ভারতের রাজধানী দিল্লির ত্রিনগর এলাকায় মুসলিম অধিবাসীদের উচ্ছেদ ও উত্যক্ত করার উদ্দেশ্যে এক অভিনব ও উসকানিমূলক কৌশল অবলম্বনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কতিপয় হিন্দু পরিবার তাদের ঘরের সামনে খাঁচায় শুকর পালন শুরু করেছে এবং সেগুলোকে ‘বরাহ অবতার’ হিসেবে পূজা ও আরতি করছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের মিশ্র বসতিপূর্ণ এই এলাকায় চরম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ত্রিনগরের ওমকার নগর বি-ব্লকের হিন্দু বাসিন্দারা দাবি করছেন, শুকর পালন তাদের ধর্মীয় অধিকারের অংশ। তারা শুকরকে ভগবান বিষ্ণুর তৃতীয় অবতার ‘বরাহ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর পূজা করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা প্রেরণার ভাষ্যমতে, “আমরা এদের পরম যত্নে লালন-পালন করছি এবং দীপাবলির সময় মালা দিয়ে সাজাই।”
ইন্সটাগ্রামে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, “এখন প্রতিটি গলিতে শুকর ঘুরবে এবং প্রতিটি গলিতে মন্দির হবে। এভাবেই দিল্লি শুদ্ধ হবে এবং এই মানুষগুলো (মুসলিমরা) চলে যেতে বাধ্য হবে।” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্রপন্থী ব্যবহারকারীরা এই কর্মকাণ্ডকে ‘জিহাদমুক্ত’ এলাকা গড়ার হাতিয়ার হিসেবে প্রচার করছে। এছাড়া, শুকরগুলোর মৃত্যু হলে হিন্দু পক্ষ থেকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করা হয়েছে যে, মুসলিমরা খাবারে বিষ মিশিয়ে প্রাণীগুলোকে হত্যা করেছে।
দিল্লির উত্তর প্রান্তের অশোক বিহার সংলগ্ন ত্রিনগরের ওমকার নগর এলাকায় গত ২-৩ মাস ধরে এই আপত্তিকর কর্মকাণ্ড তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় প্রায় ৭০টি মুসলিম পরিবারের অভিযোগ, তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিতে এবং এলাকা ছাড়া করতে পরিকল্পিতভাবে বাড়ির প্রবেশপথে শুকর রাখা হচ্ছে।
হয়রানির ধরণ: স্থানীয় ব্যবসায়ী লিয়াকত আলী জানান, মুসলিমরা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় শুকরগুলোকে ‘আব্দুল’ বা ‘সুলতান’ বলে ডাকা হয়। পাশাপাশি মুসলিমদের নিয়মিত ‘জিহাদি’ ও ‘পাকিস্তানি’ বলে গালিগালাজ করা হচ্ছে।
চাঁদাবাজি ও উচ্ছেদ আতঙ্ক: আব্দুল বারি নামের এক জুতা ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, মুসলিমরা এলাকায় বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে স্থানীয় ‘রেসিডেন্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ থেকে প্রতি ফ্লোরের জন্য ১ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ঘরবাড়িতে ময়লা ও হাড় নিক্ষেপ করা হয়।
নিরাপত্তা সংকট: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় গত এক সপ্তাহ ধরে এলাকায় আধাসামরিক বাহিনী (CRPF) মোতায়েন করা হয়েছে। লিয়াকত আলীর মতো অনেক বাসিন্দা এখন দুই দশকের পুরনো আবাসস্থল ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন।
ভারতের সংবিধানের ২৫-২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিজ ধর্ম পালনের অধিকার থাকলেও তা অন্য ধর্মাবলম্বীদের হয়রানি বা জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির কারণ হওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অব দিল্লি (MCD) এই এলাকায় শুকর পালনকে ‘জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ী, কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে এলাকাচ্যুত করতে মানসিকভাবে নির্যাতন বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
দিল্লির এই ঘটনা কেবল একটি স্থানীয় বিরোধ নয়, বরং উগ্র সাম্প্রদায়িক এজেন্ডার মাধ্যমে মুসলিমদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলার একটি পরিকল্পিত নীল নকশা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর উচিত নিছক ‘শান্তি রক্ষা’র দোহাই না দিয়ে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের হোতাদের আইনের আওতায় আনা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি উগ্রপন্থীদের আরও সাহসী করে তুলছে, যা ভারতের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর জন্য হুমকিস্বরূপ।
বিষয় : ভারত

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ এপ্রিল ২০২৬
ভারতের রাজধানী দিল্লির ত্রিনগর এলাকায় মুসলিম অধিবাসীদের উচ্ছেদ ও উত্যক্ত করার উদ্দেশ্যে এক অভিনব ও উসকানিমূলক কৌশল অবলম্বনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কতিপয় হিন্দু পরিবার তাদের ঘরের সামনে খাঁচায় শুকর পালন শুরু করেছে এবং সেগুলোকে ‘বরাহ অবতার’ হিসেবে পূজা ও আরতি করছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের মিশ্র বসতিপূর্ণ এই এলাকায় চরম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ত্রিনগরের ওমকার নগর বি-ব্লকের হিন্দু বাসিন্দারা দাবি করছেন, শুকর পালন তাদের ধর্মীয় অধিকারের অংশ। তারা শুকরকে ভগবান বিষ্ণুর তৃতীয় অবতার ‘বরাহ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর পূজা করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা প্রেরণার ভাষ্যমতে, “আমরা এদের পরম যত্নে লালন-পালন করছি এবং দীপাবলির সময় মালা দিয়ে সাজাই।”
ইন্সটাগ্রামে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, “এখন প্রতিটি গলিতে শুকর ঘুরবে এবং প্রতিটি গলিতে মন্দির হবে। এভাবেই দিল্লি শুদ্ধ হবে এবং এই মানুষগুলো (মুসলিমরা) চলে যেতে বাধ্য হবে।” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্রপন্থী ব্যবহারকারীরা এই কর্মকাণ্ডকে ‘জিহাদমুক্ত’ এলাকা গড়ার হাতিয়ার হিসেবে প্রচার করছে। এছাড়া, শুকরগুলোর মৃত্যু হলে হিন্দু পক্ষ থেকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করা হয়েছে যে, মুসলিমরা খাবারে বিষ মিশিয়ে প্রাণীগুলোকে হত্যা করেছে।
দিল্লির উত্তর প্রান্তের অশোক বিহার সংলগ্ন ত্রিনগরের ওমকার নগর এলাকায় গত ২-৩ মাস ধরে এই আপত্তিকর কর্মকাণ্ড তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় প্রায় ৭০টি মুসলিম পরিবারের অভিযোগ, তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিতে এবং এলাকা ছাড়া করতে পরিকল্পিতভাবে বাড়ির প্রবেশপথে শুকর রাখা হচ্ছে।
হয়রানির ধরণ: স্থানীয় ব্যবসায়ী লিয়াকত আলী জানান, মুসলিমরা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় শুকরগুলোকে ‘আব্দুল’ বা ‘সুলতান’ বলে ডাকা হয়। পাশাপাশি মুসলিমদের নিয়মিত ‘জিহাদি’ ও ‘পাকিস্তানি’ বলে গালিগালাজ করা হচ্ছে।
চাঁদাবাজি ও উচ্ছেদ আতঙ্ক: আব্দুল বারি নামের এক জুতা ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, মুসলিমরা এলাকায় বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে স্থানীয় ‘রেসিডেন্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ থেকে প্রতি ফ্লোরের জন্য ১ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ঘরবাড়িতে ময়লা ও হাড় নিক্ষেপ করা হয়।
নিরাপত্তা সংকট: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় গত এক সপ্তাহ ধরে এলাকায় আধাসামরিক বাহিনী (CRPF) মোতায়েন করা হয়েছে। লিয়াকত আলীর মতো অনেক বাসিন্দা এখন দুই দশকের পুরনো আবাসস্থল ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন।
ভারতের সংবিধানের ২৫-২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিজ ধর্ম পালনের অধিকার থাকলেও তা অন্য ধর্মাবলম্বীদের হয়রানি বা জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির কারণ হওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অব দিল্লি (MCD) এই এলাকায় শুকর পালনকে ‘জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ী, কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে এলাকাচ্যুত করতে মানসিকভাবে নির্যাতন বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
দিল্লির এই ঘটনা কেবল একটি স্থানীয় বিরোধ নয়, বরং উগ্র সাম্প্রদায়িক এজেন্ডার মাধ্যমে মুসলিমদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলার একটি পরিকল্পিত নীল নকশা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর উচিত নিছক ‘শান্তি রক্ষা’র দোহাই না দিয়ে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের হোতাদের আইনের আওতায় আনা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি উগ্রপন্থীদের আরও সাহসী করে তুলছে, যা ভারতের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর জন্য হুমকিস্বরূপ।

আপনার মতামত লিখুন