শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

ভারতের রাজধানীতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা; বৈধ নথির অভাবে মৌলিক অধিকার ও জীবিকা থেকে বঞ্চিত হাজারো পরিবার

দিল্লীর রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন: নাগরিকত্বহীনতা ও কর্মসংস্থানের সংকট



দিল্লীর রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন: নাগরিকত্বহীনতা ও কর্মসংস্থানের সংকট

মিয়ানমারে জাতিগত নিধনযজ্ঞ থেকে বাঁচতে ভারতে আশ্রয় নেওয়া হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বর্তমানে দিল্লীর বিভিন্ন বস্তিতে চরম অনিশ্চয়তা ও অভাবের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে আশ্রিত থাকা সত্ত্বেও কোনো বৈধ পরিচয়পত্র না থাকায় তারা শিক্ষা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সম্মানজনক পেশা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ভারতের কঠোর আইনি কাঠামো এবং শরণার্থী নীতি না থাকার ফলে এই জনগোষ্ঠী এখন এক প্রকার ‘মানবেতর’ জীবনযুদ্ধে লিপ্ত।

ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়েছে। ২০১৭ সালে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া এক হলফনামায় উল্লেখ করেছিল যে, ভারতে প্রায় ৪০,০০০-এর বেশি রোহিঙ্গা অবৈধভাবে বসবাস করছে। যেহেতু ভারত ১৯৫১ সালের জাতিসংঘ শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়, তাই দেশটি রোহিঙ্গাদের আনুষ্ঠানিকভাবে 'শরণার্থী' হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। সরকারি মহলের দাবি অনুযায়ী, যথাযথ নথিহীন ব্যক্তিদের ব্যাংকিং সুবিধা বা আধার কার্ডের মতো নাগরিক সুবিধা প্রদান করা দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্থী। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও নিয়োগকর্তারা নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে তাদের কর্মসংস্থান প্রদানে অনীহা প্রকাশ করেন। তাদের মতে, পর্যাপ্ত পরিচয় নিশ্চিত না করে কাজ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

দিল্লীর শাহীনবাগ, কাঞ্চন কুঞ্জ, শ্রম বিহার ও খাজুরি খাসের মতো ঘিঞ্জি বস্তিগুলোতে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের জীবন আজ ঘোর সংকটে। মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রহীন হওয়া এই জনগোষ্ঠী ভারতে এসেও নতুন সংকটের মুখোমুখি।

শিক্ষিত হয়েও দিনমজুর: দিল্লীর শাহীনবাগের একটি হস্তশিল্পের দোকানে কাজ করেন ৩৩ বছর বয়সী সোহাইল খান। মনোবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও কেবল 'আধার কার্ড' না থাকায় তিনি কোনো সম্মানজনক চাকরি পাচ্ছেন না। সোহাইল তার এই জীবনকে ‘কুকুরের জীবনের’ (Dog's life) সাথে তুলনা করেছেন।

নথির প্রতিবন্ধকতা: ৩২ বছর বয়সী আমিনা খাতুন এবং ৩৫ বছর বয়সী আবদুল্লাহর মতো অসংখ্য শরণার্থী জানান যে, জাতিসংঘ (UNHCR) প্রদত্ত শরণার্থী কার্ড ভারতের কোথাও পরিচয়পত্র হিসেবে গ্রহণ করা হয় না। ফলে তারা সিকিউরিটি গার্ড বা কোনো কারখানায় কাজ পাওয়ার যোগ্য হলেও তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আর্থিক বঞ্চনা ও শোষণ: বৈধ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকায় তারা আধুনিক ডিজিটাল লেনদেন (UPI/Paytm) থেকে বিচ্ছিন্ন। এছাড়া দিনমজুর হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তারা প্রায়ই মজুরি চুরির শিকার হন। ২৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ জুবায়ের জানান, উত্তরপ্রদেশের একটি কসাইখানায় কাজ করার সময় তার বেতন ছিল ১৭,০০০ টাকা, কিন্তু পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করায় তাকে চাকরি ছাড়তে হয়।

গ্রেফতার ও দেশান্তরের আতঙ্ক: হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে, ভারতে শত শত রোহিঙ্গাকে বিনাবিচারে আটক রাখা হয়েছে। প্রতিমুহূর্তে গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে তারা দীর্ঘমেয়াদী কোনো কাজে যুক্ত হতে পারছেন না।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করে, রোহিঙ্গাদের এই রাষ্ট্রহীন অবস্থা তাদের মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। 'দি আজাদী প্রজেক্ট'-এর গবেষক অঙ্কিতা দান উল্লেখ করেছেন যে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং কাজের অনুমতি ছাড়া কোনো ত্রাণ কার্যক্রমই টেকসই হবে না।

জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী রোহিঙ্গারা বিশ্বের অন্যতম নির্যাতিত সংখ্যালঘু। ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার নাগরিক-অনাগরিক নির্বিশেষে সকলের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু বর্তমানে রোহিঙ্গাদের যেভাবে মৌলিক জীবিকা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী। একটি সুশৃঙ্খল যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের অস্থায়ী কাজের অনুমতি প্রদান করা হলে তারা যেমন শোষণ থেকে মুক্তি পেতেন, তেমনি অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমত। 

এই মজলুম অংশের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ এবং স্বচ্ছ আইনি কাঠামোর আওতায় তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। মানবিক মর্যাদার স্বার্থে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের একটি সম্মানজনক রাজনৈতিক ও আইনি সমাধান প্রয়োজন।

বিষয় : রোহিঙ্গা ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


দিল্লীর রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন: নাগরিকত্বহীনতা ও কর্মসংস্থানের সংকট

প্রকাশের তারিখ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

মিয়ানমারে জাতিগত নিধনযজ্ঞ থেকে বাঁচতে ভারতে আশ্রয় নেওয়া হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বর্তমানে দিল্লীর বিভিন্ন বস্তিতে চরম অনিশ্চয়তা ও অভাবের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে আশ্রিত থাকা সত্ত্বেও কোনো বৈধ পরিচয়পত্র না থাকায় তারা শিক্ষা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সম্মানজনক পেশা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ভারতের কঠোর আইনি কাঠামো এবং শরণার্থী নীতি না থাকার ফলে এই জনগোষ্ঠী এখন এক প্রকার ‘মানবেতর’ জীবনযুদ্ধে লিপ্ত।

ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়েছে। ২০১৭ সালে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া এক হলফনামায় উল্লেখ করেছিল যে, ভারতে প্রায় ৪০,০০০-এর বেশি রোহিঙ্গা অবৈধভাবে বসবাস করছে। যেহেতু ভারত ১৯৫১ সালের জাতিসংঘ শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়, তাই দেশটি রোহিঙ্গাদের আনুষ্ঠানিকভাবে 'শরণার্থী' হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। সরকারি মহলের দাবি অনুযায়ী, যথাযথ নথিহীন ব্যক্তিদের ব্যাংকিং সুবিধা বা আধার কার্ডের মতো নাগরিক সুবিধা প্রদান করা দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্থী। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও নিয়োগকর্তারা নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে তাদের কর্মসংস্থান প্রদানে অনীহা প্রকাশ করেন। তাদের মতে, পর্যাপ্ত পরিচয় নিশ্চিত না করে কাজ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

দিল্লীর শাহীনবাগ, কাঞ্চন কুঞ্জ, শ্রম বিহার ও খাজুরি খাসের মতো ঘিঞ্জি বস্তিগুলোতে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের জীবন আজ ঘোর সংকটে। মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রহীন হওয়া এই জনগোষ্ঠী ভারতে এসেও নতুন সংকটের মুখোমুখি।

শিক্ষিত হয়েও দিনমজুর: দিল্লীর শাহীনবাগের একটি হস্তশিল্পের দোকানে কাজ করেন ৩৩ বছর বয়সী সোহাইল খান। মনোবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও কেবল 'আধার কার্ড' না থাকায় তিনি কোনো সম্মানজনক চাকরি পাচ্ছেন না। সোহাইল তার এই জীবনকে ‘কুকুরের জীবনের’ (Dog's life) সাথে তুলনা করেছেন।

নথির প্রতিবন্ধকতা: ৩২ বছর বয়সী আমিনা খাতুন এবং ৩৫ বছর বয়সী আবদুল্লাহর মতো অসংখ্য শরণার্থী জানান যে, জাতিসংঘ (UNHCR) প্রদত্ত শরণার্থী কার্ড ভারতের কোথাও পরিচয়পত্র হিসেবে গ্রহণ করা হয় না। ফলে তারা সিকিউরিটি গার্ড বা কোনো কারখানায় কাজ পাওয়ার যোগ্য হলেও তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আর্থিক বঞ্চনা ও শোষণ: বৈধ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকায় তারা আধুনিক ডিজিটাল লেনদেন (UPI/Paytm) থেকে বিচ্ছিন্ন। এছাড়া দিনমজুর হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তারা প্রায়ই মজুরি চুরির শিকার হন। ২৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ জুবায়ের জানান, উত্তরপ্রদেশের একটি কসাইখানায় কাজ করার সময় তার বেতন ছিল ১৭,০০০ টাকা, কিন্তু পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করায় তাকে চাকরি ছাড়তে হয়।

গ্রেফতার ও দেশান্তরের আতঙ্ক: হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে, ভারতে শত শত রোহিঙ্গাকে বিনাবিচারে আটক রাখা হয়েছে। প্রতিমুহূর্তে গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে তারা দীর্ঘমেয়াদী কোনো কাজে যুক্ত হতে পারছেন না।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করে, রোহিঙ্গাদের এই রাষ্ট্রহীন অবস্থা তাদের মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। 'দি আজাদী প্রজেক্ট'-এর গবেষক অঙ্কিতা দান উল্লেখ করেছেন যে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং কাজের অনুমতি ছাড়া কোনো ত্রাণ কার্যক্রমই টেকসই হবে না।

জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী রোহিঙ্গারা বিশ্বের অন্যতম নির্যাতিত সংখ্যালঘু। ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার নাগরিক-অনাগরিক নির্বিশেষে সকলের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু বর্তমানে রোহিঙ্গাদের যেভাবে মৌলিক জীবিকা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী। একটি সুশৃঙ্খল যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের অস্থায়ী কাজের অনুমতি প্রদান করা হলে তারা যেমন শোষণ থেকে মুক্তি পেতেন, তেমনি অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমত। 

এই মজলুম অংশের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ এবং স্বচ্ছ আইনি কাঠামোর আওতায় তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। মানবিক মর্যাদার স্বার্থে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের একটি সম্মানজনক রাজনৈতিক ও আইনি সমাধান প্রয়োজন।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত