শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তুর্কুগুডায় হামলার শিকার ব্যবসায়ীরা; আহতদের অভিযোগ সত্ত্বেও পুলিশের দাবির সঙ্গে তথ্যের অমিল

হায়দ্রাবাদে পশু ব্যবসায়ীদের ওপর ‘গৌ-রক্ষক’দের বর্বরোচিত হামলা: পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন



হায়দ্রাবাদে পশু ব্যবসায়ীদের ওপর ‘গৌ-রক্ষক’দের বর্বরোচিত হামলা: পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

হায়দ্রাবাদে পশু বিক্রির উদ্দেশ্যে বাজারে যাওয়ার পথে ‘গৌ-রক্ষক’ নামধারী একদল উগ্রবাদীর ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছেন একদল মুসলিম পশু ব্যবসায়ী। গত রবিবার (৫ এপ্রিল) গভীর রাতে তুর্কুগুডা এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাদের ওপর নৃশংসভাবে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।

ঘটনার পর অভিযুক্ত ‘গৌ-রক্ষক’ গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া না গেলেও, স্থানীয় পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী ঘটনার তীব্রতা ভুক্তভোগীদের বর্ণনার চেয়ে ভিন্ন। পাহাড়ি শরীফ থানার হাউজ অফিসার (এসএইচও) বি. লক্ষ্মী নারায়ণ রেড্ডি জানান, "সেখানে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে এবং বড় ধরনের ভিড় জমেছিল।" তবে ভুক্তভোগীদের ১০০-১৫০ জনের হামলার দাবি নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, "হামলাকারী ছিল ৩-৪ জন।" পুলিশ দাবি করেছে যে, তারা তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং তিনজনকে হেফাজতে নিয়েছে। বর্তমানে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) ১১৮(১) এবং ১২৬ ধারায় মামলা দায়ের করে তদন্ত চলছে।

৫ এপ্রিল, রবিবার রাতে হায়দ্রাবাদের মাল্লেপল্লী থেকে ১৪টি বলদ নিয়ে তুর্কুগুডা সাপ্তাহিক বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন একদল ব্যবসায়ী। তুর্কুগুডা চৌরাস্তায় পৌঁছালে আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০ জন লাঠি, রড ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের পথরোধ করে।

ভুক্তভোগী চালক ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, তারা গবাদি পশু পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল বৈধ অনুমতিপত্র প্রদর্শন করেছিলেন। একজন আহত ব্যবসায়ী ভিডিও বার্তায় বলেন, “আমাদের কাছে সব বৈধ কাগজপত্র ছিল। সেগুলো দেখানোর পরেও তারা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।” হামলায় একজন চালকের আঙুল ভেঙে গেছে এবং তাদের বাহনটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৬ লক্ষ টাকা মূল্যের পশুগুলো নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে সেগুলো জ্ঞান মন্দির গোশালায় রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ উঠেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে। আক্রান্তদের দাবি, পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তারা কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। এমনকি যখন ব্যবসায়ীরা প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন উগ্রবাদীরা তাদের ধাওয়া করে মারধর করতে থাকলেও পুলিশ কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি। এই ঘটনায় ভুক্তভোগীরা আর্থিক ও শারীরিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

ভারতে গবাদি পশু পরিবহনের নামে প্রায়ই মুসলিম ব্যবসায়ীদের ওপর স্বঘোষিত ‘গৌ-রক্ষক’দের হামলার ঘটনা ঘটছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার নাগরিক সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার সমালোচনা করে আসছে। ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। পাশাপাশি ১৯(১)(জি) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যেকোনো বৈধ পেশা বা বাণিজ্য করার অধিকারও সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত।

আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে হামলার অভিযোগ ওঠে, তখন তা কেবল ফৌজদারি অপরাধ নয় বরং পেশাদারিত্বের চরম অবক্ষয়। এই ঘটনায় পুলিশের দাবি (৩-৪ জন হামলাকারী) এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার (১৫০ জন হামলাকারী) মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান, তা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ভুক্তভোগীদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা না হলে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উসকে দেবে।

বিষয় : ভারত হায়দ্রাবাদ

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


হায়দ্রাবাদে পশু ব্যবসায়ীদের ওপর ‘গৌ-রক্ষক’দের বর্বরোচিত হামলা: পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশের তারিখ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

হায়দ্রাবাদে পশু বিক্রির উদ্দেশ্যে বাজারে যাওয়ার পথে ‘গৌ-রক্ষক’ নামধারী একদল উগ্রবাদীর ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছেন একদল মুসলিম পশু ব্যবসায়ী। গত রবিবার (৫ এপ্রিল) গভীর রাতে তুর্কুগুডা এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাদের ওপর নৃশংসভাবে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।

ঘটনার পর অভিযুক্ত ‘গৌ-রক্ষক’ গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া না গেলেও, স্থানীয় পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী ঘটনার তীব্রতা ভুক্তভোগীদের বর্ণনার চেয়ে ভিন্ন। পাহাড়ি শরীফ থানার হাউজ অফিসার (এসএইচও) বি. লক্ষ্মী নারায়ণ রেড্ডি জানান, "সেখানে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে এবং বড় ধরনের ভিড় জমেছিল।" তবে ভুক্তভোগীদের ১০০-১৫০ জনের হামলার দাবি নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, "হামলাকারী ছিল ৩-৪ জন।" পুলিশ দাবি করেছে যে, তারা তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং তিনজনকে হেফাজতে নিয়েছে। বর্তমানে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) ১১৮(১) এবং ১২৬ ধারায় মামলা দায়ের করে তদন্ত চলছে।

৫ এপ্রিল, রবিবার রাতে হায়দ্রাবাদের মাল্লেপল্লী থেকে ১৪টি বলদ নিয়ে তুর্কুগুডা সাপ্তাহিক বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন একদল ব্যবসায়ী। তুর্কুগুডা চৌরাস্তায় পৌঁছালে আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০ জন লাঠি, রড ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের পথরোধ করে।

ভুক্তভোগী চালক ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, তারা গবাদি পশু পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল বৈধ অনুমতিপত্র প্রদর্শন করেছিলেন। একজন আহত ব্যবসায়ী ভিডিও বার্তায় বলেন, “আমাদের কাছে সব বৈধ কাগজপত্র ছিল। সেগুলো দেখানোর পরেও তারা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।” হামলায় একজন চালকের আঙুল ভেঙে গেছে এবং তাদের বাহনটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৬ লক্ষ টাকা মূল্যের পশুগুলো নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে সেগুলো জ্ঞান মন্দির গোশালায় রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ উঠেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে। আক্রান্তদের দাবি, পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তারা কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। এমনকি যখন ব্যবসায়ীরা প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন উগ্রবাদীরা তাদের ধাওয়া করে মারধর করতে থাকলেও পুলিশ কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি। এই ঘটনায় ভুক্তভোগীরা আর্থিক ও শারীরিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

ভারতে গবাদি পশু পরিবহনের নামে প্রায়ই মুসলিম ব্যবসায়ীদের ওপর স্বঘোষিত ‘গৌ-রক্ষক’দের হামলার ঘটনা ঘটছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার নাগরিক সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার সমালোচনা করে আসছে। ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। পাশাপাশি ১৯(১)(জি) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যেকোনো বৈধ পেশা বা বাণিজ্য করার অধিকারও সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত।

আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে হামলার অভিযোগ ওঠে, তখন তা কেবল ফৌজদারি অপরাধ নয় বরং পেশাদারিত্বের চরম অবক্ষয়। এই ঘটনায় পুলিশের দাবি (৩-৪ জন হামলাকারী) এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার (১৫০ জন হামলাকারী) মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান, তা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ভুক্তভোগীদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা না হলে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উসকে দেবে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত