শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

স্বামীকে প্রকাশ্যে হত্যার পর আসামিদের ক্রমাগত হুমকিতে দিশেহারা পরিবার; আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন দুই শিশু

স্বামীর হত্যার পর বিচারহীনতা ও ক্রমাগত হুমকির আতঙ্কে দুই সন্তানসহ মুসলিম গৃহবধূর আত্মহনন



স্বামীর হত্যার পর বিচারহীনতা ও ক্রমাগত হুমকির আতঙ্কে দুই সন্তানসহ মুসলিম গৃহবধূর আত্মহনন

ভারতের বিহার রাজ্যে উগ্রবাদী সহিংসতার এক নৃশংস অধ্যায় যুক্ত হলো। গত ২৪ মার্চ এক মুসলিম যুবককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার পর, বিচার না পাওয়া এবং আসামিদের ক্রমাগত হুমকিতে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁর স্ত্রী দুই সন্তানসহ বিষপান করেছেন। এই ঘটনায় গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে এবং তাঁর দুই শিশু সন্তান মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে।

সাসারাম জেলা পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের দাবি অনুযায়ী, এই ঘটনার সূত্রপাত মূলত একটি জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে। গত ২৪ মার্চ হাসান রাজা খান (৩২) নামক ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনাটিকে স্থানীয় কিছু গোষ্ঠী 'তাৎক্ষণিক উত্তেজনা' হিসেবে বর্ণনা করেছে। অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এটি কোনো সাম্প্রদায়িক হামলা নয় বরং ব্যক্তিগত বিরোধের জের। রোহতাস জেলা পুলিশ সুপার রওশন কুমার জানিয়েছেন, হাসান হত্যার ঘটনায় ৮ জন অভিযুক্তের মধ্যে ইতোমধ্যে ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, তারা আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছেন এবং বাকি আসামিদের ধরার জন্য পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তবে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে পরিবারকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগটি স্থানীয় প্রশাসন তদন্তসাপেক্ষ বলে উল্লেখ করেছে।

গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দিবাগত রাতে বিহারের রোহতাস জেলার বাসিন্দা রেশমা খাতুন তাঁর চার বছর বয়সী মেয়ে তাইয়্যেবা এবং দেড় বছর বয়সী ছেলে হামজাদকে নিয়ে বিষপান করেন। মঙ্গলবার সকালে দীর্ঘক্ষণ ঘর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীরা দরজা ভেঙে তাঁদের সংজ্ঞাহীন অবস্থায় উদ্ধার করে। প্রথমে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে বারানসিতে স্থানান্তরের পর রেশমা খাতুন ইন্তেকাল করেন।

এই ট্র্যাজেডির মূলে রয়েছে গত ২৪ মার্চের একটি নৃশংস ঘটনা। রেশমার স্বামী হাসান রাজা খানকে জমি সংক্রান্ত তুচ্ছ অজুহাতে প্রকাশ্য রাজপথে হাত-পা বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সেই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাসানকে জনসমক্ষে পিটিয়ে মারা হলেও কেউ উদ্ধারে এগিয়ে আসেনি। স্বামীর এমন অকাল ও নৃশংস মৃত্যু এবং এরপর পলাতক আসামিদের পক্ষ থেকে ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকির কারণে রেশমা খাতুন গভীর মানসিক ট্রমার মধ্যে ছিলেন। পরিবারটির অভিযোগ, মূল অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল এবং মামলা তুলে নিতে চাপ দিচ্ছিল, যা রেশমাকে চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।

ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে বিহারের এই ঘটনাটি বিচারহীনতার এক ভয়াবহ সংস্কৃতিকে সামনে এনেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, গণপিটুনির ঘটনায় প্রশাসনের শ্লথ গতি ও আসামিদের রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আরও বেশি নিরাপত্তাহীন করে তোলে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, কোনো অপরাধের শিকার হওয়া ব্যক্তির পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব।

হাসান রাজা খানের হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তীতে তাঁর স্ত্রীর আত্মহনন কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং এটি সামাজিক চরম অবমাননা। প্রশ্ন উঠেছে, কেন ভিডিও প্রমাণ থাকার পরেও প্রধান আসামিরা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে? কেন একজন বিধবাকে তাঁর সন্তানদের নিয়ে মরার পথ বেছে নিতে হলো? এই ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে তা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর ওপর বড় আঘাত হিসেবে পরিগণিত হবে।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


স্বামীর হত্যার পর বিচারহীনতা ও ক্রমাগত হুমকির আতঙ্কে দুই সন্তানসহ মুসলিম গৃহবধূর আত্মহনন

প্রকাশের তারিখ : ০২ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

ভারতের বিহার রাজ্যে উগ্রবাদী সহিংসতার এক নৃশংস অধ্যায় যুক্ত হলো। গত ২৪ মার্চ এক মুসলিম যুবককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার পর, বিচার না পাওয়া এবং আসামিদের ক্রমাগত হুমকিতে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁর স্ত্রী দুই সন্তানসহ বিষপান করেছেন। এই ঘটনায় গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে এবং তাঁর দুই শিশু সন্তান মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে।

সাসারাম জেলা পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের দাবি অনুযায়ী, এই ঘটনার সূত্রপাত মূলত একটি জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে। গত ২৪ মার্চ হাসান রাজা খান (৩২) নামক ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনাটিকে স্থানীয় কিছু গোষ্ঠী 'তাৎক্ষণিক উত্তেজনা' হিসেবে বর্ণনা করেছে। অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এটি কোনো সাম্প্রদায়িক হামলা নয় বরং ব্যক্তিগত বিরোধের জের। রোহতাস জেলা পুলিশ সুপার রওশন কুমার জানিয়েছেন, হাসান হত্যার ঘটনায় ৮ জন অভিযুক্তের মধ্যে ইতোমধ্যে ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, তারা আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছেন এবং বাকি আসামিদের ধরার জন্য পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তবে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে পরিবারকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগটি স্থানীয় প্রশাসন তদন্তসাপেক্ষ বলে উল্লেখ করেছে।

গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দিবাগত রাতে বিহারের রোহতাস জেলার বাসিন্দা রেশমা খাতুন তাঁর চার বছর বয়সী মেয়ে তাইয়্যেবা এবং দেড় বছর বয়সী ছেলে হামজাদকে নিয়ে বিষপান করেন। মঙ্গলবার সকালে দীর্ঘক্ষণ ঘর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীরা দরজা ভেঙে তাঁদের সংজ্ঞাহীন অবস্থায় উদ্ধার করে। প্রথমে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে বারানসিতে স্থানান্তরের পর রেশমা খাতুন ইন্তেকাল করেন।

এই ট্র্যাজেডির মূলে রয়েছে গত ২৪ মার্চের একটি নৃশংস ঘটনা। রেশমার স্বামী হাসান রাজা খানকে জমি সংক্রান্ত তুচ্ছ অজুহাতে প্রকাশ্য রাজপথে হাত-পা বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সেই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাসানকে জনসমক্ষে পিটিয়ে মারা হলেও কেউ উদ্ধারে এগিয়ে আসেনি। স্বামীর এমন অকাল ও নৃশংস মৃত্যু এবং এরপর পলাতক আসামিদের পক্ষ থেকে ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকির কারণে রেশমা খাতুন গভীর মানসিক ট্রমার মধ্যে ছিলেন। পরিবারটির অভিযোগ, মূল অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল এবং মামলা তুলে নিতে চাপ দিচ্ছিল, যা রেশমাকে চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।

ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে বিহারের এই ঘটনাটি বিচারহীনতার এক ভয়াবহ সংস্কৃতিকে সামনে এনেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, গণপিটুনির ঘটনায় প্রশাসনের শ্লথ গতি ও আসামিদের রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আরও বেশি নিরাপত্তাহীন করে তোলে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, কোনো অপরাধের শিকার হওয়া ব্যক্তির পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব।

হাসান রাজা খানের হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তীতে তাঁর স্ত্রীর আত্মহনন কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং এটি সামাজিক চরম অবমাননা। প্রশ্ন উঠেছে, কেন ভিডিও প্রমাণ থাকার পরেও প্রধান আসামিরা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে? কেন একজন বিধবাকে তাঁর সন্তানদের নিয়ে মরার পথ বেছে নিতে হলো? এই ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে তা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর ওপর বড় আঘাত হিসেবে পরিগণিত হবে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত