শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

ঝাড়খণ্ড, বিহার ও মহারাষ্ট্রে প্রকাশ্য রাজপথে ফ্রিজ ও সুটকেসে খণ্ডিত দেহের বীভৎস প্রদর্শন; সাম্প্রদায়িক উস্কানির অভিযোগ

ভারতে রামনবমীর শোভাযাত্রায় বিভ্রান্তিকর নাট্যচিত্র: মুসলিমদের দানবীয় উপস্থাপন



ভারতে রামনবমীর শোভাযাত্রায় বিভ্রান্তিকর নাট্যচিত্র: মুসলিমদের দানবীয় উপস্থাপন

ভারতের ঝাড়খণ্ড, বিহার ও মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে রামনবমীর শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে মুসলিম বিদ্বেষী প্রোপাগান্ডা ও কাল্পনিক 'লাভ জিহাদ' তত্ত্বের চরম ও বীভৎস রূপ প্রদর্শিত হয়েছে। ধর্মীয় উৎসবের আড়ালে প্রকাশ্য রাজপথে মুসলিম পোশাক পরিহিত কুশীলবদের মাধ্যমে হিন্দু নারীদের হত্যা ও মরদেহ টুকরো করার নাটকীয় দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়। এই ঘটনাপ্রবাহ ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শোভাযাত্রার আয়োজক এবং সংশ্লিষ্ট হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর দাবি, তারা সমাজের হিন্দু নারীদের "সচেতন" করার লক্ষ্যে এই ধরনের প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। বিহারের বৈশালীতে প্রদর্শিত একটি পোস্টারে স্লোগান দেওয়া হয়— "বোন, তুমি দুর্গা হও, কালী হও, কিন্তু লাভ জিহাদের শিকার হয়ো না।" তাদের দাবি, মুসলিম যুবকরা পরিচয় গোপন করে হিন্দু নারীদের প্রেমের জালে আবদ্ধ করে এবং পরবর্তীতে তাদের ধর্মান্তরিত বা হত্যা করে। মহারাষ্ট্রের পুনেতে প্রদর্শিত একটি ট্যাবলু বা ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনীতে বিতর্কিত 'দ্য কেরালা স্টোরি' চলচ্চিত্রের দৃশ্য ব্যবহার করে দাবি করা হয় যে, এটি কোনো কাল্পনিক বিষয় নয় বরং বর্তমানের রূঢ় বাস্তবতা। তবে এই দাবির সপক্ষে কোনো দাপ্তরিক বা আইনি পরিসংখ্যান তারা উপস্থাপন করতে পারেনি।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঝাড়খণ্ডের চাতরা জেলার গিদ্ধোর এলাকায় রামনবমীর শোভাযাত্রায় এক ভয়াবহ নাটকের অবতারণা করা হয়।

  • নাটকে কয়েকজন অভিনেতাকে সাদা কুর্তা, দাড়ি এবং টুপি পরে 'মুসলিম' সাজানো হয়। তারা তলোয়ার দিয়ে এক নারীকে (অভিনেত্রী) আক্রমণ করে। ওই নারী মাটিতে লুটিয়ে পড়লে অভিনেতারা সংলাপ দেয়— "ও তো মারা গেছে মৌলভি সাহেব, এখন কী করব?" উত্তরে 'মৌলভি' চরিত্রটি বলে— "একে দাফন করে দাও।" এরপর জনসম্মুখে ওই নারীর দেহ টুকরো করে বস্তায় ভরার অভিনয় করা হয়।
  • পুনের ধায়ারি গ্রামে একটি চলন্ত প্রদর্শনীতে দেখা যায়, এক মুসলিম যুবক একটি রক্তমাখা ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার সামনে একটি ফ্রিজ ও সুটকেস রাখা, যা মানুষের খণ্ডিত ও রক্তমাখা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ঠাসা। সেখানে সংলাপ লেখা ছিল— "এটাই হবে তোমাদের শেষ পরিণতি।"
  • এই প্রদর্শনীগুলো সরাসরি মুসলিম সম্প্রদায়ের পোশাক, ধর্মীয় পরিচিতি ও জীবনযাত্রাকে অপরাধী হিসেবে চিত্রায়িত করছে। সাধারণ মুসলিম নাগরিকরা, বিশেষ করে যারা এসব এলাকায় বসবাস করেন, তারা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক বয়কটের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। শিশুদের সামনে এই বীভৎস দৃশ্য প্রদর্শন আগামীর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিষিয়ে তুলছে। যদিও গিদ্ধোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (SHO) জানিয়েছেন যে, বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার রিপোর্ট তার কাছে নেই, তবে ভিডিও চিত্রগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বারবার 'হেট স্পিচ' বা ঘৃণ্য বক্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। 'লাভ জিহাদ' মূলত একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে পরিচিত, যার কোনো আইনি ভিত্তি ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সংসদে খুঁজে পায়নি।

ভারতীয় সংবিধানের ২৫ ও ২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিজ ধর্ম পালনের অধিকার থাকলেও, তা অন্য কোনো সম্প্রদায়কে হেয় প্রতিপন্ন করা বা সহিংসতা উস্কে দেওয়ার লাইসেন্স দেয় না। প্রকাশ্য রাস্তায় একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষকে 'খুনি' বা 'দানব' হিসেবে উপস্থাপন করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের (ICCPR) ২০ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী, যা সাম্প্রদায়িক ঘৃণার প্রচার নিষিদ্ধ করে। এই ধরনের উস্কানিমূলক প্রদর্শনীর বিরুদ্ধে প্রশাসনের নীরবতা বা 'রিপোর্ট নেই' বলে এড়িয়ে যাওয়া ন্যায়বিচারের পথকে রুদ্ধ করে। সচেতন মহলের দাবি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় অবিলম্বে এই ধরনের বিদ্বেষী প্রোপাগান্ডা বন্ধে প্রশাসনকে স্বচ্ছ তদন্ত ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।

ধর্মীয় উৎসব হোক আধ্যাত্মিকতা ও সহমর্মিতার মেলবন্ধন, ঘৃণার আধার নয়। ভারতের মতো বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে মুসলিমদের অস্তিত্ব ও মর্যাদাকে কাল্পনিক তত্ত্বের ভিত্তিতে ভূলুণ্ঠিত করা একটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। ন্যায়বিচারের স্বার্থে রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগকে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


ভারতে রামনবমীর শোভাযাত্রায় বিভ্রান্তিকর নাট্যচিত্র: মুসলিমদের দানবীয় উপস্থাপন

প্রকাশের তারিখ : ৩১ মার্চ ২০২৬

featured Image

ভারতের ঝাড়খণ্ড, বিহার ও মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে রামনবমীর শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে মুসলিম বিদ্বেষী প্রোপাগান্ডা ও কাল্পনিক 'লাভ জিহাদ' তত্ত্বের চরম ও বীভৎস রূপ প্রদর্শিত হয়েছে। ধর্মীয় উৎসবের আড়ালে প্রকাশ্য রাজপথে মুসলিম পোশাক পরিহিত কুশীলবদের মাধ্যমে হিন্দু নারীদের হত্যা ও মরদেহ টুকরো করার নাটকীয় দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়। এই ঘটনাপ্রবাহ ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শোভাযাত্রার আয়োজক এবং সংশ্লিষ্ট হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর দাবি, তারা সমাজের হিন্দু নারীদের "সচেতন" করার লক্ষ্যে এই ধরনের প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। বিহারের বৈশালীতে প্রদর্শিত একটি পোস্টারে স্লোগান দেওয়া হয়— "বোন, তুমি দুর্গা হও, কালী হও, কিন্তু লাভ জিহাদের শিকার হয়ো না।" তাদের দাবি, মুসলিম যুবকরা পরিচয় গোপন করে হিন্দু নারীদের প্রেমের জালে আবদ্ধ করে এবং পরবর্তীতে তাদের ধর্মান্তরিত বা হত্যা করে। মহারাষ্ট্রের পুনেতে প্রদর্শিত একটি ট্যাবলু বা ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনীতে বিতর্কিত 'দ্য কেরালা স্টোরি' চলচ্চিত্রের দৃশ্য ব্যবহার করে দাবি করা হয় যে, এটি কোনো কাল্পনিক বিষয় নয় বরং বর্তমানের রূঢ় বাস্তবতা। তবে এই দাবির সপক্ষে কোনো দাপ্তরিক বা আইনি পরিসংখ্যান তারা উপস্থাপন করতে পারেনি।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঝাড়খণ্ডের চাতরা জেলার গিদ্ধোর এলাকায় রামনবমীর শোভাযাত্রায় এক ভয়াবহ নাটকের অবতারণা করা হয়।

  • নাটকে কয়েকজন অভিনেতাকে সাদা কুর্তা, দাড়ি এবং টুপি পরে 'মুসলিম' সাজানো হয়। তারা তলোয়ার দিয়ে এক নারীকে (অভিনেত্রী) আক্রমণ করে। ওই নারী মাটিতে লুটিয়ে পড়লে অভিনেতারা সংলাপ দেয়— "ও তো মারা গেছে মৌলভি সাহেব, এখন কী করব?" উত্তরে 'মৌলভি' চরিত্রটি বলে— "একে দাফন করে দাও।" এরপর জনসম্মুখে ওই নারীর দেহ টুকরো করে বস্তায় ভরার অভিনয় করা হয়।
  • পুনের ধায়ারি গ্রামে একটি চলন্ত প্রদর্শনীতে দেখা যায়, এক মুসলিম যুবক একটি রক্তমাখা ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার সামনে একটি ফ্রিজ ও সুটকেস রাখা, যা মানুষের খণ্ডিত ও রক্তমাখা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ঠাসা। সেখানে সংলাপ লেখা ছিল— "এটাই হবে তোমাদের শেষ পরিণতি।"
  • এই প্রদর্শনীগুলো সরাসরি মুসলিম সম্প্রদায়ের পোশাক, ধর্মীয় পরিচিতি ও জীবনযাত্রাকে অপরাধী হিসেবে চিত্রায়িত করছে। সাধারণ মুসলিম নাগরিকরা, বিশেষ করে যারা এসব এলাকায় বসবাস করেন, তারা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক বয়কটের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। শিশুদের সামনে এই বীভৎস দৃশ্য প্রদর্শন আগামীর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিষিয়ে তুলছে। যদিও গিদ্ধোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (SHO) জানিয়েছেন যে, বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার রিপোর্ট তার কাছে নেই, তবে ভিডিও চিত্রগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বারবার 'হেট স্পিচ' বা ঘৃণ্য বক্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। 'লাভ জিহাদ' মূলত একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে পরিচিত, যার কোনো আইনি ভিত্তি ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সংসদে খুঁজে পায়নি।

ভারতীয় সংবিধানের ২৫ ও ২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিজ ধর্ম পালনের অধিকার থাকলেও, তা অন্য কোনো সম্প্রদায়কে হেয় প্রতিপন্ন করা বা সহিংসতা উস্কে দেওয়ার লাইসেন্স দেয় না। প্রকাশ্য রাস্তায় একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষকে 'খুনি' বা 'দানব' হিসেবে উপস্থাপন করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের (ICCPR) ২০ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী, যা সাম্প্রদায়িক ঘৃণার প্রচার নিষিদ্ধ করে। এই ধরনের উস্কানিমূলক প্রদর্শনীর বিরুদ্ধে প্রশাসনের নীরবতা বা 'রিপোর্ট নেই' বলে এড়িয়ে যাওয়া ন্যায়বিচারের পথকে রুদ্ধ করে। সচেতন মহলের দাবি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় অবিলম্বে এই ধরনের বিদ্বেষী প্রোপাগান্ডা বন্ধে প্রশাসনকে স্বচ্ছ তদন্ত ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।

ধর্মীয় উৎসব হোক আধ্যাত্মিকতা ও সহমর্মিতার মেলবন্ধন, ঘৃণার আধার নয়। ভারতের মতো বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে মুসলিমদের অস্তিত্ব ও মর্যাদাকে কাল্পনিক তত্ত্বের ভিত্তিতে ভূলুণ্ঠিত করা একটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। ন্যায়বিচারের স্বার্থে রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগকে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত