মধ্যপ্রদেশের বালাঘাট জেলার ঘোটি–নানডোরা গ্রামে একটি হিন্দু সম্মেলনে মুসলিমবিরোধী ঘৃণাবক্তৃতার পর অন্তত ১০টি মুসলিম পরিবারকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বয়কটের মুখে পড়তে হয়। বয়কটের ফলে দৈনন্দিন লেনদেন, কাজ ও জীবিকা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি আপাতভাবে স্বাভাবিক হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিয়ে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ অনুযায়ী, জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত একটি হিন্দু সম্মেলনে মুসলিমদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ও অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়া হয়। সম্মেলনে উপস্থিত একাংশ বক্তা গ্রামের মুসলিমদের সঙ্গে কেনাবেচা ও সামাজিক যোগাযোগ বন্ধ করার আহ্বান জানান। পরে গ্রামের একটি বৈঠকে ১০টি মুসলিম পরিবারকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
বয়কট কার্যকর হওয়ার পর মুসলিম পরিবারগুলোর ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। মুদি দোকানিরা মুসলিমদের কাছে পণ্য বিক্রি বন্ধ করে দেন। মুসলিম চালকদের বলা হয় হিন্দু শিশুদের পরিবহন না করতে। মুসলিমদের দেওয়া কোনো সেবা গ্রহণ করা হয়নি এবং মুসলিম পরিবারগুলোকেও কোনো সেবা দেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, মুসলিমদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে বা কাজ দিলে ৫ হাজার রুপি জরিমানা ও সামাজিকভাবে একঘরে করার হুমকি দেওয়া হয়।
বাসচালক আসিফ হুসেইন জানান, তাকে গাড়ি চালাতে নিষেধ করা হয়, যা তার একমাত্র আয়ের উৎস ছিল। এতে তিনি চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। একইভাবে ইলেকট্রিশিয়ান সাদিককে কাজ না দেওয়ায় তিনি টানা এক সপ্তাহ বেকার থাকেন। গ্রামে বসবাসরত মুসলিম পরিবারগুলোর বড় অংশই দিনমজুরি, ছোট দোকান, গাড়ি চালানো ও কৃষিশ্রমের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বয়কট সরাসরি তাদের জীবিকা ও মর্যাদায় আঘাত হানে।
গ্রামের বাসিন্দা খাইরুন নিশা জানান, সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে গেলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আপত্তি জানিয়েছিলাম, সরপঞ্চের কাছেও গিয়েছিলাম। এরপর থেকেই আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে যায়। আগে এমন কিছু কখনও দেখিনি।” তিনি আরও বলেন, বয়কট পরিবারগুলোকে আতঙ্কিত ও নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে।
ঘটনার পর গ্রাম ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন মন্দির ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ধর্মীয় পতাকা টাঙানো হয়, যা বিষয়টিকে আরও ধর্মীয় রূপ দেয় এবং উত্তেজনা বাড়ায় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সাবেক বিধায়ক কিশোর সামরিতে এই বয়কটকে “সংবিধানসম্মত অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন” আখ্যা দিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত দাবি করেন। তিনি বলেন, পুলিশ ফ্ল্যাগ মার্চ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। সামরিতে আরও অভিযোগ করেন, গ্রামের সরপঞ্চ ও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বয়কটকে সমর্থন করেছেন এবং যথাযথ তদন্ত না হলে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সামাজিক বন্ধনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বয়কটের খবর গ্রাম ছাড়িয়ে বাইরে ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। প্রথমে কর্মকর্তারা ঘটনার কথা অস্বীকার করলেও জনসমালোচনা বাড়লে পুলিশ ও জেলা প্রশাসন হস্তক্ষেপ করে। লাঞ্জির এসডিওপি ওমপ্রকাশ জানান, পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা বিবেচনায় শান্তি কমিটির বৈঠক আয়োজন করা হয়। এসডিএম লাঞ্জি কমল সিং সিনসার, তহসিলদার সঞ্জয় ভাস্কার ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ, জনপ্রতিনিধি ও সমাজকর্মীরা বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে সবাই গ্রামে শান্তি, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি বজায় রাখার বিষয়ে একমত হন।
পুলিশের দাবি, শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার সমাধান হয়েছে এবং ভবিষ্যতে গুজব ও উত্তেজনা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে মুসলিম পরিবারগুলোর বক্তব্য, আপাত সমাধান স্বস্তি দিলেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়নি। তাদের প্রশ্ন, যাঁরা ঘৃণাবক্তৃতা দিয়েছেন ও বয়কট কার্যকর করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কেন কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, গ্রামের কিছু বাসিন্দা বয়কটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। নেটরাম টিডকে দাবি করেন, এসব গুজব এবং মুসলিমদেরও নিজেদের ভুল স্বীকার করা উচিত। আরেক বাসিন্দা তুলারাম বলেন, আলোচনার মাধ্যমেই বিষয়টি মীমাংসা হবে।
স্থানীয় সাংবাদিক আশিস শ্রীবাস জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এলাকায় হিন্দু সংগঠনের তৎপরতা বেড়েছে। তিনি বলেন, এটি আদিবাসী অধ্যুষিত ও সংবেদনশীল এলাকা, যেখানে অতীতে উত্তেজনার ইতিহাস রয়েছে। এত গুরুতর ঘটনার পরও প্রশাসনের কয়েকদিন নীরব থাকা প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রশাসন বয়কট প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও ঘোটি–নানডোরা গ্রামের মুসলিম পরিবারগুলোর মধ্যে ভয় ও অবিশ্বাস কাটেনি। এক বাসিন্দার ভাষায়, “বয়কট শেষ হওয়া মানেই আমাদের ভোগান্তি মুছে যাওয়া নয়। যারা ঘৃণা ছড়িয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না হলে, এমন ঘটনা আবার ঘটবে না—এ নিশ্চয়তা কোথায়?”

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মধ্যপ্রদেশের বালাঘাট জেলার ঘোটি–নানডোরা গ্রামে একটি হিন্দু সম্মেলনে মুসলিমবিরোধী ঘৃণাবক্তৃতার পর অন্তত ১০টি মুসলিম পরিবারকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বয়কটের মুখে পড়তে হয়। বয়কটের ফলে দৈনন্দিন লেনদেন, কাজ ও জীবিকা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি আপাতভাবে স্বাভাবিক হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিয়ে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ অনুযায়ী, জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত একটি হিন্দু সম্মেলনে মুসলিমদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ও অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়া হয়। সম্মেলনে উপস্থিত একাংশ বক্তা গ্রামের মুসলিমদের সঙ্গে কেনাবেচা ও সামাজিক যোগাযোগ বন্ধ করার আহ্বান জানান। পরে গ্রামের একটি বৈঠকে ১০টি মুসলিম পরিবারকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
বয়কট কার্যকর হওয়ার পর মুসলিম পরিবারগুলোর ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। মুদি দোকানিরা মুসলিমদের কাছে পণ্য বিক্রি বন্ধ করে দেন। মুসলিম চালকদের বলা হয় হিন্দু শিশুদের পরিবহন না করতে। মুসলিমদের দেওয়া কোনো সেবা গ্রহণ করা হয়নি এবং মুসলিম পরিবারগুলোকেও কোনো সেবা দেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, মুসলিমদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে বা কাজ দিলে ৫ হাজার রুপি জরিমানা ও সামাজিকভাবে একঘরে করার হুমকি দেওয়া হয়।
বাসচালক আসিফ হুসেইন জানান, তাকে গাড়ি চালাতে নিষেধ করা হয়, যা তার একমাত্র আয়ের উৎস ছিল। এতে তিনি চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। একইভাবে ইলেকট্রিশিয়ান সাদিককে কাজ না দেওয়ায় তিনি টানা এক সপ্তাহ বেকার থাকেন। গ্রামে বসবাসরত মুসলিম পরিবারগুলোর বড় অংশই দিনমজুরি, ছোট দোকান, গাড়ি চালানো ও কৃষিশ্রমের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বয়কট সরাসরি তাদের জীবিকা ও মর্যাদায় আঘাত হানে।
গ্রামের বাসিন্দা খাইরুন নিশা জানান, সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে গেলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আপত্তি জানিয়েছিলাম, সরপঞ্চের কাছেও গিয়েছিলাম। এরপর থেকেই আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে যায়। আগে এমন কিছু কখনও দেখিনি।” তিনি আরও বলেন, বয়কট পরিবারগুলোকে আতঙ্কিত ও নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে।
ঘটনার পর গ্রাম ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন মন্দির ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ধর্মীয় পতাকা টাঙানো হয়, যা বিষয়টিকে আরও ধর্মীয় রূপ দেয় এবং উত্তেজনা বাড়ায় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সাবেক বিধায়ক কিশোর সামরিতে এই বয়কটকে “সংবিধানসম্মত অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন” আখ্যা দিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত দাবি করেন। তিনি বলেন, পুলিশ ফ্ল্যাগ মার্চ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। সামরিতে আরও অভিযোগ করেন, গ্রামের সরপঞ্চ ও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বয়কটকে সমর্থন করেছেন এবং যথাযথ তদন্ত না হলে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সামাজিক বন্ধনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বয়কটের খবর গ্রাম ছাড়িয়ে বাইরে ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। প্রথমে কর্মকর্তারা ঘটনার কথা অস্বীকার করলেও জনসমালোচনা বাড়লে পুলিশ ও জেলা প্রশাসন হস্তক্ষেপ করে। লাঞ্জির এসডিওপি ওমপ্রকাশ জানান, পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা বিবেচনায় শান্তি কমিটির বৈঠক আয়োজন করা হয়। এসডিএম লাঞ্জি কমল সিং সিনসার, তহসিলদার সঞ্জয় ভাস্কার ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ, জনপ্রতিনিধি ও সমাজকর্মীরা বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে সবাই গ্রামে শান্তি, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি বজায় রাখার বিষয়ে একমত হন।
পুলিশের দাবি, শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার সমাধান হয়েছে এবং ভবিষ্যতে গুজব ও উত্তেজনা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে মুসলিম পরিবারগুলোর বক্তব্য, আপাত সমাধান স্বস্তি দিলেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়নি। তাদের প্রশ্ন, যাঁরা ঘৃণাবক্তৃতা দিয়েছেন ও বয়কট কার্যকর করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কেন কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, গ্রামের কিছু বাসিন্দা বয়কটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। নেটরাম টিডকে দাবি করেন, এসব গুজব এবং মুসলিমদেরও নিজেদের ভুল স্বীকার করা উচিত। আরেক বাসিন্দা তুলারাম বলেন, আলোচনার মাধ্যমেই বিষয়টি মীমাংসা হবে।
স্থানীয় সাংবাদিক আশিস শ্রীবাস জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এলাকায় হিন্দু সংগঠনের তৎপরতা বেড়েছে। তিনি বলেন, এটি আদিবাসী অধ্যুষিত ও সংবেদনশীল এলাকা, যেখানে অতীতে উত্তেজনার ইতিহাস রয়েছে। এত গুরুতর ঘটনার পরও প্রশাসনের কয়েকদিন নীরব থাকা প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রশাসন বয়কট প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও ঘোটি–নানডোরা গ্রামের মুসলিম পরিবারগুলোর মধ্যে ভয় ও অবিশ্বাস কাটেনি। এক বাসিন্দার ভাষায়, “বয়কট শেষ হওয়া মানেই আমাদের ভোগান্তি মুছে যাওয়া নয়। যারা ঘৃণা ছড়িয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না হলে, এমন ঘটনা আবার ঘটবে না—এ নিশ্চয়তা কোথায়?”

আপনার মতামত লিখুন