শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি; বর্ণবাদ ও জাতিগত নির্মূলের প্রস্তুতির গুরুতর অভিযোগ

আসাম ও উত্তরপ্রদেশে মুসলিম নিধনযজ্ঞের আলামত; আন্তর্জাতিক প্যানেলের উদ্বেগ



আসাম ও উত্তরপ্রদেশে মুসলিম নিধনযজ্ঞের আলামত; আন্তর্জাতিক প্যানেলের উদ্বেগ

ভারতের আসাম ও উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর চলমান দমন-পীড়ন ‘অপারথাইড’ বা বর্ণবাদ এবং ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের একটি উচ্চপর্যায়ের প্যানেল। গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) লন্ডনের কিংস কলেজে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্যানেলটি জানিয়েছে, এই দুই রাজ্যে মুসলিমদের ওপর পরিকল্পিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে নির্যাতন চালানো হচ্ছে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণে একে 'জাতিগত নির্মূলের প্রস্তুতি' হিসেবে অভিহিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভারতের সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকরা এই কর্মকাণ্ডকে দীর্ঘ দিন ধরে ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা’ এবং ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নিয়ন্ত্রণ’ হিসেবে দাবি করে আসছেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এবং উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ—উভয়েই নিজ নিজ রাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, বুলডোজার অভিযান বা উচ্ছেদ ড্রাইভগুলো কেবল অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি পদক্ষেপ। এছাড়া, নাগরিকত্ব যাচাইকরণ প্রক্রিয়াকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দাবি করা হয়। সরকারি পক্ষ থেকে বরাবরই উস্কানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে এবং জানানো হয়েছে যে, পুলিশ কেবল অপরাধীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিচ্ছে।

‘উত্তরপ্রদেশ ও আসামে মুসলিমদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন: ২০২২-২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কালকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, সার্বিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের তিন বিশিষ্ট মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ এই অনুসন্ধান চালান।

আসামের চিত্র: প্রতিবেদনে দেখা যায়, আসামে বিশেষত বাংলাভাষী মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে অন্তত ২,৪৫০ জন বাংলাভাষী মুসলিমকে দেশছাড়া করা হয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৭,৬০০ পরিবারকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। রাজ্য সরকার এই জনগোষ্ঠীকে 'অনুপ্রবেশকারী' এবং 'জনতাত্ত্বিক হুমকি' হিসেবে চিত্রায়িত করছে, যা জাতিগত নির্মূলের প্রেক্ষাপট তৈরি করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

উত্তরপ্রদেশের চিত্র: উত্তরপ্রদেশে পুলিশের হেফাজতে ‘হাফ-এনকাউন্টার’ বা পঙ্গু করে দেওয়ার ঘটনাকে ‘পদ্ধতিগত নির্যাতন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সিভিল সোসাইটির প্রতিবাদ দমনে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া (বুলডোজার জাস্টিস), মাংস ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের ওপর বৈষম্যমূলক আইনি খড়্গ এবং ধর্মান্তরবিরোধী আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ কোটি ৩০ লাখ মুসলিম অধ্যুষিত এই দুই রাজ্যে মুসলিমরা বর্তমানে বিচারের ক্ষেত্রে চরম বাধার সম্মুখীন।

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ স্টিফেন র‍্যাপ এবং তার দল এই অপরাধগুলোকে রোম সংবিধি (Rome Statute) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) মানদণ্ডে বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে পদ্ধতিগতভাবে অধিকারবঞ্চিত করা সরাসরি ‘অপারথাইড’ বা বর্ণবাদ।

জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের কাছে প্যানেলটি অবিলম্বে একটি স্বাধীন ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে:

  • জবাবদিহিতা: মুখ্যমন্ত্রী পর্যায়ের ব্যক্তিদের উস্কানিমূলক বক্তব্যের জন্য আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় দায়বদ্ধ করতে হবে।
  • মানবাধিকার: ভারতের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তি (ICCPR) অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা।
  • আইনি হস্তক্ষেপ: ভারতের সুপ্রিম কোর্টকে সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষায় ঝুলে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।

এই সংকটময় মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কেবল উদ্বেগ প্রকাশ নয়, বরং অপরাধীদের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা (Targeted Sanctions) আরোপের মাধ্যমে ইনসাফ কায়েমে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


আসাম ও উত্তরপ্রদেশে মুসলিম নিধনযজ্ঞের আলামত; আন্তর্জাতিক প্যানেলের উদ্বেগ

প্রকাশের তারিখ : ০২ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

ভারতের আসাম ও উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর চলমান দমন-পীড়ন ‘অপারথাইড’ বা বর্ণবাদ এবং ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের একটি উচ্চপর্যায়ের প্যানেল। গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) লন্ডনের কিংস কলেজে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্যানেলটি জানিয়েছে, এই দুই রাজ্যে মুসলিমদের ওপর পরিকল্পিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে নির্যাতন চালানো হচ্ছে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণে একে 'জাতিগত নির্মূলের প্রস্তুতি' হিসেবে অভিহিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভারতের সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকরা এই কর্মকাণ্ডকে দীর্ঘ দিন ধরে ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা’ এবং ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নিয়ন্ত্রণ’ হিসেবে দাবি করে আসছেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এবং উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ—উভয়েই নিজ নিজ রাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, বুলডোজার অভিযান বা উচ্ছেদ ড্রাইভগুলো কেবল অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি পদক্ষেপ। এছাড়া, নাগরিকত্ব যাচাইকরণ প্রক্রিয়াকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দাবি করা হয়। সরকারি পক্ষ থেকে বরাবরই উস্কানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে এবং জানানো হয়েছে যে, পুলিশ কেবল অপরাধীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিচ্ছে।

‘উত্তরপ্রদেশ ও আসামে মুসলিমদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন: ২০২২-২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কালকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, সার্বিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের তিন বিশিষ্ট মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ এই অনুসন্ধান চালান।

আসামের চিত্র: প্রতিবেদনে দেখা যায়, আসামে বিশেষত বাংলাভাষী মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে অন্তত ২,৪৫০ জন বাংলাভাষী মুসলিমকে দেশছাড়া করা হয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৭,৬০০ পরিবারকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। রাজ্য সরকার এই জনগোষ্ঠীকে 'অনুপ্রবেশকারী' এবং 'জনতাত্ত্বিক হুমকি' হিসেবে চিত্রায়িত করছে, যা জাতিগত নির্মূলের প্রেক্ষাপট তৈরি করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

উত্তরপ্রদেশের চিত্র: উত্তরপ্রদেশে পুলিশের হেফাজতে ‘হাফ-এনকাউন্টার’ বা পঙ্গু করে দেওয়ার ঘটনাকে ‘পদ্ধতিগত নির্যাতন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সিভিল সোসাইটির প্রতিবাদ দমনে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া (বুলডোজার জাস্টিস), মাংস ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের ওপর বৈষম্যমূলক আইনি খড়্গ এবং ধর্মান্তরবিরোধী আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ কোটি ৩০ লাখ মুসলিম অধ্যুষিত এই দুই রাজ্যে মুসলিমরা বর্তমানে বিচারের ক্ষেত্রে চরম বাধার সম্মুখীন।

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ স্টিফেন র‍্যাপ এবং তার দল এই অপরাধগুলোকে রোম সংবিধি (Rome Statute) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) মানদণ্ডে বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে পদ্ধতিগতভাবে অধিকারবঞ্চিত করা সরাসরি ‘অপারথাইড’ বা বর্ণবাদ।

জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের কাছে প্যানেলটি অবিলম্বে একটি স্বাধীন ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে:

  • জবাবদিহিতা: মুখ্যমন্ত্রী পর্যায়ের ব্যক্তিদের উস্কানিমূলক বক্তব্যের জন্য আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় দায়বদ্ধ করতে হবে।
  • মানবাধিকার: ভারতের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তি (ICCPR) অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা।
  • আইনি হস্তক্ষেপ: ভারতের সুপ্রিম কোর্টকে সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষায় ঝুলে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।

এই সংকটময় মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কেবল উদ্বেগ প্রকাশ নয়, বরং অপরাধীদের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা (Targeted Sanctions) আরোপের মাধ্যমে ইনসাফ কায়েমে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত