ভারতের বিহার রাজ্যের মধুবাণী জেলায় রোজা রাখা অবস্থায় এক মুসলিম নারীকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিহতের পরিবারের দাবি, স্থানীয় প্রভাবশালীরা কেবল শারীরিক নির্যাতনই করেনি, বরং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে তাকে প্রস্রাব মিশ্রিত মদ পানে বাধ্য করেছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত মাত্র একজনকে গ্রেফতার করায় ন্যায়বিচার নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা গ্রামের মুখিয়া (ইউপি চেয়ারম্যান) কুমারী দেবী এবং তার অনুসারীদের পক্ষ থেকে এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, অভিযুক্ত পক্ষ এটিকে একটি সাধারণ 'গ্রাম্য বিবাদ' হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছে। পুলিশের প্রাথমিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, বিষয়টি তদন্তাধীন এবং সব অভিযোগ এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। প্রশাসনের একাংশের দাবি, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং তদন্তের স্বার্থেই সময় প্রয়োজন। তবে ১৯ জন নামধারী আসামির মধ্যে ১৮ জনই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো সত্ত্বেও তাদের গ্রেফতার না করার বিষয়ে পুলিশ সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করেনি।
ঘটনাটি শুরু হয় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বিহারের মধুবাণী জেলার ঘোগারডিহা ব্লকের আমহি গ্রামের বাসিন্দা রওশন খাতুন একটি স্থানীয় বিবাদ মীমাংসার জন্য গ্রাম প্রধান কুমারী দেবীর বাড়িতে যান। নিহতের স্বামী মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের ভাষ্যমতে, সেখানে আলোচনার পরিবর্তে মুখিয়ার ছেলে ও তার সহযোগীরা রওশনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের বর্ণনা:
শাহাবুদ্দিন জানান, রওশনকে লাঠি ও জুতো দিয়ে নির্বিচারে মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে তাকে টেনে-হিঁচড়ে বাড়ির প্রবেশদ্বারে বেঁধে রাখা হয়। রওশন খাতুন তখন রোজা অবস্থায় ছিলেন। প্রচণ্ড তৃষ্ণায় তিনি পানি চাইলে হামলাকারীরা তাকে পানি না দিয়ে অত্যন্ত অবমাননাকরভাবে প্রস্রাব মিশ্রিত মদ পান করতে বাধ্য করে। শাহাবুদ্দিনের অভিযোগ, "আমার স্ত্রীকে পশুর মতো পেটানো হয়েছে। সে মুসলিম বলেই তাকে এভাবে টার্গেট করা হয়েছে এবং আমাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার জন্য এই জঘন্য কাজ করা হয়েছে।"
মারধরের পর গুরুতর আহত রওশনকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল এবং পরে পাটনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ মার্চ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিহতের তিনটি ছোট শিশু এখন মাতৃহীন। পরিবারটি অত্যন্ত দরিদ্র হওয়ায় তারা আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছে। তাদের আরও অভিযোগ, ঘটনার পর পুলিশ তাদের সহায়তা করার বদলে থানায় আটকে রেখে ঘুষ দাবি করেছে এবং মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছে।
মানবাধিকার কর্মী এবং আইনজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ (জীবনের অধিকার) এবং অনুচ্ছেদ ২৫ (ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার) এর চরম লঙ্ঘন। ১৯ জনের বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR) হওয়া সত্ত্বেও মাত্র একজনকে গ্রেফতার করা পুলিশের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিককে লক্ষ্যবস্তু করা এবং তাকে অমানবিক নির্যাতন করা গুরুতর অপরাধ।
বিহারে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্য ও পরিকল্পিত হামলার যে চিত্র মানবাধিকার রিপোর্টগুলোতে উঠে আসছে, রওশন খাতুনের মৃত্যু তারই একটি প্রতিচ্ছবি। এই ঘটনায় একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় তদন্ত এখন সময়ের দাবি। দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাদের অবহেলা এবং আসামিদের আড়াল করার যে অভিযোগ উঠেছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও প্রকট হবে। সচেতন নাগরিক হিসেবে এটি স্পষ্ট যে, কেবল আইনি প্রক্রিয়াই নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক সুরক্ষাই পারে এমন বর্বরতা রোধ করতে। রওশন খাতুনের এতিম সন্তানদের আর্তনাদ আজ ইনসাফ ও প্রকৃত আইনের শাসনের দাবি জানাচ্ছে।
বিষয় : ভারত

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ মার্চ ২০২৬
ভারতের বিহার রাজ্যের মধুবাণী জেলায় রোজা রাখা অবস্থায় এক মুসলিম নারীকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিহতের পরিবারের দাবি, স্থানীয় প্রভাবশালীরা কেবল শারীরিক নির্যাতনই করেনি, বরং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে তাকে প্রস্রাব মিশ্রিত মদ পানে বাধ্য করেছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত মাত্র একজনকে গ্রেফতার করায় ন্যায়বিচার নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা গ্রামের মুখিয়া (ইউপি চেয়ারম্যান) কুমারী দেবী এবং তার অনুসারীদের পক্ষ থেকে এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, অভিযুক্ত পক্ষ এটিকে একটি সাধারণ 'গ্রাম্য বিবাদ' হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছে। পুলিশের প্রাথমিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, বিষয়টি তদন্তাধীন এবং সব অভিযোগ এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। প্রশাসনের একাংশের দাবি, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং তদন্তের স্বার্থেই সময় প্রয়োজন। তবে ১৯ জন নামধারী আসামির মধ্যে ১৮ জনই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো সত্ত্বেও তাদের গ্রেফতার না করার বিষয়ে পুলিশ সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করেনি।
ঘটনাটি শুরু হয় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বিহারের মধুবাণী জেলার ঘোগারডিহা ব্লকের আমহি গ্রামের বাসিন্দা রওশন খাতুন একটি স্থানীয় বিবাদ মীমাংসার জন্য গ্রাম প্রধান কুমারী দেবীর বাড়িতে যান। নিহতের স্বামী মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের ভাষ্যমতে, সেখানে আলোচনার পরিবর্তে মুখিয়ার ছেলে ও তার সহযোগীরা রওশনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের বর্ণনা:
শাহাবুদ্দিন জানান, রওশনকে লাঠি ও জুতো দিয়ে নির্বিচারে মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে তাকে টেনে-হিঁচড়ে বাড়ির প্রবেশদ্বারে বেঁধে রাখা হয়। রওশন খাতুন তখন রোজা অবস্থায় ছিলেন। প্রচণ্ড তৃষ্ণায় তিনি পানি চাইলে হামলাকারীরা তাকে পানি না দিয়ে অত্যন্ত অবমাননাকরভাবে প্রস্রাব মিশ্রিত মদ পান করতে বাধ্য করে। শাহাবুদ্দিনের অভিযোগ, "আমার স্ত্রীকে পশুর মতো পেটানো হয়েছে। সে মুসলিম বলেই তাকে এভাবে টার্গেট করা হয়েছে এবং আমাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার জন্য এই জঘন্য কাজ করা হয়েছে।"
মারধরের পর গুরুতর আহত রওশনকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল এবং পরে পাটনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ মার্চ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিহতের তিনটি ছোট শিশু এখন মাতৃহীন। পরিবারটি অত্যন্ত দরিদ্র হওয়ায় তারা আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছে। তাদের আরও অভিযোগ, ঘটনার পর পুলিশ তাদের সহায়তা করার বদলে থানায় আটকে রেখে ঘুষ দাবি করেছে এবং মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছে।
মানবাধিকার কর্মী এবং আইনজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ (জীবনের অধিকার) এবং অনুচ্ছেদ ২৫ (ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার) এর চরম লঙ্ঘন। ১৯ জনের বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR) হওয়া সত্ত্বেও মাত্র একজনকে গ্রেফতার করা পুলিশের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিককে লক্ষ্যবস্তু করা এবং তাকে অমানবিক নির্যাতন করা গুরুতর অপরাধ।
বিহারে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্য ও পরিকল্পিত হামলার যে চিত্র মানবাধিকার রিপোর্টগুলোতে উঠে আসছে, রওশন খাতুনের মৃত্যু তারই একটি প্রতিচ্ছবি। এই ঘটনায় একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় তদন্ত এখন সময়ের দাবি। দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাদের অবহেলা এবং আসামিদের আড়াল করার যে অভিযোগ উঠেছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও প্রকট হবে। সচেতন নাগরিক হিসেবে এটি স্পষ্ট যে, কেবল আইনি প্রক্রিয়াই নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক সুরক্ষাই পারে এমন বর্বরতা রোধ করতে। রওশন খাতুনের এতিম সন্তানদের আর্তনাদ আজ ইনসাফ ও প্রকৃত আইনের শাসনের দাবি জানাচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন