনগোষ্ঠীর সামাজিক-অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ওপর এক বড় আঘাত এসেছে। রাজ্য বিধানসভায় 'স্টেট ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস কমিশন (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬' এবং 'ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (রিজার্ভেশন অফ ভ্যাকেন্সিস ইন সার্ভিসেস অ্যান্ড পোস্টস) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬' নামে দুটি বিতর্কিত সংশোধনী বিল পাস হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টের ২০২৪ সালের একটি রায়কে কার্যকর করার অজুহাতে এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলো। নতুন এই আইনি কাঠামোর কারণে রাজ্যের ওবিসি তালিকা থেকে এক ধাক্কায় ৬টি মুসলিম সম্প্রদায়কে বাদ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তালিকাভুক্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের সংখ্যা ৭৭ থেকে কমে মাত্র ১২-তে এসে দাঁড়িয়েছে।
নতুন এই সংশোধিত আইন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে এখন ওবিসি ক্যাটাগরিতে মাত্র ৬৬টি জনগোষ্ঠী টিকে রইল। এর মধ্যে ৫৪টি হিন্দু সম্প্রদায় এবং মাত্র ১২টি মুসলিম সম্প্রদায়।
ওবিসি তালিকার ইতিহাস
পশ্চিমবঙ্গে ওবিসি সংরক্ষণ ব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল মূলত মন্ডল কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে। তৎকালীন জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার প্রাথমিকভাবে ৬৬টি সম্প্রদায়কে অনগ্রসর হিসেবে চিহ্নিত করে ওবিসি তালিকাভুক্ত করেছিল। দীর্ঘ বছর ধরে এটাই ছিল রাজ্যের সংরক্ষণের মূল ভিত্তি।
পরবর্তীতে ২০১০ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বামফ্রন্ট সরকার এই তালিকা ব্যাপক সম্প্রসারিত করে আরও ৪২টি নতুন সম্প্রদায়কে যুক্ত করে, যার ফলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৮-এ। একই সাথে ওবিসি ক্যাটাগরিকে দুটি উপ-ভাগে ভাগ করা হয়— ওবিসি-এ (১০% সংরক্ষণ) এবং ওবিসি-বি (৭% সংরক্ষণ)। তৎকালীন সরকার সামাজিকভাবে অনগ্রসর মুসলিমদের জন্য সরকারি চাকরিতে ১০ শতাংশ সংরক্ষণের ঘোষণা দেয়। সেই ১০৮টি সম্প্রদায়ের মধ্যে ৫৩টিই ছিল মুসলিম জনগোষ্ঠী।
২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) সরকার ক্ষমতায় আসার পরও এই সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া জারি থাকে। ২০১২ সালে রাজ্য সরকার আরও ৩৫টি সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল সরকারের যৌথ উদ্যোগে চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছিল ১১৩টি উপ-গোষ্ঠী, যার মধ্যে ৭৭টি ছিল মুসলিম এবং ৩৬টি ছিল হিন্দু সম্প্রদায়।
যে রায়ের ভিত্তিতে এই বিপর্যয়
উগ্র ডানপন্থী ও স্বার্থান্বেষী মহলের পক্ষ থেকে ওবিসি তালিকায় মুসলিমদের অন্তর্ভুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে দীর্ঘদিন ধরে আদালতে মামলা চালানো হচ্ছিল। ২০২৪ সালের মে মাসে কলকাতা হাইকোর্ট এক রায়ে ২০১০ এবং ২০১২ সালের সম্প্রসারণের সময় অন্তর্ভুক্ত হওয়া ৭৭টি সম্প্রদায়ের ওবিসি মর্যাদা বাতিল করে দেয়। আদালতের দাবি ছিল, এই সম্প্রদায়গুলোকে ওবিসি মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি ও পদ্ধতিগত নিয়ম সঠিকভাবে মানা হয়নি।
যদিও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালত শুধু আইনি প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিগত ত্রুটিকেই সামনে এনেছে, কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়কে নয়; কিন্তু বাস্তবে এর মাশুল গুনতে হচ্ছে রাজ্যের বঞ্চিত মুসলিম সমাজকেই। আদালতের এই রায়ের ফলে ২০১০ সালের পর ইস্যু করা প্রায় ১২ লাখ ওবিসি শংসাপত্র (Certificate) সরাসরি প্রভাবিত হয়েছে। তবে যারা ইতিমধ্যে এই সংরক্ষণের আওতায় চাকরি পেয়েছেন, তাদের চাকরি সুরক্ষার কথা বলা হলেও নতুন চাকরিপ্রার্থীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের মুখে পড়েছে।
সংশোধনে যা কিছু পরিবর্তন হলো
নতুন দুটি বিল পাসের মাধ্যমে রাজ্য সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১০ সালের আগের ৬৬টি সম্প্রদায়ের তালিকায় ফিরে গেছে। এর ফলে প্রান্তিক মুসলিমদের জন্য বরাদ্দকৃত ‘ওবিসি-এ’ ক্যাটাগরি এবং এর আওতাধীন ১০ শতাংশ কোটা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেল। ফলে রাজ্যের মোট ওবিসি কোটা ১৭% থেকে কমে ৭% হয়েছে।
এর আগে পশ্চিমবঙ্গের মোট সংরক্ষণ ব্যবস্থা ছিল— তপশিলী জাতি (SC) ২২%, তপশিলী উপজাতি (ST) ৬%, ওবিসি-এ ১০%, ওবিসি-বি ৭% এবং প্রতিবন্ধী কোটা ৩%। ওবিসি-এ বাতিলের ফলে রাজ্যের সামগ্রিক চাকরি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে সংরক্ষণের পরিধি ১০ শতাংশ কমে গেল।
যে ১২টি মুসলিম সম্প্রদায় টিকে রইল
সংশোধিত তালিকায় যে ১২টি মুসলিম সম্প্রদায় ওবিসি মর্যাদা ধরে রাখতে পেরেছে, তারা ২০১০ সালের অনেক আগে থেকেই তালিকায় ছিল এবং তারা কেন্দ্রীয় ওবিসি তালিকারও অন্তর্ভুক্ত। এদের মধ্যে রয়েছে জোলা বা জুলাহা (তাঁতি), ফকির বা সাঁই (সুফি ঐতিহ্যবাহী), রাইন বা কুঞ্জরা (সবজি বিক্রেতা), নাই বা হাজ্জাম (নাপিত), ধুনিয়া বা মনসুরি (তুলা ও লেপ-তোশক কর্মী), কসাই বা কুরেশি (মাংস ব্যবসায়ী), শাহ বা শাহজি, শেরশাবাদিয়া, চডুলি মুসলিম, পাহাড়িয়া মুসলিম এবং ওস্তাগর।
অধিকার বঞ্চিত ৬৫টি মুসলিম সম্প্রদায়
তালিকা থেকে বাদ পড়া ৬৫টি মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে অন্যতম হলো— হালদার, মুসলিম সানপুই, মুসলিম মালি, ঘোষী (মুসলিম), মুসলিম দর্জি, ইদ্রিসী, মুসলিম রাজমিস্ত্রি, মুসলিম বাতিয়ারা, মুসলিম মোল্লা এবং ঢালী (মুসলিম)। উল্লেখ্য, এই সম্প্রদায়গুলোর অনেকে উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও মধ্যপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোতে এখনও ওবিসি হিসেবে আইনগত স্বীকৃতি ও সুবিধা পাচ্ছে, অথচ পশ্চিমবঙ্গে তাদের বঞ্চিত করা হলো।
বঞ্চিত সম্প্রদায়ের ক্ষোভ ও উদ্বেগ
অনগ্রসর মুসলিমদের এই অধিকার হরণের ঘটনায় রাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। একটি অনগ্রসর মুসলিম সংগঠনের প্রতিনিধি অত্যন্ত হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, "এই সম্প্রদায়গুলোর হাজার হাজার দরিদ্র শিক্ষার্থী এবং চাকরিপ্রার্থীরা এই সংরক্ষণের ওপর ভরসা করে বুক বেঁধেছিল। এই সিদ্ধান্তের পর তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত।"
মুর্শিদাবাদের এক বিশিষ্ট মুসলিম সমাজসেবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "খাতার কলমে আমাদের ওবিসি স্ট্যাটাস কেড়ে নিলেই কি আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা রাতারাতি দূর হয়ে যাবে? বহু মানুষ মনে করছেন, তাদের পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।" মুসলিম মানবাধিকার কর্মীরা দাবি তুলেছেন, সুবিধা বাতিলের আগে এই জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত অবস্থা মূল্যায়নের জন্য অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ ও নতুন সমীক্ষা চালানো হোক।

আপনার মতামত লিখুন