এক অভূতপূর্ব মানবিক বিপর্যয় ও গভীর শোকের মধ্য দিয়ে পবিত্র কুরবানির ঈদ উদযাপন করছেন ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার বাসিন্দারা। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া অবিরাম ইসরায়েলি হামলা ও কঠোর অবরোধের মুখে অবরুদ্ধ এই অঞ্চলের মানুষ ঈদের প্রথম সকালে মেতে ওঠেননি কোনো আনন্দে। এর পরিবর্তে, তারা ভিড় করেছেন হামলায় নিহত নিজেদের প্রিয়জনদের কবরের পাশে, যেখানে ঈদের আনন্দ রূপ নিয়েছে বুকফাটা আর্তনাদে।
চলমান যুদ্ধ আর স্বজন হারানোর ক্ষত বুকে নিয়ে আরও একটি কুরবানির ঈদ পার করছে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার লাখো মানুষ। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও, তা লঙ্ঘন করে গাজার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিনিয়ত সামরিক অভিযান ও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। ফলে এবারের ঈদেও আনন্দের বদলে গাজার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে শোকের মাতমে।
বুধবার (২৭ মে, ২০২৬) কুরবানির ঈদের প্রথম দিন সকাল থেকেই গাজা উপত্যকার দক্ষিণ অঞ্চলের শহর খান ইউনুসের কবরস্থানগুলোতে মানুষের ঢল নামে। ইসরায়েলি বর্বর হামলায় প্রাণ হারানো মা, বাবা, সন্তান কিংবা ভাই-বোনকে স্মরণ করতে সাতসকালেই ছুটে আসেন যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনিরা। কবরের পাশে বসে তারা পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করেন, চোখের পানিতে মোনাজাত করেন এবং প্রিয়জনদের স্মৃতিচারণ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সন্তান ছাড়া এটি আমার প্রথম ঈদ
ইসরায়েলি হামলায় নিজের কলিজার টুকরো ছেলেকে হারানো ফিলিস্তিনি মা উম্মু শুকরি আস-সুফি তার জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম এই ঈদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, "আমার ছেলে শহীদ হয়েছে এবং তাকে ছাড়া এটিই আমার প্রথম ঈদ। সে অত্যন্ত দয়ালু ছিল, সবসময় মানুষকে সাহায্য করত। আজ এখানে সবার হৃদয় ক্ষতবিক্ষত, সবার মন ভাঙা। গাজায় প্রতিদিন মানুষ শহীদ হচ্ছে, প্রতিদিন যোগ হচ্ছে নতুন নতুন কষ্ট। আমি জানতে চাই, কোথায় সেই যুদ্ধবিরতি?"
জীবন আজ পুরোপুরি বিপর্যস্ত
প্রায় ৯ মাস আগে ইসরায়েলি হামলায় নিজের তরুণ ছেলে জিয়াদ মুহাম্মদ আবু জারিশকে হারিয়েছেন ফায়িজ আবু জারিশ। সন্তানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এই বৃদ্ধ পিতা বলেন, "সেদিন আমি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটি হারিয়েছি। আমার জন্য জীবন যেন সেখানেই থমকে গেছে। আমাদের মাথা গোঁজার মতো কোনো বাড়ি নেই, আমরা রাস্তায় দিন কাটাচ্ছি। প্রতিদিন চোখের সামনে মানুষ মরছে। আজ আল্লাহ ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই।"
ভাইকে হারিয়ে নিঃস্ব বোন
অন্যদের সাহায্য করতে গিয়ে ইসরায়েলি বোমার আঘাতে প্রাণ হারান মুহাম্মদ ফাওজি গাবেন। তার বোন নিজের নাম প্রকাশ না করে অত্যন্ত আকুল কণ্ঠে বলেন, "আমার ভাইকে ছাড়া এই ঈদের কোনো অর্থই নেই আমাদের কাছে। তারা মুখে যুদ্ধবিরতির কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে আমরা তার কিছুই দেখছি না। প্রতিদিন নতুন নতুন হামলা হচ্ছে, মায়েরা তাদের সন্তানদের হারাচ্ছে। আমি আমার ভাইকে হারিয়েছি, যে ছিল আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।"
গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ সময় ধরে চলমান এই নৃসংশতা ও অবরোধ ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। যুদ্ধবিরতির আন্তর্জাতিক আহ্বান ও চুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইসরায়েলের এই ধারাবাহিক আগ্রাসনের কারণে হাজার হাজার পরিবারকে আজ ঈদের দিনটি কাটাতে হচ্ছে কবরস্থানের নিস্তব্ধতায়। ফলে উৎসবের গাজা আজ পরিণত হয়েছে এক বিশাল শোকের উপত্যকায়।
একটি উৎসবের দিন যেখানে আনন্দ ও মিলনের বার্তা নিয়ে আসার কথা, সেখানে গাজাবাসীর জন্য তা হয়ে দাঁড়িয়েছে হারানোর বেদনা পুনরুজ্জীবিত করার দিন। স্থায়ী ও কার্যকর রাজনৈতিক সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া এই মানবিক সংকটের অবসান ঘটা অসম্ভব।

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬
এক অভূতপূর্ব মানবিক বিপর্যয় ও গভীর শোকের মধ্য দিয়ে পবিত্র কুরবানির ঈদ উদযাপন করছেন ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার বাসিন্দারা। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া অবিরাম ইসরায়েলি হামলা ও কঠোর অবরোধের মুখে অবরুদ্ধ এই অঞ্চলের মানুষ ঈদের প্রথম সকালে মেতে ওঠেননি কোনো আনন্দে। এর পরিবর্তে, তারা ভিড় করেছেন হামলায় নিহত নিজেদের প্রিয়জনদের কবরের পাশে, যেখানে ঈদের আনন্দ রূপ নিয়েছে বুকফাটা আর্তনাদে।
চলমান যুদ্ধ আর স্বজন হারানোর ক্ষত বুকে নিয়ে আরও একটি কুরবানির ঈদ পার করছে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার লাখো মানুষ। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও, তা লঙ্ঘন করে গাজার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিনিয়ত সামরিক অভিযান ও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। ফলে এবারের ঈদেও আনন্দের বদলে গাজার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে শোকের মাতমে।
বুধবার (২৭ মে, ২০২৬) কুরবানির ঈদের প্রথম দিন সকাল থেকেই গাজা উপত্যকার দক্ষিণ অঞ্চলের শহর খান ইউনুসের কবরস্থানগুলোতে মানুষের ঢল নামে। ইসরায়েলি বর্বর হামলায় প্রাণ হারানো মা, বাবা, সন্তান কিংবা ভাই-বোনকে স্মরণ করতে সাতসকালেই ছুটে আসেন যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনিরা। কবরের পাশে বসে তারা পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করেন, চোখের পানিতে মোনাজাত করেন এবং প্রিয়জনদের স্মৃতিচারণ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সন্তান ছাড়া এটি আমার প্রথম ঈদ
ইসরায়েলি হামলায় নিজের কলিজার টুকরো ছেলেকে হারানো ফিলিস্তিনি মা উম্মু শুকরি আস-সুফি তার জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম এই ঈদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, "আমার ছেলে শহীদ হয়েছে এবং তাকে ছাড়া এটিই আমার প্রথম ঈদ। সে অত্যন্ত দয়ালু ছিল, সবসময় মানুষকে সাহায্য করত। আজ এখানে সবার হৃদয় ক্ষতবিক্ষত, সবার মন ভাঙা। গাজায় প্রতিদিন মানুষ শহীদ হচ্ছে, প্রতিদিন যোগ হচ্ছে নতুন নতুন কষ্ট। আমি জানতে চাই, কোথায় সেই যুদ্ধবিরতি?"
জীবন আজ পুরোপুরি বিপর্যস্ত
প্রায় ৯ মাস আগে ইসরায়েলি হামলায় নিজের তরুণ ছেলে জিয়াদ মুহাম্মদ আবু জারিশকে হারিয়েছেন ফায়িজ আবু জারিশ। সন্তানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এই বৃদ্ধ পিতা বলেন, "সেদিন আমি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটি হারিয়েছি। আমার জন্য জীবন যেন সেখানেই থমকে গেছে। আমাদের মাথা গোঁজার মতো কোনো বাড়ি নেই, আমরা রাস্তায় দিন কাটাচ্ছি। প্রতিদিন চোখের সামনে মানুষ মরছে। আজ আল্লাহ ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই।"
ভাইকে হারিয়ে নিঃস্ব বোন
অন্যদের সাহায্য করতে গিয়ে ইসরায়েলি বোমার আঘাতে প্রাণ হারান মুহাম্মদ ফাওজি গাবেন। তার বোন নিজের নাম প্রকাশ না করে অত্যন্ত আকুল কণ্ঠে বলেন, "আমার ভাইকে ছাড়া এই ঈদের কোনো অর্থই নেই আমাদের কাছে। তারা মুখে যুদ্ধবিরতির কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে আমরা তার কিছুই দেখছি না। প্রতিদিন নতুন নতুন হামলা হচ্ছে, মায়েরা তাদের সন্তানদের হারাচ্ছে। আমি আমার ভাইকে হারিয়েছি, যে ছিল আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।"
গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ সময় ধরে চলমান এই নৃসংশতা ও অবরোধ ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। যুদ্ধবিরতির আন্তর্জাতিক আহ্বান ও চুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইসরায়েলের এই ধারাবাহিক আগ্রাসনের কারণে হাজার হাজার পরিবারকে আজ ঈদের দিনটি কাটাতে হচ্ছে কবরস্থানের নিস্তব্ধতায়। ফলে উৎসবের গাজা আজ পরিণত হয়েছে এক বিশাল শোকের উপত্যকায়।
একটি উৎসবের দিন যেখানে আনন্দ ও মিলনের বার্তা নিয়ে আসার কথা, সেখানে গাজাবাসীর জন্য তা হয়ে দাঁড়িয়েছে হারানোর বেদনা পুনরুজ্জীবিত করার দিন। স্থায়ী ও কার্যকর রাজনৈতিক সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া এই মানবিক সংকটের অবসান ঘটা অসম্ভব।

আপনার মতামত লিখুন