ভারতের উত্তর প্রদেশে এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মুসলিম সম্প্রদায়, ধর্মান্তর এবং দেশের সংবিধান নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে রাজনৈতিক ঝড় তুলেছেন কুন্ডার বিধায়ক তথা জনসত্তা দল ডেমোক্রেটিক-এর প্রধান রঘূরাজ প্রতাপ সিং (যিনি ‘রাজা ভাইয়া’ নামে পরিচিত)। তিনি দাবি করেছেন, ভারতের বর্তমান মুসলিমদের পূর্বপুরুষরা হিন্দু ছিলেন এবং তারা কেউ আরব দেশ থেকে আসেননি। একই সঙ্গে তিনি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের স্থায়িত্বকে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার সাথে জুড়ে দিয়েছেন।
গত ১৬ মে প্রয়াগরাজ সীমান্তের কাছে মাদুরপুর গ্রামে আয়োজিত একটি ধর্মীয় সমাবেশে বক্তব্য রাখার সময় এই বিতর্কিত মন্তব্য করেন উত্তর প্রদেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা রাজা ভাইয়া। তাঁর এই বক্তব্য সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে রাজা ভাইয়া দাবি করেন, "আজ দেশে যত মুসলিম বসবাস করছেন, তারা সবাই একসময় হিন্দু ছিলেন। তারা আরব দেশ থেকে এখানে আসেননি।" ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেন যে, অতীতে যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তারা মূলত ভয়, চাপ কিংবা লোভের বশবর্তী হয়ে তা করেছিলেন। তিনি আরও যোগ করেন, "যাদের সাহসের অভাব ছিল বা যারা চাপের মুখে পড়েছিলেন, তারাই নিজেদের ধর্ম পরিবর্তন করেছেন। অন্যদিকে, যারা সাহসী ও আত্মত্যাগী ছিলেন, তারা সমস্ত কষ্ট সহ্য করেও নিজেদের সনাতন ধর্মে অবিচল ছিলেন।"
নিজের বক্তৃতায় রাজা ভাইয়া ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় এবং সংবিধানকে দেশের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার সাথে সংযুক্ত করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, সনাতন ধর্ম দুর্বল হলে দেশের সংবিধানও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, "আপনারা প্রায়শই মানুষকে ‘জয় সংবিধান’ বলতে শোনেন। কিন্তু আমি বলতে চাই, যেদিন ভারত হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে না, সেদিন সংবিধানও হয়তো আর একই রকম থাকবে না।" তাঁর দাবি, ভারত আজ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে টিকে আছে কেবল হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ বলেই। দেশের এই বৈচিত্র্য মূলত সনাতন সংস্কৃতির মাধ্যমেই সুরক্ষিত রয়েছে। এ সময় তিনি হিন্দু সম্প্রদায়কে জাতপাতের ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, "সব জাতিগত পার্থক্য পেছনে ফেলে দিন। আমরা সবাই হিন্দু এবং ভাই ভাই।"
তামিলনাড়ুর মন্ত্রী উদয়নিধি স্ট্যালিনের অতীতে করা ‘সনাতন ধর্ম’ সংক্রান্ত মন্তব্যের উল্লেখ করে রাজা ভাইয়া প্রশ্ন তোলেন, কেন এর বিরুদ্ধে আরও জোরালো প্রতিক্রিয়া হয়নি। তিনি বলেন, "এমন কিছু নেতা আছেন যারা প্রকাশ্যে বলেন সনাতন ধর্মকে ধ্বংস করা উচিত এবং এটিকে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগের সাথে তুলনা করেন। একটু ভাবুন, কেউ যদি ইসলাম সম্পর্কে এভাবে কথা বলত, তবে কতটা ক্ষোভের সৃষ্টি হতো।"
রাজা ভাইয়ার এই মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছেন অল ইন্ডিয়া মুসলিম জামায়াতের জাতীয় সভাপতি মাওলানা শাহাবুদ্দিন রাজভি বারেলভি। ভয় বা চাপের কারণে মুসলিমরা ইসলাম গ্রহণ করেছে—এমন দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে এই মুসলিম ধর্মগুরু বলেন, "মানুষ সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং নিজের পছন্দে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। সুফি সাধকেরা ইসলামের বাণী ও শিক্ষা প্রচার করেছিলেন এবং মানুষ এর মানবিক মূল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এই ধর্মকে গ্রহণ করেছে।"
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, ভারতীয় মুসলিমরা এই দেশেরই ভূমিপুত্র। "ভারতে বসবাসকারী মুসলিমরা এখানকারই বাসিন্দা এবং তারা প্রকৃত ভারতীয়। কাউকে জোর করে ধর্ম পরিবর্তন করানো হয়নি।"
ভারতের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের প্রত্যেক নাগরিকের যেকোনো ধর্ম স্বাধীনভাবে বিশ্বাস করার, চর্চা করার এবং প্রচার করার মৌলিক অধিকার রয়েছে। গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সাথে সংবিধানের স্থায়িত্বকে শর্তযুক্ত করা ভারতীয় সাংবিধানিক চেতনার পরিপন্থী বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম ধর্মের বিস্তার একটি দীর্ঘকালীন ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া, যার পেছনে সামাজিক ও রাজনৈতিক নানাবিধ কারণ ছিল। ফলে ঢালাওভাবে একে 'ভয় ও লোভের' ফল হিসেবে আখ্যায়িত করা ঐতিহাসিক বস্তুনিষ্ঠতার অভাবকে নির্দেশ করে। জনপ্রতিনিধিদের এই ধরনের বক্তব্য বহুত্ববাদী সমাজে নাগরিক সৌহার্দ্যের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার প্রশ্ন তোলে।
উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে রঘুরাজ প্রতাপ সিং ওরফে রাজা ভাইয়া একজন প্রভাবশালী ও আলোচিত ব্যক্তিত্ব। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ভারতের ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ভারতীয় মুসলিমদের 'মূলত হিন্দু' বলে দাবি করার নজির রয়েছে, যাকে কেন্দ্র করে প্রায়শই সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাকস্বাধীনতা ও ধর্মীয় ইতিহাস নিয়ে আলোচনার অধিকার সবার থাকলেও, জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য প্রদানের ক্ষেত্রে সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতি যত্নশীল হওয়া বাঞ্ছনীয়। কোনো ঐতিহাসিক সত্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একপাক্ষিক ও আবেগপ্রবণভাবে উপস্থাপন করা দায়িত্বশীল রাজনীতির পরিচয় বহন করে না।
বিষয় : ভারত

মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
ভারতের উত্তর প্রদেশে এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মুসলিম সম্প্রদায়, ধর্মান্তর এবং দেশের সংবিধান নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে রাজনৈতিক ঝড় তুলেছেন কুন্ডার বিধায়ক তথা জনসত্তা দল ডেমোক্রেটিক-এর প্রধান রঘূরাজ প্রতাপ সিং (যিনি ‘রাজা ভাইয়া’ নামে পরিচিত)। তিনি দাবি করেছেন, ভারতের বর্তমান মুসলিমদের পূর্বপুরুষরা হিন্দু ছিলেন এবং তারা কেউ আরব দেশ থেকে আসেননি। একই সঙ্গে তিনি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের স্থায়িত্বকে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার সাথে জুড়ে দিয়েছেন।
গত ১৬ মে প্রয়াগরাজ সীমান্তের কাছে মাদুরপুর গ্রামে আয়োজিত একটি ধর্মীয় সমাবেশে বক্তব্য রাখার সময় এই বিতর্কিত মন্তব্য করেন উত্তর প্রদেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা রাজা ভাইয়া। তাঁর এই বক্তব্য সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে রাজা ভাইয়া দাবি করেন, "আজ দেশে যত মুসলিম বসবাস করছেন, তারা সবাই একসময় হিন্দু ছিলেন। তারা আরব দেশ থেকে এখানে আসেননি।" ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেন যে, অতীতে যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তারা মূলত ভয়, চাপ কিংবা লোভের বশবর্তী হয়ে তা করেছিলেন। তিনি আরও যোগ করেন, "যাদের সাহসের অভাব ছিল বা যারা চাপের মুখে পড়েছিলেন, তারাই নিজেদের ধর্ম পরিবর্তন করেছেন। অন্যদিকে, যারা সাহসী ও আত্মত্যাগী ছিলেন, তারা সমস্ত কষ্ট সহ্য করেও নিজেদের সনাতন ধর্মে অবিচল ছিলেন।"
নিজের বক্তৃতায় রাজা ভাইয়া ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় এবং সংবিধানকে দেশের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার সাথে সংযুক্ত করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, সনাতন ধর্ম দুর্বল হলে দেশের সংবিধানও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, "আপনারা প্রায়শই মানুষকে ‘জয় সংবিধান’ বলতে শোনেন। কিন্তু আমি বলতে চাই, যেদিন ভারত হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে না, সেদিন সংবিধানও হয়তো আর একই রকম থাকবে না।" তাঁর দাবি, ভারত আজ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে টিকে আছে কেবল হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ বলেই। দেশের এই বৈচিত্র্য মূলত সনাতন সংস্কৃতির মাধ্যমেই সুরক্ষিত রয়েছে। এ সময় তিনি হিন্দু সম্প্রদায়কে জাতপাতের ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, "সব জাতিগত পার্থক্য পেছনে ফেলে দিন। আমরা সবাই হিন্দু এবং ভাই ভাই।"
তামিলনাড়ুর মন্ত্রী উদয়নিধি স্ট্যালিনের অতীতে করা ‘সনাতন ধর্ম’ সংক্রান্ত মন্তব্যের উল্লেখ করে রাজা ভাইয়া প্রশ্ন তোলেন, কেন এর বিরুদ্ধে আরও জোরালো প্রতিক্রিয়া হয়নি। তিনি বলেন, "এমন কিছু নেতা আছেন যারা প্রকাশ্যে বলেন সনাতন ধর্মকে ধ্বংস করা উচিত এবং এটিকে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগের সাথে তুলনা করেন। একটু ভাবুন, কেউ যদি ইসলাম সম্পর্কে এভাবে কথা বলত, তবে কতটা ক্ষোভের সৃষ্টি হতো।"
রাজা ভাইয়ার এই মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছেন অল ইন্ডিয়া মুসলিম জামায়াতের জাতীয় সভাপতি মাওলানা শাহাবুদ্দিন রাজভি বারেলভি। ভয় বা চাপের কারণে মুসলিমরা ইসলাম গ্রহণ করেছে—এমন দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে এই মুসলিম ধর্মগুরু বলেন, "মানুষ সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং নিজের পছন্দে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। সুফি সাধকেরা ইসলামের বাণী ও শিক্ষা প্রচার করেছিলেন এবং মানুষ এর মানবিক মূল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এই ধর্মকে গ্রহণ করেছে।"
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, ভারতীয় মুসলিমরা এই দেশেরই ভূমিপুত্র। "ভারতে বসবাসকারী মুসলিমরা এখানকারই বাসিন্দা এবং তারা প্রকৃত ভারতীয়। কাউকে জোর করে ধর্ম পরিবর্তন করানো হয়নি।"
ভারতের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের প্রত্যেক নাগরিকের যেকোনো ধর্ম স্বাধীনভাবে বিশ্বাস করার, চর্চা করার এবং প্রচার করার মৌলিক অধিকার রয়েছে। গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সাথে সংবিধানের স্থায়িত্বকে শর্তযুক্ত করা ভারতীয় সাংবিধানিক চেতনার পরিপন্থী বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম ধর্মের বিস্তার একটি দীর্ঘকালীন ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া, যার পেছনে সামাজিক ও রাজনৈতিক নানাবিধ কারণ ছিল। ফলে ঢালাওভাবে একে 'ভয় ও লোভের' ফল হিসেবে আখ্যায়িত করা ঐতিহাসিক বস্তুনিষ্ঠতার অভাবকে নির্দেশ করে। জনপ্রতিনিধিদের এই ধরনের বক্তব্য বহুত্ববাদী সমাজে নাগরিক সৌহার্দ্যের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার প্রশ্ন তোলে।
উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে রঘুরাজ প্রতাপ সিং ওরফে রাজা ভাইয়া একজন প্রভাবশালী ও আলোচিত ব্যক্তিত্ব। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ভারতের ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ভারতীয় মুসলিমদের 'মূলত হিন্দু' বলে দাবি করার নজির রয়েছে, যাকে কেন্দ্র করে প্রায়শই সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাকস্বাধীনতা ও ধর্মীয় ইতিহাস নিয়ে আলোচনার অধিকার সবার থাকলেও, জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য প্রদানের ক্ষেত্রে সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংবিধানিক কাঠামোর প্রতি যত্নশীল হওয়া বাঞ্ছনীয়। কোনো ঐতিহাসিক সত্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একপাক্ষিক ও আবেগপ্রবণভাবে উপস্থাপন করা দায়িত্বশীল রাজনীতির পরিচয় বহন করে না।

আপনার মতামত লিখুন