শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

শিক্ষা সংস্কারের নামে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কোণঠাসা করার অভিযোগ; ১ জুলাই থেকে কার্যকর হচ্ছে নতুন নিয়ম

উত্তরাখণ্ডে মাদ্রাসা পরিচালনায় সরকারের কড়াকড়ি: সংখ্যালঘু মহলে উদ্বেগ



উত্তরাখণ্ডে মাদ্রাসা পরিচালনায় সরকারের কড়াকড়ি: সংখ্যালঘু মহলে উদ্বেগ

ভারতের উত্তরাখণ্ডে মাদ্রাসা পরিচালনার ক্ষেত্রে পুষ্কর সিং ধামির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার একগুচ্ছ কঠোর শর্তাবলি আরোপ করেছে। সংখ্যালঘু উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্দিষ্ট ধারা-১৪-এর শর্ত পূরণ ব্যতীত কোনো মাদ্রাসা ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানের স্বীকৃতি পাবে না। মাদ্রাসা বোর্ড বিলুপ্তির ঘোষণার রেশ কাটতে না কাটতেই এই নতুন ফরমান রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।

উত্তরাখণ্ড সরকারের দাবি, মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ এবং সংগঠিত করার লক্ষ্যেই এই নতুন নিয়মাবলি জারি করা হয়েছে। সংখ্যালঘু কল্যাণ কর্মকর্তা জে. এস. রাওয়াত এবং মাদ্রাসা বোর্ডের পরিচালক গিরধারি সিং রাওয়াতের মতে, আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের যোগ্যতা যাচাই করা অপরিহার্য। সরকারের পক্ষ থেকে যে প্রধান শর্তগুলো দেওয়া হয়েছে তা হলো:

  • মাদ্রাসাগুলোকে অবশ্যই শিক্ষা দপ্তর থেকে নতুন করে স্বীকৃতি নিতে হবে।
  • প্রতিষ্ঠানের জমি সংশ্লিষ্ট সোসাইটির নামে নিবন্ধিত হতে হবে।
  • সকল আর্থিক লেনদেন কেবল অফিশিয়াল ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।
  • কেবল ডিগ্রিধারী শিক্ষকদেরই নিয়োগ দেওয়া যাবে।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, "ধর্মীয় শিক্ষার নামে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না।" তারা সতর্ক করেছেন যে, মানদণ্ড অনুসরণে ব্যর্থ হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শনিবার (২৮ মার্চ) দেরাদুনে সংখ্যালঘু কল্যাণ কর্মকর্তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মাদ্রাসা প্রতিনিধিদের এই নতুন কঠোর নিয়ম সম্পর্কে অবহিত করা হয়। বৈঠকে মাওলানা ইফতিখার, ক্বারী শাহজাদ এবং মাওলানা রিহান গানি উপস্থিত ছিলেন। এই নির্দেশনার ফলে উত্তরাখণ্ডের ৪৮২টি স্বীকৃত মাদ্রাসার প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

উত্তরাখণ্ড সরকার ইতিপূর্বে ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার লক্ষ্যে মাদ্রাসা বোর্ড বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে তথাকথিত 'অবৈধ' মাজার, ঈদগাহ ও মসজিদ উচ্ছেদ করা হয়েছে।

নতুন নিয়মে মাদ্রাসাগুলোকে সোসাইটি রেজিস্ট্রারের কাছে নিবন্ধিত হতে হবে এবং সব সদস্যকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মাদ্রাসা পরিচালকদের মতে, পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে এবং অস্পষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে এই নিয়মগুলো চাপিয়ে দেওয়া মূলত শিক্ষাব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করার একটি কৌশল।

দেরাদুন, হরিদ্বার, নৈনিতালসহ বিভিন্ন জেলার মাদ্রাসার বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেছে প্রশাসন। এর ফলে অনেক প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানও সরকারি গেঁড়াকলে পড়ে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

ভারতের সংবিধানের ৩০(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংখ্যালঘুদের নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনার মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বচ্ছতার নামে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ যদি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও শিক্ষাগত অধিকারকে খর্ব করে, তবে তা সাংবিধানিক চেতনার পরিপন্থী।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও নাগরিক অধিকারের মানদণ্ডে যেকোনো সংস্কার প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। হুট করে কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া এবং বোর্ড বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্তটি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী কি না, সেই প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি 'বিমাতাসুলভ আচরণ' বন্ধ করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও শিক্ষা গ্রহণের অধিকার সুরক্ষা করা প্রশাসনের অন্যতম প্রধান কাজ।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


উত্তরাখণ্ডে মাদ্রাসা পরিচালনায় সরকারের কড়াকড়ি: সংখ্যালঘু মহলে উদ্বেগ

প্রকাশের তারিখ : ২৯ মার্চ ২০২৬

featured Image

ভারতের উত্তরাখণ্ডে মাদ্রাসা পরিচালনার ক্ষেত্রে পুষ্কর সিং ধামির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার একগুচ্ছ কঠোর শর্তাবলি আরোপ করেছে। সংখ্যালঘু উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্দিষ্ট ধারা-১৪-এর শর্ত পূরণ ব্যতীত কোনো মাদ্রাসা ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানের স্বীকৃতি পাবে না। মাদ্রাসা বোর্ড বিলুপ্তির ঘোষণার রেশ কাটতে না কাটতেই এই নতুন ফরমান রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।

উত্তরাখণ্ড সরকারের দাবি, মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ এবং সংগঠিত করার লক্ষ্যেই এই নতুন নিয়মাবলি জারি করা হয়েছে। সংখ্যালঘু কল্যাণ কর্মকর্তা জে. এস. রাওয়াত এবং মাদ্রাসা বোর্ডের পরিচালক গিরধারি সিং রাওয়াতের মতে, আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের যোগ্যতা যাচাই করা অপরিহার্য। সরকারের পক্ষ থেকে যে প্রধান শর্তগুলো দেওয়া হয়েছে তা হলো:

  • মাদ্রাসাগুলোকে অবশ্যই শিক্ষা দপ্তর থেকে নতুন করে স্বীকৃতি নিতে হবে।
  • প্রতিষ্ঠানের জমি সংশ্লিষ্ট সোসাইটির নামে নিবন্ধিত হতে হবে।
  • সকল আর্থিক লেনদেন কেবল অফিশিয়াল ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।
  • কেবল ডিগ্রিধারী শিক্ষকদেরই নিয়োগ দেওয়া যাবে।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, "ধর্মীয় শিক্ষার নামে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না।" তারা সতর্ক করেছেন যে, মানদণ্ড অনুসরণে ব্যর্থ হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শনিবার (২৮ মার্চ) দেরাদুনে সংখ্যালঘু কল্যাণ কর্মকর্তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মাদ্রাসা প্রতিনিধিদের এই নতুন কঠোর নিয়ম সম্পর্কে অবহিত করা হয়। বৈঠকে মাওলানা ইফতিখার, ক্বারী শাহজাদ এবং মাওলানা রিহান গানি উপস্থিত ছিলেন। এই নির্দেশনার ফলে উত্তরাখণ্ডের ৪৮২টি স্বীকৃত মাদ্রাসার প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

উত্তরাখণ্ড সরকার ইতিপূর্বে ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার লক্ষ্যে মাদ্রাসা বোর্ড বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে তথাকথিত 'অবৈধ' মাজার, ঈদগাহ ও মসজিদ উচ্ছেদ করা হয়েছে।

নতুন নিয়মে মাদ্রাসাগুলোকে সোসাইটি রেজিস্ট্রারের কাছে নিবন্ধিত হতে হবে এবং সব সদস্যকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মাদ্রাসা পরিচালকদের মতে, পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে এবং অস্পষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে এই নিয়মগুলো চাপিয়ে দেওয়া মূলত শিক্ষাব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করার একটি কৌশল।

দেরাদুন, হরিদ্বার, নৈনিতালসহ বিভিন্ন জেলার মাদ্রাসার বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেছে প্রশাসন। এর ফলে অনেক প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানও সরকারি গেঁড়াকলে পড়ে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

ভারতের সংবিধানের ৩০(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংখ্যালঘুদের নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনার মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বচ্ছতার নামে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ যদি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও শিক্ষাগত অধিকারকে খর্ব করে, তবে তা সাংবিধানিক চেতনার পরিপন্থী।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও নাগরিক অধিকারের মানদণ্ডে যেকোনো সংস্কার প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। হুট করে কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া এবং বোর্ড বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্তটি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী কি না, সেই প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি 'বিমাতাসুলভ আচরণ' বন্ধ করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও শিক্ষা গ্রহণের অধিকার সুরক্ষা করা প্রশাসনের অন্যতম প্রধান কাজ।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত