মধ্যপ্রাচ্যের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই পরাশক্তি সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বরফ গলতে শুরু করেছে। নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, রিয়াদ প্রশাসন তেহরানের সাথে একটি ঐতিহাসিক ‘অনাক্রমণ পাক্ত’ বা অহিংসা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। চলমান যুদ্ধ ও সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ধাক্কা সামলে উঠে পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন রূপ দিতেই এই গোপন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম 'ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস'-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সৌদি আরব বর্তমানে ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনা অবসানের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনতে একটি সুনির্দিষ্ট চুক্তি নিয়ে কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের পাল্টা হামলার মুখে পড়ার পর রিয়াদের এই কৌশলগত পরিবর্তনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পশ্চিমা কূটনীতিক জানিয়েছেন, সৌদি আরব ১৯৭০-এর দশকের ঐতিহাসিক ‘হেলসিঙ্কি চুক্তি’কে (Helsinki Accords) মডেল হিসেবে ব্যবহার করার কথা ভাবছে। উল্লেখ্য, তৎকালীন শীতল যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে তীব্র উত্তেজনা হ্রাস করতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তদানীন্তন পূর্ব ও পশ্চিম ব্লকের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণকারী এই প্রক্রিয়ায় তুরস্কসহ ৩৫টি দেশ অংশ নিয়েছিল। কূটনীতিকদের মতে, সৌদি আরব কেবল দ্বিপাক্ষিক নয়, বরং এই অনাক্রমণ চুক্তির পরিধি বাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশকেও এর আওতায় আনতে আগ্রহী।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো সৌদি আরবের এই প্রস্তাবকে জোরালো সমর্থন দিচ্ছে এবং তারা চায় এই সম্ভাব্য চুক্তিতে অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোও অন্তর্ভুক্ত হোক। ব্রাসেলসের নীতিপ্রণেতারা মনে করছেন, ভবিষ্যতের বড় কোনো সংঘাত এড়াতে এবং তেহরানকে এই মর্মে আশ্বস্ত করতে যে তাদের ওপর কোনো আক্রমণ হবে না—এটিই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন আরব কূটনীতিক বলেন, "ইরানসহ অন্যান্য মুসলিম দেশগুলো হেলসিঙ্কি প্রক্রিয়ার আদলে তৈরি এই অনাক্রমণ চুক্তিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবে। যেহেতু ইরান অঞ্চলে নিজের প্রভাব ধরে রেখেছে, তাই সৌদি আরব এই বাস্তবতাকে মেনেই বিষয়টিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।"
একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ধরনের প্রতিরক্ষা জোট গড়ে ওঠার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, সৌদি আরবের সাথে তাদের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তিতে তারা তুরস্ক এবং কাতারকেও অন্তর্ভুক্ত করার কথা বিবেচনা করছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েল সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় ইরান যখন মার্কিন ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা আঘাত হানে, তখন থেকেই এই অঞ্চলের নিরাপত্তার সমীকরণ পাল্টাতে শুরু করে। এর মাঝে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং সৌদি আরব ইরানের ভেতরে কিছু গোপন হামলা চালিয়েছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে, যদিও উপসাগরীয় দেশগুলো তা স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটিই করেনি। একই সাথে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়ার গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের তথ্যও সামনে এসেছে। এই সমস্ত জটিল ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটেই সৌদি আরব এখন ইরানের সাথে স্থায়ী শান্তির পথ খুঁজছে।

মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই পরাশক্তি সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বরফ গলতে শুরু করেছে। নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, রিয়াদ প্রশাসন তেহরানের সাথে একটি ঐতিহাসিক ‘অনাক্রমণ পাক্ত’ বা অহিংসা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। চলমান যুদ্ধ ও সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ধাক্কা সামলে উঠে পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন রূপ দিতেই এই গোপন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম 'ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস'-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সৌদি আরব বর্তমানে ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনা অবসানের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনতে একটি সুনির্দিষ্ট চুক্তি নিয়ে কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের পাল্টা হামলার মুখে পড়ার পর রিয়াদের এই কৌশলগত পরিবর্তনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পশ্চিমা কূটনীতিক জানিয়েছেন, সৌদি আরব ১৯৭০-এর দশকের ঐতিহাসিক ‘হেলসিঙ্কি চুক্তি’কে (Helsinki Accords) মডেল হিসেবে ব্যবহার করার কথা ভাবছে। উল্লেখ্য, তৎকালীন শীতল যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে তীব্র উত্তেজনা হ্রাস করতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তদানীন্তন পূর্ব ও পশ্চিম ব্লকের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণকারী এই প্রক্রিয়ায় তুরস্কসহ ৩৫টি দেশ অংশ নিয়েছিল। কূটনীতিকদের মতে, সৌদি আরব কেবল দ্বিপাক্ষিক নয়, বরং এই অনাক্রমণ চুক্তির পরিধি বাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশকেও এর আওতায় আনতে আগ্রহী।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো সৌদি আরবের এই প্রস্তাবকে জোরালো সমর্থন দিচ্ছে এবং তারা চায় এই সম্ভাব্য চুক্তিতে অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোও অন্তর্ভুক্ত হোক। ব্রাসেলসের নীতিপ্রণেতারা মনে করছেন, ভবিষ্যতের বড় কোনো সংঘাত এড়াতে এবং তেহরানকে এই মর্মে আশ্বস্ত করতে যে তাদের ওপর কোনো আক্রমণ হবে না—এটিই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন আরব কূটনীতিক বলেন, "ইরানসহ অন্যান্য মুসলিম দেশগুলো হেলসিঙ্কি প্রক্রিয়ার আদলে তৈরি এই অনাক্রমণ চুক্তিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবে। যেহেতু ইরান অঞ্চলে নিজের প্রভাব ধরে রেখেছে, তাই সৌদি আরব এই বাস্তবতাকে মেনেই বিষয়টিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।"
একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ধরনের প্রতিরক্ষা জোট গড়ে ওঠার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, সৌদি আরবের সাথে তাদের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তিতে তারা তুরস্ক এবং কাতারকেও অন্তর্ভুক্ত করার কথা বিবেচনা করছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েল সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় ইরান যখন মার্কিন ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা আঘাত হানে, তখন থেকেই এই অঞ্চলের নিরাপত্তার সমীকরণ পাল্টাতে শুরু করে। এর মাঝে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং সৌদি আরব ইরানের ভেতরে কিছু গোপন হামলা চালিয়েছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে, যদিও উপসাগরীয় দেশগুলো তা স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটিই করেনি। একই সাথে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়ার গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের তথ্যও সামনে এসেছে। এই সমস্ত জটিল ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটেই সৌদি আরব এখন ইরানের সাথে স্থায়ী শান্তির পথ খুঁজছে।

আপনার মতামত লিখুন