আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের (UNGA) সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক নির্বাচনে তিনি গ্রীক সাইপ্রাস প্রশাসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে পরাজিত করেন। আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে তিনি এক বছরের জন্য বিশ্বসংস্থার অন্যতম শীর্ষ এই পদের দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন।
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে বাংলাদেশের এক বিশাল কূটনৈতিক বিজয় অর্জিত হয়েছে। জাতিসংঘের ১৯০টি সদস্য রাষ্ট্রের ভোটগ্রহণের মাধ্যমে ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনে খলিলুর রহমান লাভ করেন ৯৯টি ভোট, অন্যদিকে তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রীক সাইপ্রাস প্রশাসনের প্রার্থী পান ৯১টি ভোট।
বৈশ্বিক নেতাদের অভিনন্দন ও প্রত্যাশা
সদ্য নির্বাচিত সভাপতি খলিলুর রহমানকে "উষ্ণ অভিনন্দন" জানিয়েছেন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি ও জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বায়ারবক। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত উভয়ে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। বায়ারবক বলেন, "জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির ভূমিকা এখন আর কেবল কাগজে-কলমে নোট পড়ে শোনানোর মতো সাধারণ কোনো প্রক্রিয়া নয়। আমরা অতীতে বহুবার দেখেছি, স্বয়ং কার্যপ্রণালী বিধিগুলোও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।"
তিনি আরও যোগ করেন যে, আগামী তিন মাসে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে, তবে খলিলুর রহমান এই পদের জন্য "সম্পূর্ণ প্রস্তুত"। তার এক দশকেরও বেশি সময়ের কূটনৈতিক ও বহুপাক্ষিক অভিজ্ঞতা একটি কার্যকর, দায়িত্বশীল এবং নির্ভরযোগ্য বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
খলিলুর রহমানের অঙ্গীকার
নির্বাচিত হওয়ার পর খলিলুর রহমান জাতিসংঘের বর্তমান সংকট ও চ্যালেঞ্জগুলোর কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "জাতিসংঘ আজ যুদ্ধ ও সংঘাতসহ একাধিক ফ্রন্টে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হচ্ছে। যে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে আমাদের এই সংস্থাটি গঠিত হয়েছিল, তা আজ মানুষকে অবর্ণনীয় কষ্ট দিচ্ছে।" তিনি সতর্ক করে বলেন, এই চ্যালেঞ্জগুলো জাতিসংঘের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসকে ক্ষুণ্ন করছে এবং তিনি সবাইকে সাথে নিয়ে এই আস্থার সংকট মোকাবেলা করবেন।
তিনি বিশ্বজুড়ে শান্তি রক্ষা ও শান্তি বিনির্মাণে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, যা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেবে। একই সাথে তিনি শান্তিরক্ষা মিশনে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং সর্বস্তরে লিঙ্গ সমতা ও নারী-শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মূল্যায়ন
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নবনির্বাচিত সভাপতিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ৮১তম অধিবেশনের জন্য খলিলুর রহমানের নির্ধারিত মূল প্রতিপাদ্য—"আস্থা পুনর্স্থাপন, রূপান্তর পরিচালনা: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ" (Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations that Delivers for All) সত্যিই একটি অনুপ্রেরণাদায়ী আহ্বান। গুতেরেস বলেন, "এই প্রতিপাদ্যটি ১৯৪৫ সাল থেকে চলে আসা বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রতি তার প্রতিশ্রুতিকে প্রতিফলিত করে।"
মহাসচিব খলিলুর রহমানকে পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দিয়ে বলেন, তার অসাধারণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা কেবল সাধারণ পরিষদেরই নয়, বরং পুরো জাতিসংঘের জন্য সাফল্য বয়ে আনবে। একই সাথে তিনি বিদায়ী সভাপতি আনালেনা বায়ারবককে ধন্যবাদ জানান এবং জাতিসংঘের পঞ্চম নারী সভাপতি হিসেবে বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকার প্রশংসা করেন।
জাতিসংঘের ইতিহাসে বাংলাদেশের কোনো কূটনীতিক বা রাজনীতিবিদের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের ৪১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দীর্ঘ চার দশক পর ২০২৬ সালে এসে খলিলুর রহমানের এই জয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিপক্বতা এবং বিশ্বশান্তি রক্ষায় দেশটির দীর্ঘদিনের অবদানের (বিশেষ করে শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে) এক বড় স্বীকৃতি।
এমন এক সময়ে বাংলাদেশ বিশ্বসভার এই শীর্ষ পদের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে, যখন বৈশ্বিক বিভাজন চরম আকার ধারণ করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার বিভাজনকে সংকল্পে রূপান্তর করা এবং জাতিসংঘের প্রতি বিশ্ববাসীর হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা।
বিষয় : বাংলাদেশ জাতিসংঘ ড. খলিলুর রহমান

বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের (UNGA) সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক নির্বাচনে তিনি গ্রীক সাইপ্রাস প্রশাসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে পরাজিত করেন। আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে তিনি এক বছরের জন্য বিশ্বসংস্থার অন্যতম শীর্ষ এই পদের দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন।
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে বাংলাদেশের এক বিশাল কূটনৈতিক বিজয় অর্জিত হয়েছে। জাতিসংঘের ১৯০টি সদস্য রাষ্ট্রের ভোটগ্রহণের মাধ্যমে ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনে খলিলুর রহমান লাভ করেন ৯৯টি ভোট, অন্যদিকে তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রীক সাইপ্রাস প্রশাসনের প্রার্থী পান ৯১টি ভোট।
বৈশ্বিক নেতাদের অভিনন্দন ও প্রত্যাশা
সদ্য নির্বাচিত সভাপতি খলিলুর রহমানকে "উষ্ণ অভিনন্দন" জানিয়েছেন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি ও জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বায়ারবক। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত উভয়ে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। বায়ারবক বলেন, "জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির ভূমিকা এখন আর কেবল কাগজে-কলমে নোট পড়ে শোনানোর মতো সাধারণ কোনো প্রক্রিয়া নয়। আমরা অতীতে বহুবার দেখেছি, স্বয়ং কার্যপ্রণালী বিধিগুলোও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।"
তিনি আরও যোগ করেন যে, আগামী তিন মাসে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে, তবে খলিলুর রহমান এই পদের জন্য "সম্পূর্ণ প্রস্তুত"। তার এক দশকেরও বেশি সময়ের কূটনৈতিক ও বহুপাক্ষিক অভিজ্ঞতা একটি কার্যকর, দায়িত্বশীল এবং নির্ভরযোগ্য বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
খলিলুর রহমানের অঙ্গীকার
নির্বাচিত হওয়ার পর খলিলুর রহমান জাতিসংঘের বর্তমান সংকট ও চ্যালেঞ্জগুলোর কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "জাতিসংঘ আজ যুদ্ধ ও সংঘাতসহ একাধিক ফ্রন্টে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হচ্ছে। যে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে আমাদের এই সংস্থাটি গঠিত হয়েছিল, তা আজ মানুষকে অবর্ণনীয় কষ্ট দিচ্ছে।" তিনি সতর্ক করে বলেন, এই চ্যালেঞ্জগুলো জাতিসংঘের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসকে ক্ষুণ্ন করছে এবং তিনি সবাইকে সাথে নিয়ে এই আস্থার সংকট মোকাবেলা করবেন।
তিনি বিশ্বজুড়ে শান্তি রক্ষা ও শান্তি বিনির্মাণে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, যা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেবে। একই সাথে তিনি শান্তিরক্ষা মিশনে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং সর্বস্তরে লিঙ্গ সমতা ও নারী-শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মূল্যায়ন
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নবনির্বাচিত সভাপতিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ৮১তম অধিবেশনের জন্য খলিলুর রহমানের নির্ধারিত মূল প্রতিপাদ্য—"আস্থা পুনর্স্থাপন, রূপান্তর পরিচালনা: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ" (Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations that Delivers for All) সত্যিই একটি অনুপ্রেরণাদায়ী আহ্বান। গুতেরেস বলেন, "এই প্রতিপাদ্যটি ১৯৪৫ সাল থেকে চলে আসা বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রতি তার প্রতিশ্রুতিকে প্রতিফলিত করে।"
মহাসচিব খলিলুর রহমানকে পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দিয়ে বলেন, তার অসাধারণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা কেবল সাধারণ পরিষদেরই নয়, বরং পুরো জাতিসংঘের জন্য সাফল্য বয়ে আনবে। একই সাথে তিনি বিদায়ী সভাপতি আনালেনা বায়ারবককে ধন্যবাদ জানান এবং জাতিসংঘের পঞ্চম নারী সভাপতি হিসেবে বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকার প্রশংসা করেন।
জাতিসংঘের ইতিহাসে বাংলাদেশের কোনো কূটনীতিক বা রাজনীতিবিদের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের ৪১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দীর্ঘ চার দশক পর ২০২৬ সালে এসে খলিলুর রহমানের এই জয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিপক্বতা এবং বিশ্বশান্তি রক্ষায় দেশটির দীর্ঘদিনের অবদানের (বিশেষ করে শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে) এক বড় স্বীকৃতি।
এমন এক সময়ে বাংলাদেশ বিশ্বসভার এই শীর্ষ পদের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে, যখন বৈশ্বিক বিভাজন চরম আকার ধারণ করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার বিভাজনকে সংকল্পে রূপান্তর করা এবং জাতিসংঘের প্রতি বিশ্ববাসীর হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা।

আপনার মতামত লিখুন