ভারতের রাজস্থানে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন ভিকি দুধওয়া নামের এক হিন্দু যুবক। চুরু জেলার দুধওয়াখারা গ্রামে আয়োজিত একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যার হুমকি ও উস্কানিমূলক বক্তব্যের প্রতিবাদে তিনি সাহসিকতার সাথে মাইক কেড়ে নেন। ঘৃণা ছড়ানোর এই প্রচেষ্টাকে রুখে দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে মানবিক মূল্যবোধ এখনো প্রবল।
রাজস্থানের চুরু জেলার দুধওয়াখারা গ্রামে গো-সেবা এবং আহত গবাদি পশুর যত্নে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে একটি সভার আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে জনৈক ‘যোগী’ নামক এক হিন্দুত্ববাদী বক্তা মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুসলিম বিরোধী চরমপন্থী বক্তব্য দিতে শুরু করেন। তিনি দাবি করেন, “দেশের সকল মসজিদে হনুমান চালিশা পাঠ করানো হবে।” চরম উস্কানি দিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমি দিল্লি যাব এবং মুসলিমদের হত্যা করব।” এসব উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর দাবি হলো, দেশের সার্বভৌমত্ব ও সংস্কৃতি রক্ষায় সংখ্যালঘুদের দমন করা প্রয়োজন। তাদের পক্ষ থেকে প্রায়শই ‘লাভ জিহাদ’, ‘ল্যান্ড জিহাদ’ বা ‘ট্রেড বয়কট’-এর মতো ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তবে এই বক্তার দাবির সপক্ষে কোনো আইনি ভিত্তি বা যৌক্তিক প্রমাণ ছিল না, বরং তা ছিল সরাসরি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের (Hate Speech) অন্তর্ভুক্ত।
৮ এপ্রিল (বুধবার), রাজস্থানের চুরু জেলার দুধওয়াখারা গ্রামে একটি বড় জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রায় ৫,০০০ হিন্দু এবং প্রায় ২,৫০০ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ উপস্থিত ছিলেন। উগ্রবাদী বক্তা যোগী যখন মুসলিমদের হত্যার হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন উপস্থিত দর্শকদের মধ্য থেকে ভিকি দুধওয়া নামক এক যুবক সাহসিকতার সাথে মঞ্চে উঠে মাইক কেড়ে নেন। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, “আমি এই ভাইয়ের বক্তব্যের সাথে একমত নই। আমি যে শহরে বাস করি, সেখানে হিন্দু-মুসলিমরা শান্তিতে একসাথে থাকে। আমি এই ধরণের উগ্র মতাদর্শের তীব্র প্রতিবাদ করছি।”
ভিকির এই সাহসী পদক্ষেপের পর সেখানে উপস্থিত অনেক হিন্দু ও মুসলিম তাকে সমর্থন জানান। এই ঘটনাটি উত্তরাখণ্ডের ‘মোহাম্মদ দীপক’ (দীপক কুমার)-এর কথা মনে করিয়ে দেয়, যিনি একজন বয়স্ক মুসলিম দোকানদারকে হেনস্তা থেকে রক্ষা করেছিলেন। তবে এই ঘটনার পর কট্টরপন্থী হিন্দু সংগঠনগুলো ভিকিকে লক্ষ্য করে সামাজিক মাধ্যমে হুমকি দিচ্ছে। ভিকি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “আমি এসবে ভয় পাই না। আমরা বহু বছর ধরে ভালোবাসার সাথে বসবাস করছি, আমরা একে অপরের থেকে দূরে থাকতে পারি না।”
ভারতের সংবিধানে সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকার এবং জীবন ও জান-মালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ২৫ থেকে ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলা হলেও বর্তমান সময়ে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের ওপর পদ্ধতিগত নিপীড়নের অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার তুলে ধরছে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, ‘হেট স্পিচ’ বা ঘৃণ্য বক্তব্যের বিরুদ্ধে পুলিশকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা করার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। চুরুর এই ঘটনায় প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া হলেও বক্তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার চেয়ে প্রতিবাদী যুবককে হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে।
সমাজে শান্তি বজায় রাখতে হলে প্রশাসনকে দলমত নির্বিশেষে উস্কানিদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মুসলিম ও ভারতের সংখ্যালঘু নাগরিকরা যাতে কোনো উগ্রবাদী শক্তির দ্বারা শারীরিক বা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। ভিকি দুধওয়ার মতো যুবকদের এই প্রতিবাদ প্রমাণ করে যে, সাধারণ নাগরিকরা শান্তি চায়। টেকসই নিরাপত্তার জন্য বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করে সত্যিকারের ইনসাফ কায়েম করা অপরিহার্য।
বিষয় : ভারত

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬
ভারতের রাজস্থানে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন ভিকি দুধওয়া নামের এক হিন্দু যুবক। চুরু জেলার দুধওয়াখারা গ্রামে আয়োজিত একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যার হুমকি ও উস্কানিমূলক বক্তব্যের প্রতিবাদে তিনি সাহসিকতার সাথে মাইক কেড়ে নেন। ঘৃণা ছড়ানোর এই প্রচেষ্টাকে রুখে দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে মানবিক মূল্যবোধ এখনো প্রবল।
রাজস্থানের চুরু জেলার দুধওয়াখারা গ্রামে গো-সেবা এবং আহত গবাদি পশুর যত্নে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে একটি সভার আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে জনৈক ‘যোগী’ নামক এক হিন্দুত্ববাদী বক্তা মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুসলিম বিরোধী চরমপন্থী বক্তব্য দিতে শুরু করেন। তিনি দাবি করেন, “দেশের সকল মসজিদে হনুমান চালিশা পাঠ করানো হবে।” চরম উস্কানি দিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমি দিল্লি যাব এবং মুসলিমদের হত্যা করব।” এসব উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর দাবি হলো, দেশের সার্বভৌমত্ব ও সংস্কৃতি রক্ষায় সংখ্যালঘুদের দমন করা প্রয়োজন। তাদের পক্ষ থেকে প্রায়শই ‘লাভ জিহাদ’, ‘ল্যান্ড জিহাদ’ বা ‘ট্রেড বয়কট’-এর মতো ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তবে এই বক্তার দাবির সপক্ষে কোনো আইনি ভিত্তি বা যৌক্তিক প্রমাণ ছিল না, বরং তা ছিল সরাসরি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের (Hate Speech) অন্তর্ভুক্ত।
৮ এপ্রিল (বুধবার), রাজস্থানের চুরু জেলার দুধওয়াখারা গ্রামে একটি বড় জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রায় ৫,০০০ হিন্দু এবং প্রায় ২,৫০০ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ উপস্থিত ছিলেন। উগ্রবাদী বক্তা যোগী যখন মুসলিমদের হত্যার হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন উপস্থিত দর্শকদের মধ্য থেকে ভিকি দুধওয়া নামক এক যুবক সাহসিকতার সাথে মঞ্চে উঠে মাইক কেড়ে নেন। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, “আমি এই ভাইয়ের বক্তব্যের সাথে একমত নই। আমি যে শহরে বাস করি, সেখানে হিন্দু-মুসলিমরা শান্তিতে একসাথে থাকে। আমি এই ধরণের উগ্র মতাদর্শের তীব্র প্রতিবাদ করছি।”
ভিকির এই সাহসী পদক্ষেপের পর সেখানে উপস্থিত অনেক হিন্দু ও মুসলিম তাকে সমর্থন জানান। এই ঘটনাটি উত্তরাখণ্ডের ‘মোহাম্মদ দীপক’ (দীপক কুমার)-এর কথা মনে করিয়ে দেয়, যিনি একজন বয়স্ক মুসলিম দোকানদারকে হেনস্তা থেকে রক্ষা করেছিলেন। তবে এই ঘটনার পর কট্টরপন্থী হিন্দু সংগঠনগুলো ভিকিকে লক্ষ্য করে সামাজিক মাধ্যমে হুমকি দিচ্ছে। ভিকি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “আমি এসবে ভয় পাই না। আমরা বহু বছর ধরে ভালোবাসার সাথে বসবাস করছি, আমরা একে অপরের থেকে দূরে থাকতে পারি না।”
ভারতের সংবিধানে সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকার এবং জীবন ও জান-মালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ২৫ থেকে ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলা হলেও বর্তমান সময়ে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের ওপর পদ্ধতিগত নিপীড়নের অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার তুলে ধরছে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, ‘হেট স্পিচ’ বা ঘৃণ্য বক্তব্যের বিরুদ্ধে পুলিশকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা করার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। চুরুর এই ঘটনায় প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া হলেও বক্তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার চেয়ে প্রতিবাদী যুবককে হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে।
সমাজে শান্তি বজায় রাখতে হলে প্রশাসনকে দলমত নির্বিশেষে উস্কানিদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মুসলিম ও ভারতের সংখ্যালঘু নাগরিকরা যাতে কোনো উগ্রবাদী শক্তির দ্বারা শারীরিক বা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। ভিকি দুধওয়ার মতো যুবকদের এই প্রতিবাদ প্রমাণ করে যে, সাধারণ নাগরিকরা শান্তি চায়। টেকসই নিরাপত্তার জন্য বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করে সত্যিকারের ইনসাফ কায়েম করা অপরিহার্য।

আপনার মতামত লিখুন