পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ রাজ্যের এক জনসভায় সরাসরি মুসলিম ধর্মীয় রীতিনীতি ও জীবনধারাকে লক্ষ্যবস্তু করে আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদান করেছেন। নির্বাচনের ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগে দেওয়া এই বক্তব্যে একদিকে যেমন প্রশাসনিক কঠোরতার দাবি তোলা হয়েছে, অন্যদিকে এর ফলে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও মুসলিম নিগ্রহের আশঙ্কা তীব্রতর হয়েছে। ঘটনাটি ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী জনসভায় যোগী আদিত্যনাথ তাঁর বক্তব্যে উত্তরপ্রদেশের প্রশাসনিক মডেলকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি সরাসরি দাবি করেন যে, উত্তরপ্রদেশে সড়ক বা উন্মুক্ত স্থানে নামাজ পড়তে দেওয়া হয় না এবং মসজিদের মাইক থেকে আজানের আওয়াজ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। তার ভাষায়, "ইউপি-তে সড়কে নামাজ পড়তে দেওয়া হয় না, মসজিদ থেকে আজান আসে না।" সরকার ও তাঁর সমর্থকদের দাবি, জনস্বার্থ এবং যানজট নিরসনের লক্ষ্যেই সড়কে নামাজ বন্ধ করা হয়েছে। একই সাথে শব্দদূষণ রোধে মাইকের ব্যবহার সীমিত করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। এছাড়া গোহত্যা প্রতিরোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "ইউপি থেকে একটি স্লোগান আসে—গরুকে কাটতে দেবো না।" সরকারি পক্ষের দাবি, উত্তরপ্রদেশের আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং 'হিন্দু ভাবাবেগ' রক্ষায় এই পদক্ষেপগুলো অপরিহার্য ছিল এবং তারা পশ্চিমবঙ্গেও একই ধরনের কট্টর প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালুর পক্ষে সওয়াল করছেন।
আগামী ২৩শে এপ্রিল এবং ২৯শে এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনে দুই দফায় বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ৪ঠা মে ফলাফল ঘোষণার আগে রাজনৈতিক উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই ২০শে এপ্রিল যোগী আদিত্যনাথের এই বক্তব্য সামনে এল। বিজেপি যখন উত্তর প্রদেশের আদলে 'ডাবল ইঞ্জিন' সরকারের কথা বলছে, তখন যোগীর এই উস্কানিমূলক বক্তব্য তৃণমূল কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিরোধীদের দাবি, উন্নয়নের ইস্যু থেকে নজর ঘোরাতেই বিজেপি সাম্প্রদায়িক কার্ড খেলছে।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের বিশাল সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, উত্তরপ্রদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও রীতিনীতি পালনের ক্ষেত্রে যে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে, তা পশ্চিমবঙ্গেও কার্যকর করার প্রচ্ছন্ন হুমকি দেওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধরনের বক্তব্য নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে ধর্মীয় মেরুকরণকে উসকে দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মুসলিম নাগরিকদের মধ্যে এই বক্তব্য চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে, কারণ এর ফলে নির্বাচনের আগে ও পরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। উল্লেখ্য যে, উত্তরপ্রদেশে ইতোমধ্যেই অনেক জায়গায় ধর্মীয় অজুহাতে মুসলিমদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া এবং আইনি হয়রানির অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।
ভারতের সংবিধানের ২৫ থেকে ২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের নিজ ধর্ম পালন, প্রচার ও রীতির চর্চা করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, প্রশাসনিক আদেশের নামে নির্দিষ্ট একটি ধর্মের রীতিনীতিকে বাধাগ্রস্ত করা নাগরিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিভিন্ন সময়ে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জনসভায় দেওয়া এই বক্তব্য কেবল প্ররোচনামূলকই নয়, বরং এটি ভারতের নির্বাচন কমিশনের আদর্শ আচরণবিধিরও পরিপন্থী হতে পারে। নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মকে ব্যবহার করে কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো বা তাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার হুমকি দেওয়া একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে এই ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকদের সুরক্ষায় আইনি কাঠামোকে পক্ষপাতহীনভাবে প্রয়োগ করাই এখন সময়ের দাবি।
বিষয় : ভারত পশ্চিমবঙ্গ

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ এপ্রিল ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ রাজ্যের এক জনসভায় সরাসরি মুসলিম ধর্মীয় রীতিনীতি ও জীবনধারাকে লক্ষ্যবস্তু করে আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদান করেছেন। নির্বাচনের ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগে দেওয়া এই বক্তব্যে একদিকে যেমন প্রশাসনিক কঠোরতার দাবি তোলা হয়েছে, অন্যদিকে এর ফলে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও মুসলিম নিগ্রহের আশঙ্কা তীব্রতর হয়েছে। ঘটনাটি ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী জনসভায় যোগী আদিত্যনাথ তাঁর বক্তব্যে উত্তরপ্রদেশের প্রশাসনিক মডেলকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি সরাসরি দাবি করেন যে, উত্তরপ্রদেশে সড়ক বা উন্মুক্ত স্থানে নামাজ পড়তে দেওয়া হয় না এবং মসজিদের মাইক থেকে আজানের আওয়াজ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। তার ভাষায়, "ইউপি-তে সড়কে নামাজ পড়তে দেওয়া হয় না, মসজিদ থেকে আজান আসে না।" সরকার ও তাঁর সমর্থকদের দাবি, জনস্বার্থ এবং যানজট নিরসনের লক্ষ্যেই সড়কে নামাজ বন্ধ করা হয়েছে। একই সাথে শব্দদূষণ রোধে মাইকের ব্যবহার সীমিত করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। এছাড়া গোহত্যা প্রতিরোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "ইউপি থেকে একটি স্লোগান আসে—গরুকে কাটতে দেবো না।" সরকারি পক্ষের দাবি, উত্তরপ্রদেশের আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং 'হিন্দু ভাবাবেগ' রক্ষায় এই পদক্ষেপগুলো অপরিহার্য ছিল এবং তারা পশ্চিমবঙ্গেও একই ধরনের কট্টর প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালুর পক্ষে সওয়াল করছেন।
আগামী ২৩শে এপ্রিল এবং ২৯শে এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনে দুই দফায় বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ৪ঠা মে ফলাফল ঘোষণার আগে রাজনৈতিক উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই ২০শে এপ্রিল যোগী আদিত্যনাথের এই বক্তব্য সামনে এল। বিজেপি যখন উত্তর প্রদেশের আদলে 'ডাবল ইঞ্জিন' সরকারের কথা বলছে, তখন যোগীর এই উস্কানিমূলক বক্তব্য তৃণমূল কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিরোধীদের দাবি, উন্নয়নের ইস্যু থেকে নজর ঘোরাতেই বিজেপি সাম্প্রদায়িক কার্ড খেলছে।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের বিশাল সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, উত্তরপ্রদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও রীতিনীতি পালনের ক্ষেত্রে যে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে, তা পশ্চিমবঙ্গেও কার্যকর করার প্রচ্ছন্ন হুমকি দেওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধরনের বক্তব্য নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে ধর্মীয় মেরুকরণকে উসকে দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মুসলিম নাগরিকদের মধ্যে এই বক্তব্য চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে, কারণ এর ফলে নির্বাচনের আগে ও পরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। উল্লেখ্য যে, উত্তরপ্রদেশে ইতোমধ্যেই অনেক জায়গায় ধর্মীয় অজুহাতে মুসলিমদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া এবং আইনি হয়রানির অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।
ভারতের সংবিধানের ২৫ থেকে ২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের নিজ ধর্ম পালন, প্রচার ও রীতির চর্চা করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, প্রশাসনিক আদেশের নামে নির্দিষ্ট একটি ধর্মের রীতিনীতিকে বাধাগ্রস্ত করা নাগরিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিভিন্ন সময়ে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জনসভায় দেওয়া এই বক্তব্য কেবল প্ররোচনামূলকই নয়, বরং এটি ভারতের নির্বাচন কমিশনের আদর্শ আচরণবিধিরও পরিপন্থী হতে পারে। নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মকে ব্যবহার করে কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো বা তাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার হুমকি দেওয়া একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে এই ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকদের সুরক্ষায় আইনি কাঠামোকে পক্ষপাতহীনভাবে প্রয়োগ করাই এখন সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন