আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো ইসলামিক সেন্টারে সংঘটিত নৃশংস সশস্ত্র হামলার তদন্তে নেমে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে এফবিআই। সংস্থাটি জানিয়েছে, হামলাকারী দুই তরুণ ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচিত হয়ে চরম ইসলামবিদ্বেষ ও বর্ণবাদী ঘৃণ ছড়াত। পরবর্তীতে তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট বাড়িগুলো থেকে ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যা বড় ধরনের কোনো নাশকতার ইঙ্গিত দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ডিয়েগো শহরের বৃহত্তম ইসলামিক সেন্টারে গত ১৮ মে (সোমবার) এক ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটে। এই বর্বরোচিত হামলায় একজন নিরাপত্তা কর্মীসহ মোট ৩ জন নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারান। ঘটনার পর দুই হামলাকারী নিজেরাও আত্মহত্যা করে। মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (FBI) এবং স্থানীয় পুলিশ এটিকে একটি সুনির্দিষ্ট 'নফরত ছড়ানোর অপরাধ' বা 'হেট ক্রাইম' হিসেবে বিবেচনা করে তদন্ত শুরু করেছে।
সান ডিয়েগোতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এফবিআই কর্মকর্তা মার্ক রেমিলি জানান, হামলাকারী দুই তরুণের বয়স যথাক্রমে ১৭ ও ১৮ বছর। তারা মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন ফোরামের মাধ্যমে একে অপরের সাথে পরিচিত হয়। এই তরুণরা দীর্ঘদিন ধরে ইন্টারনেট দুনিয়ায় ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্মবিরোধী চরম উগ্রবাদী ও ঘৃণ্য বক্তব্য প্রচার করে আসছিল।
এফবিআই কর্মকর্তা স্পষ্ট করে বলেন, এই দুই তরুণ তীব্র মুসলিম বিদ্বেষ (ইসলামোফোবিয়া) এবং বর্ণবাদী মতাদর্শ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। বর্তমান সময়ে ইন্টারনেটের এই অন্ধকার জগত এবং বর্ণবাদী ফোরামগুলোর ব্যাপারে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে আরও বেশি সতর্ক ও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তদন্তের স্বার্থে এফবিআই কর্মকর্তারা হামলাকারীদের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং তাদের পরিবারের বাড়িগুলোতে বিশেষ তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করেন। এই অভিযানে মোট ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের সংখ্যা দেখে ধারণা করা হচ্ছে, তাদের পরিকল্পনা আরও বড় এবং দীর্ঘমেয়াদী ছিল। তারা অন্য কোনো স্থানেও হামলার ছক কষেছিল কিনা, তা এখন খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
সান ডিয়েগোর পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াহল সংবাদ সম্মেলনে একটি হৃদয়বিদারক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, হামলার দিনই এক হামলাকারীর মা স্থানীয় পুলিশকে ফোন করে জানান যে, তার ছেলে মানসিকভাবে অত্যন্ত বিপর্যস্ত ও আত্মহননপ্রবণ হয়ে পড়েছে এবং সে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে।
দুর্ভাগ্যবশত, মায়ের এই সতর্কবার্তার ঠিক দুই ঘণ্টার মাথায় সান ডিয়েগো ইসলামিক সেন্টারে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু হয়। পুলিশ তল্লাশি শুরু করার আগেই হামলাকারীরা তাদের নৃশংস মিশন সম্পন্ন করে ফেলে। বর্তমানে এই ঘটনার পেছনে অন্য কোনো আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী চক্রের মদদ রয়েছে কিনা, তা নিয়ে গভীর অনুসন্ধান চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উগ্র ডানপন্থী মতাদর্শ এবং ইসলামভীতি বা বর্ণবাদ কেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ (Domestic Terrorism) আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইন্টারনেটে অবাধে ছড়িয়ে পড়া ঘৃণ্য বক্তব্য এবং সহজে আগ্নেয়াস্ত্র কেনার আইনি কাঠামোর সমালোচনা করে আসছে।
বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই তরুণের হাতে কীভাবে ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র পৌঁছাল এবং তারা কীভাবে জনসমক্ষে এত বড় অপরাধের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করল, তা আমেরিকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইনের কার্যকারিতা নিয়ে পুনরায় বড় প্রশ্ন তুলেছে। ধর্মীয় স্বাধীনতার সুরক্ষা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর কঠোর জবাবদিহিতা এখন সময়ের দাবি।
সান ডিয়েগো ইসলাম সেন্টারটি ওই অঞ্চলের মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান মিলনস্থল ও ধর্মীয় কেন্দ্র। এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের মসজিদ, সিনাগগ ও চার্চে উগ্রবাদী ও বর্ণবাদী হামলার নজির রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইন্টারনেট ভিত্তিক গোপন ফোরামগুলো তরুণ সমাজকে মৌলবাদী ও সহিংস করে তুলতে ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো।
সান ডিয়েগোর এই নৃশংস ঘটনা কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা নয়, বরং এটি তরুণ প্রজন্মের একাংশের মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় ও উগ্রবাদের ভয়াবহ রূপ। ইন্টারনেট জগতের অন্ধকার দিক মোকাবেলা এবং অস্ত্র আইনের ফাঁকফোকর বন্ধে এখনই সম্মিলিত পদক্ষেপ না নিলে, এমন ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হবে।

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬
আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো ইসলামিক সেন্টারে সংঘটিত নৃশংস সশস্ত্র হামলার তদন্তে নেমে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে এফবিআই। সংস্থাটি জানিয়েছে, হামলাকারী দুই তরুণ ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচিত হয়ে চরম ইসলামবিদ্বেষ ও বর্ণবাদী ঘৃণ ছড়াত। পরবর্তীতে তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট বাড়িগুলো থেকে ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যা বড় ধরনের কোনো নাশকতার ইঙ্গিত দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ডিয়েগো শহরের বৃহত্তম ইসলামিক সেন্টারে গত ১৮ মে (সোমবার) এক ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটে। এই বর্বরোচিত হামলায় একজন নিরাপত্তা কর্মীসহ মোট ৩ জন নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারান। ঘটনার পর দুই হামলাকারী নিজেরাও আত্মহত্যা করে। মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (FBI) এবং স্থানীয় পুলিশ এটিকে একটি সুনির্দিষ্ট 'নফরত ছড়ানোর অপরাধ' বা 'হেট ক্রাইম' হিসেবে বিবেচনা করে তদন্ত শুরু করেছে।
সান ডিয়েগোতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এফবিআই কর্মকর্তা মার্ক রেমিলি জানান, হামলাকারী দুই তরুণের বয়স যথাক্রমে ১৭ ও ১৮ বছর। তারা মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন ফোরামের মাধ্যমে একে অপরের সাথে পরিচিত হয়। এই তরুণরা দীর্ঘদিন ধরে ইন্টারনেট দুনিয়ায় ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্মবিরোধী চরম উগ্রবাদী ও ঘৃণ্য বক্তব্য প্রচার করে আসছিল।
এফবিআই কর্মকর্তা স্পষ্ট করে বলেন, এই দুই তরুণ তীব্র মুসলিম বিদ্বেষ (ইসলামোফোবিয়া) এবং বর্ণবাদী মতাদর্শ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। বর্তমান সময়ে ইন্টারনেটের এই অন্ধকার জগত এবং বর্ণবাদী ফোরামগুলোর ব্যাপারে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে আরও বেশি সতর্ক ও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তদন্তের স্বার্থে এফবিআই কর্মকর্তারা হামলাকারীদের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং তাদের পরিবারের বাড়িগুলোতে বিশেষ তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করেন। এই অভিযানে মোট ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের সংখ্যা দেখে ধারণা করা হচ্ছে, তাদের পরিকল্পনা আরও বড় এবং দীর্ঘমেয়াদী ছিল। তারা অন্য কোনো স্থানেও হামলার ছক কষেছিল কিনা, তা এখন খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
সান ডিয়েগোর পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াহল সংবাদ সম্মেলনে একটি হৃদয়বিদারক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, হামলার দিনই এক হামলাকারীর মা স্থানীয় পুলিশকে ফোন করে জানান যে, তার ছেলে মানসিকভাবে অত্যন্ত বিপর্যস্ত ও আত্মহননপ্রবণ হয়ে পড়েছে এবং সে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে।
দুর্ভাগ্যবশত, মায়ের এই সতর্কবার্তার ঠিক দুই ঘণ্টার মাথায় সান ডিয়েগো ইসলামিক সেন্টারে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু হয়। পুলিশ তল্লাশি শুরু করার আগেই হামলাকারীরা তাদের নৃশংস মিশন সম্পন্ন করে ফেলে। বর্তমানে এই ঘটনার পেছনে অন্য কোনো আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী চক্রের মদদ রয়েছে কিনা, তা নিয়ে গভীর অনুসন্ধান চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উগ্র ডানপন্থী মতাদর্শ এবং ইসলামভীতি বা বর্ণবাদ কেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ (Domestic Terrorism) আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইন্টারনেটে অবাধে ছড়িয়ে পড়া ঘৃণ্য বক্তব্য এবং সহজে আগ্নেয়াস্ত্র কেনার আইনি কাঠামোর সমালোচনা করে আসছে।
বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই তরুণের হাতে কীভাবে ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র পৌঁছাল এবং তারা কীভাবে জনসমক্ষে এত বড় অপরাধের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করল, তা আমেরিকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইনের কার্যকারিতা নিয়ে পুনরায় বড় প্রশ্ন তুলেছে। ধর্মীয় স্বাধীনতার সুরক্ষা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর কঠোর জবাবদিহিতা এখন সময়ের দাবি।
সান ডিয়েগো ইসলাম সেন্টারটি ওই অঞ্চলের মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান মিলনস্থল ও ধর্মীয় কেন্দ্র। এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের মসজিদ, সিনাগগ ও চার্চে উগ্রবাদী ও বর্ণবাদী হামলার নজির রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইন্টারনেট ভিত্তিক গোপন ফোরামগুলো তরুণ সমাজকে মৌলবাদী ও সহিংস করে তুলতে ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো।
সান ডিয়েগোর এই নৃশংস ঘটনা কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা নয়, বরং এটি তরুণ প্রজন্মের একাংশের মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় ও উগ্রবাদের ভয়াবহ রূপ। ইন্টারনেট জগতের অন্ধকার দিক মোকাবেলা এবং অস্ত্র আইনের ফাঁকফোকর বন্ধে এখনই সম্মিলিত পদক্ষেপ না নিলে, এমন ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হবে।

আপনার মতামত লিখুন