ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কটের ডাক দিয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো। সম্প্রতি কোডাগু জেলায় আয়োজিত এক জনসভায় প্রকাশ্যেই মুসলমানদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রাখা এবং বিতর্কিত ‘জিহাদ’ তত্ত্বে বিশ্বাসী হওয়ার শপথ পাঠ করানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর রাজ্যজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
গত ১ এপ্রিল কর্ণাটকের কোডাগু জেলার নাপোকলু এলাকায় ‘হিন্দু রক্ষা সমিতি’ কর্তৃক আয়োজিত ‘হিন্দু জনজাগৃতি সভা’য় উগ্রপন্থী নেতারা তাদের কর্মকাণ্ডের সপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। হিন্দু রক্ষা সমিতির নেতা কুক্কেরা অজিত দাবি করেন, সম্প্রতি ওই এলাকায় জনৈক হিন্দু ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনার প্রতিবাদে তারা এই সভার আয়োজন করেছেন।
সংগঠনটির নেতাদের দাবি, এটি কোনো বিদ্বেষমূলক কর্মসূচি নয় বরং ‘দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের’ বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির একটি প্রচেষ্টা। তারা অভিযোগ করেন, এলাকায় তথাকথিত ‘লাভ জিহাদ’, ‘ল্যান্ড জিহাদ’, ‘অর্থনৈতিক জিহাদ’ এবং ‘জনসংখ্যা জিহাদ’ নামক কাল্পনিক সমস্যার কারণে হিন্দু সম্প্রদায় হুমকির মুখে রয়েছে। সভায় বক্তারা দাবি করেন যে, বাংলাদেশ থেকে আসা ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ কারণেই স্থানীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং একটি ‘সুসংগঠিত ও সুরক্ষিত সমাজ’ গঠনের জন্য অ-হিন্দুদের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করা জরুরি।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, কোডাগু জেলার নাপোকলু’র পুরনো তালুক জংশন থেকে সকাল ১০টায় একটি শোভাযাত্রা বের হয়ে বাজার চত্বরে গিয়ে সভায় পরিণত হয়। সেখানে উপস্থিত শত শত মানুষকে শপথ পাঠ করানো হয় যে, তারা কোনো মুসলিমের সাথে কোনো লেনদেন বা ব্যবসা করবে না। বিশেষ করে গবাদি পশু জবাই ও মাংস বিক্রির বিরোধিতাকে পুঁজি করে মুসলিম ব্যবসায়ীদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
এই ঘটনার ফলে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে একদল লোককে মুসলিমদের একঘরে করার জন্য উস্কানি দেওয়া হচ্ছে। কর্ণাটকের বর্তমান কংগ্রেস সরকার চরমপন্থী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ। তারা মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া এবং উপ-মুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমারের কাছে অভিযোগ জানিয়ে বলেছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করছে এবং সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করছে।
বাস্তবতা হলো, ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলো ইতোমধ্যেই ‘লাভ জিহাদ’ বা ‘অর্থনৈতিক জিহাদ’ নামক তত্ত্বগুলোর কোনো দাপ্তরিক ভিত্তি নেই বলে স্পষ্ট করেছে। তবুও রাজনৈতিক ফায়দা ও ঘৃণা ছড়াতে বারবার এই শব্দগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। ভারতীয় সংবিধানের ১৫ ও ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যেকোনো নাগরিকের ধর্ম নির্বিশেষে ব্যবসায়িক অধিকার এবং বৈষম্যহীন জীবনযাপনের গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং জাতিসংঘের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক সনদেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কোডাগু জেলা প্রশাসন বা পুলিশ এখন পর্যন্ত এই উস্কানিমূলক সভার বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা না করায় ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে অর্থনৈতিক বয়কটের ডাক দেওয়া কেবল ন্যায়বিচার পরিপন্থীই নয়, বরং এটি সামাজিক অস্থিরতা তৈরির সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা। শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্বচ্ছ তদন্ত এবং বিদ্বেষ ছড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
বিষয় : ভারত

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ এপ্রিল ২০২৬
ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কটের ডাক দিয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো। সম্প্রতি কোডাগু জেলায় আয়োজিত এক জনসভায় প্রকাশ্যেই মুসলমানদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রাখা এবং বিতর্কিত ‘জিহাদ’ তত্ত্বে বিশ্বাসী হওয়ার শপথ পাঠ করানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর রাজ্যজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
গত ১ এপ্রিল কর্ণাটকের কোডাগু জেলার নাপোকলু এলাকায় ‘হিন্দু রক্ষা সমিতি’ কর্তৃক আয়োজিত ‘হিন্দু জনজাগৃতি সভা’য় উগ্রপন্থী নেতারা তাদের কর্মকাণ্ডের সপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। হিন্দু রক্ষা সমিতির নেতা কুক্কেরা অজিত দাবি করেন, সম্প্রতি ওই এলাকায় জনৈক হিন্দু ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনার প্রতিবাদে তারা এই সভার আয়োজন করেছেন।
সংগঠনটির নেতাদের দাবি, এটি কোনো বিদ্বেষমূলক কর্মসূচি নয় বরং ‘দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের’ বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির একটি প্রচেষ্টা। তারা অভিযোগ করেন, এলাকায় তথাকথিত ‘লাভ জিহাদ’, ‘ল্যান্ড জিহাদ’, ‘অর্থনৈতিক জিহাদ’ এবং ‘জনসংখ্যা জিহাদ’ নামক কাল্পনিক সমস্যার কারণে হিন্দু সম্প্রদায় হুমকির মুখে রয়েছে। সভায় বক্তারা দাবি করেন যে, বাংলাদেশ থেকে আসা ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ কারণেই স্থানীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং একটি ‘সুসংগঠিত ও সুরক্ষিত সমাজ’ গঠনের জন্য অ-হিন্দুদের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করা জরুরি।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, কোডাগু জেলার নাপোকলু’র পুরনো তালুক জংশন থেকে সকাল ১০টায় একটি শোভাযাত্রা বের হয়ে বাজার চত্বরে গিয়ে সভায় পরিণত হয়। সেখানে উপস্থিত শত শত মানুষকে শপথ পাঠ করানো হয় যে, তারা কোনো মুসলিমের সাথে কোনো লেনদেন বা ব্যবসা করবে না। বিশেষ করে গবাদি পশু জবাই ও মাংস বিক্রির বিরোধিতাকে পুঁজি করে মুসলিম ব্যবসায়ীদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
এই ঘটনার ফলে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে একদল লোককে মুসলিমদের একঘরে করার জন্য উস্কানি দেওয়া হচ্ছে। কর্ণাটকের বর্তমান কংগ্রেস সরকার চরমপন্থী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ। তারা মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া এবং উপ-মুখ্যমন্ত্রী ডিকে শিবকুমারের কাছে অভিযোগ জানিয়ে বলেছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করছে এবং সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করছে।
বাস্তবতা হলো, ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলো ইতোমধ্যেই ‘লাভ জিহাদ’ বা ‘অর্থনৈতিক জিহাদ’ নামক তত্ত্বগুলোর কোনো দাপ্তরিক ভিত্তি নেই বলে স্পষ্ট করেছে। তবুও রাজনৈতিক ফায়দা ও ঘৃণা ছড়াতে বারবার এই শব্দগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। ভারতীয় সংবিধানের ১৫ ও ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যেকোনো নাগরিকের ধর্ম নির্বিশেষে ব্যবসায়িক অধিকার এবং বৈষম্যহীন জীবনযাপনের গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং জাতিসংঘের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক সনদেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কোডাগু জেলা প্রশাসন বা পুলিশ এখন পর্যন্ত এই উস্কানিমূলক সভার বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা না করায় ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে অর্থনৈতিক বয়কটের ডাক দেওয়া কেবল ন্যায়বিচার পরিপন্থীই নয়, বরং এটি সামাজিক অস্থিরতা তৈরির সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা। শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্বচ্ছ তদন্ত এবং বিদ্বেষ ছড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন