শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

তৃণমূল পর্যায়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর তান্ডবে বিপর্যস্ত জনজীবন

রমজানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমবিদ্বেষী সহিংসতার উদ্বেগজনক উত্থান



রমজানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমবিদ্বেষী সহিংসতার উদ্বেগজনক উত্থান

ভারতে পবিত্র মাহে রমজান চলাকালীন বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমদের লক্ষ্য করে ঘৃণাপ্রসূত অপরাধ ও গণপিটুনির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিহার, রাজস্থান এবং উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোতে সংঘটিত এসব প্রাণঘাতী হামলায় নারী ও শিশুসহ বেশ কয়েকজন মুসলিম প্রাণ হারিয়েছেন। মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা একে পদ্ধতিগত সহিংসতার একটি অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

বিভিন্ন ঘটনায় অভিযুক্ত পক্ষ এবং স্থানীয় সূত্রগুলো এসব সহিংসতাকে তাৎক্ষণিক উত্তেজনা বা ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। উত্তরপ্রদেশের শাহজাহানপুরে হোলির রঙ দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘর্ষের বিষয়ে স্থানীয় সূত্রের দাবি, এটি একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যেখানে উভয় পক্ষই পাথর নিক্ষেপ করেছে। বিহারের মধুবনীতে রোশন খাতুন নামক এক নারীকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের পক্ষের প্রাথমিক দাবি ছিল গ্রাম্য বিবাদ। অনেক ক্ষেত্রে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের কর্মকাণ্ডকে ‘গোরক্ষা’ বা ‘ধর্মীয় অনুভূতি’র দোহাই দিয়ে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই দাবিগুলোর অন্তরালে প্রায়শই সাম্প্রদায়িক উস্কানি ও লক্ষ্যভেদী ঘৃণা কার্যকর থাকে।

চলতি মার্চ মাসের শুরু থেকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে রমজানের পবিত্রতা ও প্রশান্তিকে ম্লান করে বেশ কিছু নৃসংশ ঘটনা ঘটেছে:

  • বিহার (মধুবনী ও দারভাঙ্গা): মধুবনীতে রোশন খাতুন নামের এক মুসলিম নারীকে খুঁটির সাথে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তাকে জোর করে গোমূত্র ও মদ পান করানো হয়। অন্যদিকে, দারভাঙ্গায় ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ আব্দুল সালামকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে; তার অপরাধ ছিল তিনি কিছু উগ্রবাদী যুবককে ইসলামবিদ্বেষী গালিগালাজ করতে নিষেধ করেছিলেন।

  • রাজস্থান (ভিওয়াড়ি): গত ২ মার্চ আমির খান (২৮) নামে এক ট্রাক চালককে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার পরিবারের অভিযোগ, মসজিদের পাশে ফলবাহী ট্রাক নিয়ে অপেক্ষাকালে উগ্র গোরক্ষক বাহিনী তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।

  • উত্তরপ্রদেশ (লখনউ): ১৩ বছর বয়সী কিশোর উনাইজ খানকে গুলি করা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতা ব্রজেশ পাঠকের ভাগ্নে বলে জানা গেছে।

এই ধারাবাহিক হামলা মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘মাইলস টু স্মাইল’ -এর প্রতিষ্ঠাতা আসিফ মুজতবা বলেন, "রমজান হওয়ার কথা ছিল ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির সময়, কিন্তু ভারতের মুসলিমদের এখন নিরাপত্তার চিন্তায় দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে। রাষ্ট্র যেখানে নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার কথা, সেখানে আমাদের একঘরে করে রাখা হচ্ছে।"

আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই ঘৃণাপ্রসূত অপরাধগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক বিভাজনের প্রতিফলন। ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস’ (APCR)-এর সম্পাদক নাদিম খান প্রশ্ন তুলেছেন, কেন রমজানের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে উল্টো মুসলিমদের ওপর নজরদারি ও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু অভিযুক্তরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই বিচার প্রক্রিয়া থমকে যায়। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী গণপিটুনি রোধে কঠোর আইন প্রণয়নের কথা থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগের অভাব দৃশ্যমান। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে দ্রুত স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান করা। এই সংকটে ধৈর্য ও আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি সামাজিক সংহতি বজায় রাখা অপরিহার্য।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


রমজানে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমবিদ্বেষী সহিংসতার উদ্বেগজনক উত্থান

প্রকাশের তারিখ : ১২ মার্চ ২০২৬

featured Image

ভারতে পবিত্র মাহে রমজান চলাকালীন বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমদের লক্ষ্য করে ঘৃণাপ্রসূত অপরাধ ও গণপিটুনির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিহার, রাজস্থান এবং উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোতে সংঘটিত এসব প্রাণঘাতী হামলায় নারী ও শিশুসহ বেশ কয়েকজন মুসলিম প্রাণ হারিয়েছেন। মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা একে পদ্ধতিগত সহিংসতার একটি অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

বিভিন্ন ঘটনায় অভিযুক্ত পক্ষ এবং স্থানীয় সূত্রগুলো এসব সহিংসতাকে তাৎক্ষণিক উত্তেজনা বা ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। উত্তরপ্রদেশের শাহজাহানপুরে হোলির রঙ দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘর্ষের বিষয়ে স্থানীয় সূত্রের দাবি, এটি একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যেখানে উভয় পক্ষই পাথর নিক্ষেপ করেছে। বিহারের মধুবনীতে রোশন খাতুন নামক এক নারীকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের পক্ষের প্রাথমিক দাবি ছিল গ্রাম্য বিবাদ। অনেক ক্ষেত্রে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের কর্মকাণ্ডকে ‘গোরক্ষা’ বা ‘ধর্মীয় অনুভূতি’র দোহাই দিয়ে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই দাবিগুলোর অন্তরালে প্রায়শই সাম্প্রদায়িক উস্কানি ও লক্ষ্যভেদী ঘৃণা কার্যকর থাকে।

চলতি মার্চ মাসের শুরু থেকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে রমজানের পবিত্রতা ও প্রশান্তিকে ম্লান করে বেশ কিছু নৃসংশ ঘটনা ঘটেছে:

  • বিহার (মধুবনী ও দারভাঙ্গা): মধুবনীতে রোশন খাতুন নামের এক মুসলিম নারীকে খুঁটির সাথে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তাকে জোর করে গোমূত্র ও মদ পান করানো হয়। অন্যদিকে, দারভাঙ্গায় ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ আব্দুল সালামকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে; তার অপরাধ ছিল তিনি কিছু উগ্রবাদী যুবককে ইসলামবিদ্বেষী গালিগালাজ করতে নিষেধ করেছিলেন।

  • রাজস্থান (ভিওয়াড়ি): গত ২ মার্চ আমির খান (২৮) নামে এক ট্রাক চালককে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার পরিবারের অভিযোগ, মসজিদের পাশে ফলবাহী ট্রাক নিয়ে অপেক্ষাকালে উগ্র গোরক্ষক বাহিনী তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।

  • উত্তরপ্রদেশ (লখনউ): ১৩ বছর বয়সী কিশোর উনাইজ খানকে গুলি করা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতা ব্রজেশ পাঠকের ভাগ্নে বলে জানা গেছে।

এই ধারাবাহিক হামলা মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘মাইলস টু স্মাইল’ -এর প্রতিষ্ঠাতা আসিফ মুজতবা বলেন, "রমজান হওয়ার কথা ছিল ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির সময়, কিন্তু ভারতের মুসলিমদের এখন নিরাপত্তার চিন্তায় দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে। রাষ্ট্র যেখানে নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার কথা, সেখানে আমাদের একঘরে করে রাখা হচ্ছে।"

আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই ঘৃণাপ্রসূত অপরাধগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক বিভাজনের প্রতিফলন। ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস’ (APCR)-এর সম্পাদক নাদিম খান প্রশ্ন তুলেছেন, কেন রমজানের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে উল্টো মুসলিমদের ওপর নজরদারি ও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু অভিযুক্তরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই বিচার প্রক্রিয়া থমকে যায়। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী গণপিটুনি রোধে কঠোর আইন প্রণয়নের কথা থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগের অভাব দৃশ্যমান। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে দ্রুত স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান করা। এই সংকটে ধৈর্য ও আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি সামাজিক সংহতি বজায় রাখা অপরিহার্য।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত