শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

উত্তরাদেশ ও তেলেঙ্গানায় মুসলিম ও দলিতদের ওপর বর্বরোচিত হামলা; এআই প্রযুক্তির অপব্যবহারে ছড়ানো হচ্ছে ঘৃণা

ভারতে উগ্রপন্থার ভয়াবহ বিস্তার: ফেব্রুয়ারিতেই সংখ্যালঘু নিপিড়ন বেড়েছে ৬০ শতাংশ



ভারতে উগ্রপন্থার ভয়াবহ বিস্তার: ফেব্রুয়ারিতেই সংখ্যালঘু নিপিড়ন বেড়েছে ৬০ শতাংশ

ভারতের মাটিতে সংখ্যালঘু বিশেষ করে মুসলিম ও দলিতদের ওপর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের দাবানল ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মাত্র ২৮ দিনে অন্তত ৬৭টি বড় ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। জানুয়ারি মাসের তুলনায় এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৫৯.৫ শতাংশ, যা দেশটির সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতিকে নির্দেশ করছে।

ভারতের বর্তমান প্রেক্ষাপটে উগ্রবাদী সংগঠন এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারি দল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সংখ্যালঘুদের ওপর এই পদ্ধতিগত নিপীড়নকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার অফিশিয়াল হ্যান্ডেল থেকে এআই (AI) প্রযুক্তিতে তৈরি একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল, যেখানে তাকে সরাসরি দাড়ি ও টুপি পরিহিত মুসলিমদের লক্ষ্য করে গুলি করতে দেখা যায়। সমালোচনার মুখে এটি সরিয়ে নেওয়া হলেও মুখ্যমন্ত্রী উদাসীনভাবে জানিয়েছেন, তিনি এ বিষয়ে "জানতেন না"। এছাড়া বিভিন্ন সমাবেশ থেকে উগ্রবাদী বক্তারা মুসলিমদের অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করার এবং ঘরে অস্ত্র মজুত করার উস্কানি দিচ্ছেন। হিন্দু রক্ষা দলের কর্মীরা প্রকাশ্যে মহাসড়কে "মুসলিমদের জন্য কোনো রাস্তা নেই" লিখেও দাবি করছেন যে, তারা কোনো অন্যায় করেননি। তাদের দাবি—এগুলো জাতীয় নিরাপত্তা ও সংস্কৃতি রক্ষার অংশ, যদিও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এগুলো স্পষ্ট উস্কানি।

ফেব্রুয়ারি মাসের এই ২৮ দিনে ভারতে প্রতি ১০ ঘণ্টায় একটি করে ঘৃণ্য অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল হিমশৈলের চূড়ামাত্র।

  • উত্তরপ্রদেশ: সর্বাধিক ২০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
  • তেলেঙ্গানা: ১৪টি ঘটনার মধ্যে ১৩টিই মুসলিমদের বিরুদ্ধে। হায়দ্রাবাদে ৫টি মামলা হয়েছে।
  • মধ্যপ্রদেশ: বালাঘাট জেলায় ১০টি মুসলিম পরিবারকে সম্পূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করা হয়েছে।

তেলেঙ্গানার ইয়াদাদ্রি ভুবনগিরি জেলায় ঐতিহাসিক জামে মসজিদে রামাদানের প্রাক্কালে মদ ও বিয়ারের বোতল নিক্ষেপ এবং পবিত্র কুরআনের কপি অবমাননার ঘটনা ঘটেছে। কামারেড্ডিতে তারাবির নামাজের সময় লাউডস্পিকারের ভলিউম কমানো নিয়ে বিতণ্ডার জেরে ৬০ জন মুসলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমনকি শিবসেনার মুসলিম বিধায়ক আব্দুল সাত্তার মন্দিরে পূজা দেওয়ায় হিন্দু যুবকরা গোমূত্র ছিটিয়ে মন্দির "পবিত্র" করার মতো চরম অবমাননাকর কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে। দিল্লিতে নিজের কিশোর ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে উমরদীন নামের এক মুসলিম পিতাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আসাম ও তেলেঙ্গানায় ভেন্ডরদের ওপর "ফুড জিহাদ"-এর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে হেনস্তা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও ভারতের সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ ধর্ম পালনের এবং মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার গ্যারান্টি দেয়। কিন্তু বর্তমানে "লাভ জিহাদ" বা "ফুড জিহাদ"-এর মতো ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্বে রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয় সংখ্যালঘুদের জীবনকে বিষিয়ে তুলছে।

উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনি তালিকা থেকে ৮৬ জন জীবিত মুসলিমের নাম বাদ দেওয়ার অপচেষ্টা প্রমাণ করে যে, এই নিপিড়ন কেবল শারীরিক নয় বরং রাজনৈতিকভাবেও সুদূরপ্রসারী। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের আবশ্যিক দায়িত্ব। অথচ দেখা যাচ্ছে, ঘৃণা ছড়ানোর দায়ে বিজেপির বিধায়ক বা প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। তবে অন্ধকারের মাঝেও লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু শিক্ষার্থীদের মুসলিমদের জন্য নামাজের সময় 'মানব প্রাচীর' তৈরি করা বা সাধারণ নাগরিকদের উগ্রপন্থীদের রুখে দেওয়ার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ইনসাফের আকাঙ্ক্ষা এখনো মানুষের মনে জীবিত আছে। ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচারের মাধ্যমে দোষীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


ভারতে উগ্রপন্থার ভয়াবহ বিস্তার: ফেব্রুয়ারিতেই সংখ্যালঘু নিপিড়ন বেড়েছে ৬০ শতাংশ

প্রকাশের তারিখ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

ভারতের মাটিতে সংখ্যালঘু বিশেষ করে মুসলিম ও দলিতদের ওপর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের দাবানল ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মাত্র ২৮ দিনে অন্তত ৬৭টি বড় ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। জানুয়ারি মাসের তুলনায় এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৫৯.৫ শতাংশ, যা দেশটির সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতিকে নির্দেশ করছে।

ভারতের বর্তমান প্রেক্ষাপটে উগ্রবাদী সংগঠন এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারি দল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সংখ্যালঘুদের ওপর এই পদ্ধতিগত নিপীড়নকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার অফিশিয়াল হ্যান্ডেল থেকে এআই (AI) প্রযুক্তিতে তৈরি একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল, যেখানে তাকে সরাসরি দাড়ি ও টুপি পরিহিত মুসলিমদের লক্ষ্য করে গুলি করতে দেখা যায়। সমালোচনার মুখে এটি সরিয়ে নেওয়া হলেও মুখ্যমন্ত্রী উদাসীনভাবে জানিয়েছেন, তিনি এ বিষয়ে "জানতেন না"। এছাড়া বিভিন্ন সমাবেশ থেকে উগ্রবাদী বক্তারা মুসলিমদের অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করার এবং ঘরে অস্ত্র মজুত করার উস্কানি দিচ্ছেন। হিন্দু রক্ষা দলের কর্মীরা প্রকাশ্যে মহাসড়কে "মুসলিমদের জন্য কোনো রাস্তা নেই" লিখেও দাবি করছেন যে, তারা কোনো অন্যায় করেননি। তাদের দাবি—এগুলো জাতীয় নিরাপত্তা ও সংস্কৃতি রক্ষার অংশ, যদিও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এগুলো স্পষ্ট উস্কানি।

ফেব্রুয়ারি মাসের এই ২৮ দিনে ভারতে প্রতি ১০ ঘণ্টায় একটি করে ঘৃণ্য অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল হিমশৈলের চূড়ামাত্র।

  • উত্তরপ্রদেশ: সর্বাধিক ২০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
  • তেলেঙ্গানা: ১৪টি ঘটনার মধ্যে ১৩টিই মুসলিমদের বিরুদ্ধে। হায়দ্রাবাদে ৫টি মামলা হয়েছে।
  • মধ্যপ্রদেশ: বালাঘাট জেলায় ১০টি মুসলিম পরিবারকে সম্পূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করা হয়েছে।

তেলেঙ্গানার ইয়াদাদ্রি ভুবনগিরি জেলায় ঐতিহাসিক জামে মসজিদে রামাদানের প্রাক্কালে মদ ও বিয়ারের বোতল নিক্ষেপ এবং পবিত্র কুরআনের কপি অবমাননার ঘটনা ঘটেছে। কামারেড্ডিতে তারাবির নামাজের সময় লাউডস্পিকারের ভলিউম কমানো নিয়ে বিতণ্ডার জেরে ৬০ জন মুসলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমনকি শিবসেনার মুসলিম বিধায়ক আব্দুল সাত্তার মন্দিরে পূজা দেওয়ায় হিন্দু যুবকরা গোমূত্র ছিটিয়ে মন্দির "পবিত্র" করার মতো চরম অবমাননাকর কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে। দিল্লিতে নিজের কিশোর ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে উমরদীন নামের এক মুসলিম পিতাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আসাম ও তেলেঙ্গানায় ভেন্ডরদের ওপর "ফুড জিহাদ"-এর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে হেনস্তা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও ভারতের সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ ধর্ম পালনের এবং মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার গ্যারান্টি দেয়। কিন্তু বর্তমানে "লাভ জিহাদ" বা "ফুড জিহাদ"-এর মতো ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্বে রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয় সংখ্যালঘুদের জীবনকে বিষিয়ে তুলছে।

উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনি তালিকা থেকে ৮৬ জন জীবিত মুসলিমের নাম বাদ দেওয়ার অপচেষ্টা প্রমাণ করে যে, এই নিপিড়ন কেবল শারীরিক নয় বরং রাজনৈতিকভাবেও সুদূরপ্রসারী। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের আবশ্যিক দায়িত্ব। অথচ দেখা যাচ্ছে, ঘৃণা ছড়ানোর দায়ে বিজেপির বিধায়ক বা প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। তবে অন্ধকারের মাঝেও লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু শিক্ষার্থীদের মুসলিমদের জন্য নামাজের সময় 'মানব প্রাচীর' তৈরি করা বা সাধারণ নাগরিকদের উগ্রপন্থীদের রুখে দেওয়ার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ইনসাফের আকাঙ্ক্ষা এখনো মানুষের মনে জীবিত আছে। ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচারের মাধ্যমে দোষীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত