ভারতের উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসতবাড়ি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রশাসনের ‘বুলডোজার অ্যাকশন’ তীব্রতর হয়েছে। পবিত্র ঈদুল ফিতর পরবর্তী সময়ে বারাণসীর ঐতিহ্যবাহী ডালমন্ডি এবং মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীর বেগমবাগ এলাকায় এই অভিযান নতুন করে মানবিক সংকট তৈরি করেছে। আইনি জটিলতা ও উন্নয়নের অজুহাতে বছরের পর বছর ধরে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই উচ্ছেদ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
উজ্জয়িনী ও বারাণসী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই উচ্ছেদ অভিযানকে সম্পূর্ণ ‘আইনি’ এবং ‘উন্নয়নমূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করা হয়েছে। উজ্জয়িনী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (UDA) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দীপ কুমার সোনি জানান, “আদালতের স্থগিতাদেশ (Stay Order) উঠে যাওয়ার পরেই আমরা এই ব্যবস্থা নিয়েছি। ১৯৮৫ সালে এসব ভূখণ্ড কেবল আবাসিক ব্যবহারের জন্য ৩০ বছরের লিজে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু লিজগ্রহীতারা তা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে শর্ত ভঙ্গ করেছেন।”
কর্তৃপক্ষের আরও দাবি, ২০১৪-১৫ সালে লিজের মেয়াদ শেষ হলেও তা নবায়ন করা হয়নি। এছাড়া ২০২৮ সালের ‘সিংহাস্থ কুম্ভমেলা’ উপলক্ষে যানজট নিরসনে বেগমবাগ এলাকায় একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যার জন্য এই জমি উদ্ধার অপরিহার্য। বারাণসীর গণপূর্ত বিভাগ (PWD) দাবি করেছে, ডালমন্ডি এলাকায় চিহ্নিত ১৮৭টি ভবন রাস্তার প্রসারণ ও নিরাপত্তা মানদণ্ড লঙ্ঘন করে নির্মিত হয়েছে, তাই জনস্বার্থেই এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে।
গত ২৩ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে উত্তরপ্রদেশের বারাণসী এবং ২৪ মার্চ মঙ্গলবার মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালানো হয়।
মহাকাল মন্দিরের নিকটবর্তী মুসলিম অধ্যুষিত বেগমবাগ এলাকায় মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে ভারী পুলিশ মোতায়েন করে ১৬টি বহুতল ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে হোটেল ডায়মন্ড, নিউ সাওয়ান প্যালেস, রাজ গেস্ট হাউস এবং জামা-এ-শাকীব এডুকেশনাল সোসাইটির মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। ৬টি পকলেন মেশিন ও শত শত বুলডোজার দিয়ে চালানো এই অভিযানে এ পর্যন্ত মোট ৫৮টি ভবন ধ্বংস করা হয়েছে, আরও ৩২টি ভবন উচ্ছেদের তালিকায় রয়েছে।
বারাণসীর ডালমন্ডি এলাকায় সোমবার ১৮টি বাড়ি খালি করার জন্য মাইকিং বা ‘মুনাদি’ করেছে পিডব্লিউডি। আগামী ২৭ মার্চ থেকে এখানে পুনরায় বুলডোজার চালানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইতিপূর্বে এই এলাকায় ৬০টি বাড়ি ও দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বহু পরিবার দশকের পর দশক ধরে এখানে বসবাস করলেও এখন তারা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। উচ্ছেদের ফলে শত শত ব্যবসায়ীর রুজি-রুজি বন্ধ হয়ে গেছে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
মানবাধিকার সংহঠনগুলো ভারতের এই ‘বুলডোজার জাস্টিস’ বা বুলডোজার সংস্কৃতির কঠোর সমালোচনা করে আসছে। ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের বাসস্থানের অধিকার মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। যথাযথ পুনর্বাসন ছাড়া কেবল লিজের মেয়াদ শেষ হওয়া বা লঘুপাপের অজুহাতে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সম্পদ ধ্বংস করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
আন্তর্জাতিক বিচারিক মানদণ্ড অনুযায়ী, রাষ্ট্রের যেকোনো উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় মানবিক মর্যাদা বজায় রাখা জরুরি। এই সংকটে স্বচ্ছ তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। দায়বদ্ধতা নিশ্চিত না হলে এই ধরণের একপাক্ষিক পদক্ষেপ সামাজিক ভারসাম্য ও নাগরিক সুরক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।
বিষয় : ভারত

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মার্চ ২০২৬
ভারতের উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসতবাড়ি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রশাসনের ‘বুলডোজার অ্যাকশন’ তীব্রতর হয়েছে। পবিত্র ঈদুল ফিতর পরবর্তী সময়ে বারাণসীর ঐতিহ্যবাহী ডালমন্ডি এবং মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীর বেগমবাগ এলাকায় এই অভিযান নতুন করে মানবিক সংকট তৈরি করেছে। আইনি জটিলতা ও উন্নয়নের অজুহাতে বছরের পর বছর ধরে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই উচ্ছেদ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
উজ্জয়িনী ও বারাণসী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই উচ্ছেদ অভিযানকে সম্পূর্ণ ‘আইনি’ এবং ‘উন্নয়নমূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করা হয়েছে। উজ্জয়িনী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (UDA) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দীপ কুমার সোনি জানান, “আদালতের স্থগিতাদেশ (Stay Order) উঠে যাওয়ার পরেই আমরা এই ব্যবস্থা নিয়েছি। ১৯৮৫ সালে এসব ভূখণ্ড কেবল আবাসিক ব্যবহারের জন্য ৩০ বছরের লিজে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু লিজগ্রহীতারা তা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে শর্ত ভঙ্গ করেছেন।”
কর্তৃপক্ষের আরও দাবি, ২০১৪-১৫ সালে লিজের মেয়াদ শেষ হলেও তা নবায়ন করা হয়নি। এছাড়া ২০২৮ সালের ‘সিংহাস্থ কুম্ভমেলা’ উপলক্ষে যানজট নিরসনে বেগমবাগ এলাকায় একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যার জন্য এই জমি উদ্ধার অপরিহার্য। বারাণসীর গণপূর্ত বিভাগ (PWD) দাবি করেছে, ডালমন্ডি এলাকায় চিহ্নিত ১৮৭টি ভবন রাস্তার প্রসারণ ও নিরাপত্তা মানদণ্ড লঙ্ঘন করে নির্মিত হয়েছে, তাই জনস্বার্থেই এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে।
গত ২৩ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে উত্তরপ্রদেশের বারাণসী এবং ২৪ মার্চ মঙ্গলবার মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালানো হয়।
মহাকাল মন্দিরের নিকটবর্তী মুসলিম অধ্যুষিত বেগমবাগ এলাকায় মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে ভারী পুলিশ মোতায়েন করে ১৬টি বহুতল ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে হোটেল ডায়মন্ড, নিউ সাওয়ান প্যালেস, রাজ গেস্ট হাউস এবং জামা-এ-শাকীব এডুকেশনাল সোসাইটির মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। ৬টি পকলেন মেশিন ও শত শত বুলডোজার দিয়ে চালানো এই অভিযানে এ পর্যন্ত মোট ৫৮টি ভবন ধ্বংস করা হয়েছে, আরও ৩২টি ভবন উচ্ছেদের তালিকায় রয়েছে।
বারাণসীর ডালমন্ডি এলাকায় সোমবার ১৮টি বাড়ি খালি করার জন্য মাইকিং বা ‘মুনাদি’ করেছে পিডব্লিউডি। আগামী ২৭ মার্চ থেকে এখানে পুনরায় বুলডোজার চালানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইতিপূর্বে এই এলাকায় ৬০টি বাড়ি ও দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বহু পরিবার দশকের পর দশক ধরে এখানে বসবাস করলেও এখন তারা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। উচ্ছেদের ফলে শত শত ব্যবসায়ীর রুজি-রুজি বন্ধ হয়ে গেছে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
মানবাধিকার সংহঠনগুলো ভারতের এই ‘বুলডোজার জাস্টিস’ বা বুলডোজার সংস্কৃতির কঠোর সমালোচনা করে আসছে। ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের বাসস্থানের অধিকার মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। যথাযথ পুনর্বাসন ছাড়া কেবল লিজের মেয়াদ শেষ হওয়া বা লঘুপাপের অজুহাতে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সম্পদ ধ্বংস করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
আন্তর্জাতিক বিচারিক মানদণ্ড অনুযায়ী, রাষ্ট্রের যেকোনো উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় মানবিক মর্যাদা বজায় রাখা জরুরি। এই সংকটে স্বচ্ছ তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। দায়বদ্ধতা নিশ্চিত না হলে এই ধরণের একপাক্ষিক পদক্ষেপ সামাজিক ভারসাম্য ও নাগরিক সুরক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।

আপনার মতামত লিখুন