শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

প্রকৌশলী থেকে বিশ্বনন্দিত সুফি সাধক হয়ে ওঠার এক অনন্য জীবনগাথা

আধ্যাত্মিকতার আলোকবর্তিকা: মাওলানা জুলফিকার আহমদ নকশবন্দী রহ.


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

আধ্যাত্মিকতার আলোকবর্তিকা: মাওলানা জুলফিকার আহমদ নকশবন্দী রহ.

আধুনিক যুগে ইলমে দ্বীন এবং তাসাউফের (আধ্যাত্মিকতা) সমন্বয়ে যে কজন মনীষী বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন, হযরত মাওলানা জুলফিকার আহমদ নকশবন্দী (রহ.) ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর জীবন ছিল সুন্নাহর এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি এবং পথহারা মানুষের জন্য হিদায়াতের আলো।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি

​হযরত পীর সাহেব (রহ.) ১৯৫৩ সালের ১লা এপ্রিল পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের ঝাং (Jhang) জেলায় একটি দ্বীনদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে অত্যন্ত পবিত্র পরিবেশে। বিশেষ করে তাঁর মহীয়সী মাতা ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার এবং তাহাজ্জুদগুজার। মায়ের এই আধ্যাত্মিক প্রভাবই তাঁর জীবনের বুনিয়াদ গড়ে দিয়েছিল।

​শিক্ষা জীবন: বিজ্ঞান ও দ্বীনের অপূর্ব সমন্বয়

​পীর সাহেবের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। তিনি একাধারে আধুনিক বিজ্ঞান এবং প্রাচীন দ্বীনি শিক্ষায় পারদর্শী ছিলেন:

  • পার্থিব শিক্ষা: তিনি ১৯৭২ সালে বি.এস.সি (ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে কর্মজীবনে তিনি একজন অত্যন্ত সফল ‘চিফ ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
  • ধর্মীয় শিক্ষা: ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার পাশাপাশি তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে আলেম কোর্সের কিতাবসমূহ (যেমন: শরহে মায়েতে আমেল) এবং বুখারী শরীফের দরস গ্রহণ করেন। ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালীন তিনি পবিত্র কুরআন হিফজ সম্পন্ন করার গৌরব অর্জন করেন। তাঁর পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ 'জামিয়া রহমানিয়া' ও 'জামিয়া কাসিমুল উলূম' তাঁকে আলেম কোর্সের সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান করে।

​তাসাউফ ও আধ্যাত্মিক সাধনা

​পীর সাহেবের আধ্যাত্মিক সফর শুরু হয় ছাত্রজীবন থেকেই।

  • প্রথমিক যোগসূত্র: প্রথমে তিনি সিলসিলা-এ-নকশবন্দিয়ার বুজুর্গ মাওলানা সৈয়দ জাওয়ার হোসেন (রহ.)-এর সাথে যুক্ত হন এবং ইমাম রব্বানি মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)-এর মাকতুবাত পাঠ করেন।
  • বায়াত ও খিলাফত: ১৯৮০ সালে তিনি বিখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক হযরত মুর্শিদে আলম খাজা গোলাম হাবিব নকশবন্দী মুজাদ্দেদী (রহ.)-এর হাতে বায়াত হন। মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৮৩ সালে তিনি খেলাফত ও ইজাজত লাভ করেন। মুর্শিদের মৃত্যুর পর তিনি বিশ্বজুড়ে নকশবন্দিয়া তরিকার প্রচার ও প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন।

​উল্লেখযোগ্য কর্ম ও অবদান

  • আধুনিক শিক্ষিতদের দ্বীনমুখী করা: পীর সাহেবের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো তিনি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং পেশাজীবীদের (ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার) মাঝে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর সংস্পর্শে এসে হাজার হাজার আধুনিক শিক্ষিত মানুষ তাসাউফ ও সুন্নাহর পথে ফিরে এসেছেন।
  • সুন্নাহর অনুসরণ: তিনি ছিলেন সুন্নাহর কট্টর অনুসারী। মাওলানা মুফতি জামিল আহমদ থানভী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে থেকে তিনি জীবনের প্রতিটি কাজে সুন্নতের আমল আয়ত্ত করেছিলেন।
  • বিশ্বব্যাপী দাওয়াত: তিনি আমেরিকা, ক্যানাডা, ইউরোপ এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ সফর করে মানুষের আত্মশুদ্ধির কাজ করেছেন। বিশেষ করে আফ্রিকার দেশ জাম্বিয়ার 'মসজিদে ওমর'-এ টানা ১৫ বছর তিনি রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন।
  • উলামায়ে দেওবন্দের প্রতি মহব্বত: তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের উসূল ও আদর্শের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ভারতের অনেক বড় বড় আলেম ও শিক্ষক তাঁর হাতে বায়াত হয়ে আধ্যাত্মিক ফয়েজ হাসিল করেছেন।

​চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য

​তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে, বিনয়ী এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর প্রতিটি বয়ান ও দরস ছিল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। মানুষের অন্তরের ব্যাধি দূর করে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ে দেওয়াই ছিল তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য।

​ইন্তেকাল

​দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর (কিডনিজনিত সমস্যার কারণে ডায়ালাইসিস নিতে হতো) এই মহান মনিষী ১৪ই ডিসেম্বর ২০২৫ সকালে পাকিস্তানের লাহোরে ইন্তেকাল করেন। ১৫ই ডিসেম্বর তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং হাজার হাজার ভক্ত ও উলামায়ে কেরাম তাঁকে চোখের জলে বিদায় জানান।

হযরত মাওলানা জুলফিকার আহমদ নকশবন্দী (রহ.) ছিলেন এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি প্রমাণ করেছেন যে আধুনিক পেশায় থেকেও আল্লাহর ওলি হওয়া সম্ভব। তাঁর জীবন আমাদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।

বিষয় : পাকিস্তান ইসলাম

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


আধ্যাত্মিকতার আলোকবর্তিকা: মাওলানা জুলফিকার আহমদ নকশবন্দী রহ.

প্রকাশের তারিখ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫

featured Image

আধুনিক যুগে ইলমে দ্বীন এবং তাসাউফের (আধ্যাত্মিকতা) সমন্বয়ে যে কজন মনীষী বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন, হযরত মাওলানা জুলফিকার আহমদ নকশবন্দী (রহ.) ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর জীবন ছিল সুন্নাহর এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি এবং পথহারা মানুষের জন্য হিদায়াতের আলো।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি

​হযরত পীর সাহেব (রহ.) ১৯৫৩ সালের ১লা এপ্রিল পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের ঝাং (Jhang) জেলায় একটি দ্বীনদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে অত্যন্ত পবিত্র পরিবেশে। বিশেষ করে তাঁর মহীয়সী মাতা ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার এবং তাহাজ্জুদগুজার। মায়ের এই আধ্যাত্মিক প্রভাবই তাঁর জীবনের বুনিয়াদ গড়ে দিয়েছিল।

​শিক্ষা জীবন: বিজ্ঞান ও দ্বীনের অপূর্ব সমন্বয়

​পীর সাহেবের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। তিনি একাধারে আধুনিক বিজ্ঞান এবং প্রাচীন দ্বীনি শিক্ষায় পারদর্শী ছিলেন:

  • পার্থিব শিক্ষা: তিনি ১৯৭২ সালে বি.এস.সি (ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে কর্মজীবনে তিনি একজন অত্যন্ত সফল ‘চিফ ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
  • ধর্মীয় শিক্ষা: ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার পাশাপাশি তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে আলেম কোর্সের কিতাবসমূহ (যেমন: শরহে মায়েতে আমেল) এবং বুখারী শরীফের দরস গ্রহণ করেন। ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালীন তিনি পবিত্র কুরআন হিফজ সম্পন্ন করার গৌরব অর্জন করেন। তাঁর পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ 'জামিয়া রহমানিয়া' ও 'জামিয়া কাসিমুল উলূম' তাঁকে আলেম কোর্সের সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান করে।

​তাসাউফ ও আধ্যাত্মিক সাধনা

​পীর সাহেবের আধ্যাত্মিক সফর শুরু হয় ছাত্রজীবন থেকেই।

  • প্রথমিক যোগসূত্র: প্রথমে তিনি সিলসিলা-এ-নকশবন্দিয়ার বুজুর্গ মাওলানা সৈয়দ জাওয়ার হোসেন (রহ.)-এর সাথে যুক্ত হন এবং ইমাম রব্বানি মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)-এর মাকতুবাত পাঠ করেন।
  • বায়াত ও খিলাফত: ১৯৮০ সালে তিনি বিখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক হযরত মুর্শিদে আলম খাজা গোলাম হাবিব নকশবন্দী মুজাদ্দেদী (রহ.)-এর হাতে বায়াত হন। মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৮৩ সালে তিনি খেলাফত ও ইজাজত লাভ করেন। মুর্শিদের মৃত্যুর পর তিনি বিশ্বজুড়ে নকশবন্দিয়া তরিকার প্রচার ও প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন।

​উল্লেখযোগ্য কর্ম ও অবদান

  • আধুনিক শিক্ষিতদের দ্বীনমুখী করা: পীর সাহেবের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো তিনি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং পেশাজীবীদের (ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার) মাঝে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর সংস্পর্শে এসে হাজার হাজার আধুনিক শিক্ষিত মানুষ তাসাউফ ও সুন্নাহর পথে ফিরে এসেছেন।
  • সুন্নাহর অনুসরণ: তিনি ছিলেন সুন্নাহর কট্টর অনুসারী। মাওলানা মুফতি জামিল আহমদ থানভী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে থেকে তিনি জীবনের প্রতিটি কাজে সুন্নতের আমল আয়ত্ত করেছিলেন।
  • বিশ্বব্যাপী দাওয়াত: তিনি আমেরিকা, ক্যানাডা, ইউরোপ এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ সফর করে মানুষের আত্মশুদ্ধির কাজ করেছেন। বিশেষ করে আফ্রিকার দেশ জাম্বিয়ার 'মসজিদে ওমর'-এ টানা ১৫ বছর তিনি রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন।
  • উলামায়ে দেওবন্দের প্রতি মহব্বত: তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের উসূল ও আদর্শের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ভারতের অনেক বড় বড় আলেম ও শিক্ষক তাঁর হাতে বায়াত হয়ে আধ্যাত্মিক ফয়েজ হাসিল করেছেন।

​চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য

​তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে, বিনয়ী এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর প্রতিটি বয়ান ও দরস ছিল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। মানুষের অন্তরের ব্যাধি দূর করে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ে দেওয়াই ছিল তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য।

​ইন্তেকাল

​দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর (কিডনিজনিত সমস্যার কারণে ডায়ালাইসিস নিতে হতো) এই মহান মনিষী ১৪ই ডিসেম্বর ২০২৫ সকালে পাকিস্তানের লাহোরে ইন্তেকাল করেন। ১৫ই ডিসেম্বর তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং হাজার হাজার ভক্ত ও উলামায়ে কেরাম তাঁকে চোখের জলে বিদায় জানান।

হযরত মাওলানা জুলফিকার আহমদ নকশবন্দী (রহ.) ছিলেন এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি প্রমাণ করেছেন যে আধুনিক পেশায় থেকেও আল্লাহর ওলি হওয়া সম্ভব। তাঁর জীবন আমাদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত