শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

বঙ্গোপসাগর এখন নজরদারির Wi-Fi জোন!

বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন হালদিয়া উপসাগরে নতুন নৌঘাঁটি গড়ছে ভারত


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন হালদিয়া উপসাগরে নতুন নৌঘাঁটি গড়ছে ভারত

ভারতীয় নৌবাহিনী বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের হালদিয়া উপসাগরে একটি নতুন নৌঘাঁটি স্থাপনের কাজ শুরু করেছে।

এই ঘাঁটি ভারতের পূর্ব উপকূলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট নৌসূত্র।

চীন ও পাকিস্তান—দুই দিক থেকেই সম্ভাব্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে।

আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

ভারতীয় নৌবাহিনী পশ্চিমবঙ্গের হালদিয়ায় একটি নতুন নৌ ডিটাচমেন্ট নির্মাণ শুরু করেছে, যা ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ সীমান্তের নিকটে এবং সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত। নৌবাহিনীর শীর্ষ সূত্র অনুযায়ী, এখনো নামকরণ না হওয়া এই ঘাঁটিতে মূলত ছোট ও উচ্চগতিসম্পন্ন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হবে।

প্রাথমিকভাবে একটি বিশেষ জেটি নির্মাণে জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে দ্রুত অপারেশন পরিচালনা সম্ভব হয়। এখানে ফাস্ট ইন্টারসেপ্টর ক্রাফট (FIC) এবং নিউ ওয়াটার জেট ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফট (NWJFAC) মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বর্তমানে ভারতের পূর্ব নৌ-কমান্ডের সদর দপ্তর বিশাখাপত্তনমে অবস্থিত এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে শক্তিশালী নৌ-উপস্থিতি রয়েছে। তবে হালদিয়া ডিটাচমেন্ট স্থাপনের মাধ্যমে কলকাতা থেকে দীর্ঘ হুগলি নদীপথ পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন ছাড়াই দ্রুত যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন সম্ভব হবে।

এই ঘাঁটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে প্রায় ১০০ জন নৌসদস্য এখানে কর্মরত থাকবেন। ২০২৪ সালে ভারতের প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পরিষদ ১২০টি ফাস্ট ইন্টারসেপ্টর ক্রাফট এবং ৩১টি নিউ ওয়াটার জেট ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফট কেনার অনুমোদন দেয়। এসব জাহাজের ওজন প্রায় ১০০ টন, সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৪৫ নট, এবং এগুলোতে মেশিনগান সংযুক্ত থাকে। উপকূলীয় টহল, নজরদারি ও প্রতিহতকরণে এগুলো ব্যবহৃত হবে।

হালদিয়া ঘাঁটির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের উত্তরাঞ্চলে সামুদ্রিক তৎপরতার ওপর নিবিড় নজর রাখা সম্ভব হবে। এই অঞ্চল বর্তমানে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তির ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির কারণে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।

হালদিয়া কলকাতা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে, এবং হালদি নদীর মোহনায় অবস্থিত হওয়ায় সরাসরি বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের সুবিধা রয়েছে। ১৯৭০-এর দশক থেকে চালু থাকা হালদিয়া ডক কমপ্লেক্স এই নৌঘাঁটির জন্য অবকাঠামোগত সুবিধা প্রদান করবে।

আঞ্চলিক রাজনীতির পরিবর্তনও এই উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করেছে। আগস্ট ২০২৪-এর পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ঢাকা ও ইসলামাবাদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে পাকিস্তান নৌবাহিনীর ফ্রিগেট পিএনএস সাইফ বাংলাদেশ সফর করে এবং দুই দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে নজিরবিহীন দুই-তারকা পর্যায়ের স্টাফ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এসব বিষয় নয়াদিল্লিতে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে অতিরিক্ত-আঞ্চলিক শক্তির ১০০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ নিয়মিত টহল দিচ্ছে। হালদিয়া ডিটাচমেন্টের মাধ্যমে ভারত মালাক্কা প্রণালীগামী সমুদ্রপথ নজরদারিতে সক্ষম হবে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া এই ঘাঁটি অযুদ্ধকালীন নাগরিক উদ্ধার, মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়ক হবে—বিশেষত ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাপ্রবণ বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে।

এই পদক্ষেপ ভারতের দীর্ঘদিনের দুই-মুখী যুদ্ধ প্রস্তুতির কৌশল—উত্তর ও পশ্চিম সীমান্তের পাশাপাশি সামুদ্রিক ক্ষেত্রেও শক্তি প্রদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হালদিয়া নৌঘাঁটি ভারতের সামুদ্রিক সার্বভৌমত্ব জোরদার এবং সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের প্রভাব প্রতিহত করার একটি সুপরিকল্পিত উদ্যোগ।

স্থানীয় পর্যায়ে এই ঘাঁটি রক্ষণাবেক্ষণ, লজিস্টিকস ও সহায়ক খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বৃহৎ যুদ্ধজাহাজের পরিবর্তে দ্রুতগামী ছোট নৌযানে গুরুত্ব দেওয়া ভারতের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা কৌশলের বাস্তব প্রতিফলন।

বিষয় : ভারত বঙ্গোপসাগর নৌঘাঁটি

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন হালদিয়া উপসাগরে নতুন নৌঘাঁটি গড়ছে ভারত

প্রকাশের তারিখ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

ভারতীয় নৌবাহিনী বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের হালদিয়া উপসাগরে একটি নতুন নৌঘাঁটি স্থাপনের কাজ শুরু করেছে।

এই ঘাঁটি ভারতের পূর্ব উপকূলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট নৌসূত্র।

চীন ও পাকিস্তান—দুই দিক থেকেই সম্ভাব্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে।

আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

ভারতীয় নৌবাহিনী পশ্চিমবঙ্গের হালদিয়ায় একটি নতুন নৌ ডিটাচমেন্ট নির্মাণ শুরু করেছে, যা ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ সীমান্তের নিকটে এবং সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত। নৌবাহিনীর শীর্ষ সূত্র অনুযায়ী, এখনো নামকরণ না হওয়া এই ঘাঁটিতে মূলত ছোট ও উচ্চগতিসম্পন্ন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হবে।

প্রাথমিকভাবে একটি বিশেষ জেটি নির্মাণে জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে দ্রুত অপারেশন পরিচালনা সম্ভব হয়। এখানে ফাস্ট ইন্টারসেপ্টর ক্রাফট (FIC) এবং নিউ ওয়াটার জেট ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফট (NWJFAC) মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বর্তমানে ভারতের পূর্ব নৌ-কমান্ডের সদর দপ্তর বিশাখাপত্তনমে অবস্থিত এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে শক্তিশালী নৌ-উপস্থিতি রয়েছে। তবে হালদিয়া ডিটাচমেন্ট স্থাপনের মাধ্যমে কলকাতা থেকে দীর্ঘ হুগলি নদীপথ পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন ছাড়াই দ্রুত যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন সম্ভব হবে।

এই ঘাঁটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে প্রায় ১০০ জন নৌসদস্য এখানে কর্মরত থাকবেন। ২০২৪ সালে ভারতের প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পরিষদ ১২০টি ফাস্ট ইন্টারসেপ্টর ক্রাফট এবং ৩১টি নিউ ওয়াটার জেট ফাস্ট অ্যাটাক ক্রাফট কেনার অনুমোদন দেয়। এসব জাহাজের ওজন প্রায় ১০০ টন, সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৪৫ নট, এবং এগুলোতে মেশিনগান সংযুক্ত থাকে। উপকূলীয় টহল, নজরদারি ও প্রতিহতকরণে এগুলো ব্যবহৃত হবে।

হালদিয়া ঘাঁটির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের উত্তরাঞ্চলে সামুদ্রিক তৎপরতার ওপর নিবিড় নজর রাখা সম্ভব হবে। এই অঞ্চল বর্তমানে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তির ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির কারণে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।

হালদিয়া কলকাতা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে, এবং হালদি নদীর মোহনায় অবস্থিত হওয়ায় সরাসরি বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের সুবিধা রয়েছে। ১৯৭০-এর দশক থেকে চালু থাকা হালদিয়া ডক কমপ্লেক্স এই নৌঘাঁটির জন্য অবকাঠামোগত সুবিধা প্রদান করবে।

আঞ্চলিক রাজনীতির পরিবর্তনও এই উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করেছে। আগস্ট ২০২৪-এর পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ঢাকা ও ইসলামাবাদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে পাকিস্তান নৌবাহিনীর ফ্রিগেট পিএনএস সাইফ বাংলাদেশ সফর করে এবং দুই দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে নজিরবিহীন দুই-তারকা পর্যায়ের স্টাফ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এসব বিষয় নয়াদিল্লিতে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে অতিরিক্ত-আঞ্চলিক শক্তির ১০০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ নিয়মিত টহল দিচ্ছে। হালদিয়া ডিটাচমেন্টের মাধ্যমে ভারত মালাক্কা প্রণালীগামী সমুদ্রপথ নজরদারিতে সক্ষম হবে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া এই ঘাঁটি অযুদ্ধকালীন নাগরিক উদ্ধার, মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়ক হবে—বিশেষত ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাপ্রবণ বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে।

এই পদক্ষেপ ভারতের দীর্ঘদিনের দুই-মুখী যুদ্ধ প্রস্তুতির কৌশল—উত্তর ও পশ্চিম সীমান্তের পাশাপাশি সামুদ্রিক ক্ষেত্রেও শক্তি প্রদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হালদিয়া নৌঘাঁটি ভারতের সামুদ্রিক সার্বভৌমত্ব জোরদার এবং সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের প্রভাব প্রতিহত করার একটি সুপরিকল্পিত উদ্যোগ।

স্থানীয় পর্যায়ে এই ঘাঁটি রক্ষণাবেক্ষণ, লজিস্টিকস ও সহায়ক খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বৃহৎ যুদ্ধজাহাজের পরিবর্তে দ্রুতগামী ছোট নৌযানে গুরুত্ব দেওয়া ভারতের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা কৌশলের বাস্তব প্রতিফলন।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত