শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬
শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬
কওমী টাইমস

২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের সাথে আসা এক কুকুরের অবিশ্বাস্য প্রভুভক্তি এবং আসহাবে কাহাফ ও হাচিকোর ঐতিহাসিক গল্পে আল্লাহর সৃষ্টির গভীর রহস্য

মহান আল্লাহর সৃষ্টির মহিমা: অবহেলিত ‘কুকুর’ কেন মানুষের পরম বিশ্বস্ত সঙ্গী?



মহান আল্লাহর সৃষ্টির মহিমা: অবহেলিত ‘কুকুর’ কেন মানুষের পরম বিশ্বস্ত সঙ্গী?
ছবি: রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গে সেই কুকুরটি।

ইসলামিক বিধান অনুযায়ী কুকুরের লালন-পালন ও স্পর্শের ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ থাকলেও আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টিই পরম প্রজ্ঞাময়। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে জাতিগত সহিংসতার শিকার হয়ে পালিয়ে আসা এক রোহিঙ্গা শরণার্থীর সাথে তার পোষা কুকুরের অবিশ্বাস্য নাফ নদী পাড়ি দেওয়ার ঘটনা আল্লাহর এই সৃষ্টির অতুলনীয় হিকমত ও প্রভুভক্তিকে নতুন করে বিশ্বদরবারে ফুটিয়ে তুলেছে।

ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে কুকুর এমন এক প্রাণী যা খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, বিনা কারণে ঘরে পালাও বারণ। এমনকি কুকুর নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে গেলে নামাজে বিঘ্ন ঘটে এবং এর লালা খাবার পাত্রে লাগলে তা সাতবার ধুয়ে মাটি দিয়ে ঘষার বিধান রয়েছে। এত সব সতর্কতা ও বাহ্যিক অপবিত্রতার পরেও মহান আল্লাহ কেন এই প্রাণীটি সৃষ্টি করলেন? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে প্রাণীকুলের প্রতি আল্লাহর বিশেষ হিকমত (প্রজ্ঞা) এবং কুকুরের অবিকল্প বিশ্বস্ততার মাঝে।

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ‘আসহাবে কাহাফ’ বা গুহাবাসীদের সঙ্গী হিসেবে কোনো সিংহ, ঘোড়া বা বলবান মহিষ ছিল না; বরং ছিল একটি বিশ্বস্ত কুকুর। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত সুফি সাধক মাওলানা রুমি (র.) লিখেছেন— ঘৃণ্য বা অপবিত্র আকৃতির জন্য আসহাবে কাহাফের কুকুরের কিইবা ক্ষতি, যখন তার আত্মা ডুবে ছিল নূরের সমুদ্রে!

মিয়ানমার থেকে আসা সাদেকের কুকুর

২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে মিয়ানমারে বার্মিজ সৈন্যদের বর্বরতায় ঘরবাড়ি হারিয়ে জনাব সাদেক নামের এক ব্যক্তি বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। তার সাথে ছিল দীর্ঘ পথ না খেয়ে পাড়ি দেওয়া তার পোষা কুকুরটি। যখন সৈন্যরা তাদের ওপর আক্রমণ করেছিল, তখন এই কুকুরটিই জীবন বাজি রেখে তেড়ে গিয়েছিল। নাফ নদীর পাড়ে দীর্ঘ পাঁচ দিন সাদেকের পরিবারের সাথে বসে থাকার পর, তারা যখন ট্রলারে করে বাংলাদেশের শাহপরীর দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা হয়, তখন কুকুরটিকে ঘাটে রেখে আসা হয়েছিল।

কিন্তু ট্রলার ছেড়ে দেওয়ার পর কুকুরটি পাড়ে দাঁড়িয়ে ডাকাডাকি শুরু করে এবং একপর্যায়ে মালিকের টানে উত্তাল নদীর স্রোতে সাঁতার কাটতে শুরু করে। কুকুরের এই অবর্ণনীয় ভালোবাসা দেখে ট্রলারের মাঝিরা ট্রলার ঘুরিয়ে আনতে বাধ্য হন এবং অতিরিক্ত একজন মানুষের সমপরিমাণ ভাড়া দেওয়ার শর্তে কুকুরটিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়।

বিশ্বজুড়ে কুকুরের বিশ্বস্ততার অমর ইতিহাস

কুকুরের এই চরম আনুগত্যের উদাহরণ কেবল ২০১৭ সালের এই ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। জাপানের ‘হাচিকো’ নামক কুকুরের গল্প বিশ্ববিখ্যাত, যে তার মৃত প্রফেসরের অপেক্ষায় দীর্ঘ ৯ বছর শিবুয়া ট্রেন স্টেশনে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বসে থেকে সেখানেই প্রাণত্যাগ করেছিল। কিংবা অস্ট্রেলিয়ার ‘রেড ডগ’, যে তার মালিকের মৃত্যুর পর পুরো অস্ট্রেলিয়ার উপকূল চষে বেড়িয়েছিল মালিকের খোঁজে।

সুফিবাদের মহান সাধক হযরত শিবলি (র.)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি তাসাউফ বা আধ্যাত্মিকতা কীভাবে শিখলেন? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, এক রাতে তিনি দেখেছিলেন এক কুকুরকে তার মালিক বারবার তাড়িয়ে দিলেও সে অবাধ্য না হয়ে পরম নির্লজ্জের মতো মালিকের দরজায় পড়ে আছে। কারণ, তার যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই। একইভাবে যুন-নূন তাসাউফের সংজ্ঞায় বলেছেন— প্রেমাষ্পদ বা আল্লাহ যদি তাড়িয়েও দেন, তবুও তাঁর দরজায় পড়ে থাকার নামই তাসাউফ, যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই অবলা প্রাণীটি।

অতএব, মানুষের চোখে যা অপ্রয়োজনীয় বা অপবিত্র মনে হয়, আল্লাহর সৃষ্টিগত প্রজ্ঞায় তার পেছনে লুকিয়ে থাকে এক গভীর শিক্ষা। ২০১৭ সালের শরণার্থীদের সাথে আসা সেই কুকুরটি আজো মানুষকে মনে করিয়ে দেয়— আল্লাহর কোনো সৃষ্টিই হিকমতের বাইরে নয়।

বিষয় : রোহিঙ্গা কুকুর সৃষ্টির মহিমা আসহাবে কাহাফ

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬


মহান আল্লাহর সৃষ্টির মহিমা: অবহেলিত ‘কুকুর’ কেন মানুষের পরম বিশ্বস্ত সঙ্গী?

প্রকাশের তারিখ : ২৯ মে ২০২৬

featured Image

ইসলামিক বিধান অনুযায়ী কুকুরের লালন-পালন ও স্পর্শের ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ থাকলেও আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টিই পরম প্রজ্ঞাময়। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে জাতিগত সহিংসতার শিকার হয়ে পালিয়ে আসা এক রোহিঙ্গা শরণার্থীর সাথে তার পোষা কুকুরের অবিশ্বাস্য নাফ নদী পাড়ি দেওয়ার ঘটনা আল্লাহর এই সৃষ্টির অতুলনীয় হিকমত ও প্রভুভক্তিকে নতুন করে বিশ্বদরবারে ফুটিয়ে তুলেছে।

ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে কুকুর এমন এক প্রাণী যা খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, বিনা কারণে ঘরে পালাও বারণ। এমনকি কুকুর নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে গেলে নামাজে বিঘ্ন ঘটে এবং এর লালা খাবার পাত্রে লাগলে তা সাতবার ধুয়ে মাটি দিয়ে ঘষার বিধান রয়েছে। এত সব সতর্কতা ও বাহ্যিক অপবিত্রতার পরেও মহান আল্লাহ কেন এই প্রাণীটি সৃষ্টি করলেন? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে প্রাণীকুলের প্রতি আল্লাহর বিশেষ হিকমত (প্রজ্ঞা) এবং কুকুরের অবিকল্প বিশ্বস্ততার মাঝে।

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ‘আসহাবে কাহাফ’ বা গুহাবাসীদের সঙ্গী হিসেবে কোনো সিংহ, ঘোড়া বা বলবান মহিষ ছিল না; বরং ছিল একটি বিশ্বস্ত কুকুর। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত সুফি সাধক মাওলানা রুমি (র.) লিখেছেন— ঘৃণ্য বা অপবিত্র আকৃতির জন্য আসহাবে কাহাফের কুকুরের কিইবা ক্ষতি, যখন তার আত্মা ডুবে ছিল নূরের সমুদ্রে!

মিয়ানমার থেকে আসা সাদেকের কুকুর

২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে মিয়ানমারে বার্মিজ সৈন্যদের বর্বরতায় ঘরবাড়ি হারিয়ে জনাব সাদেক নামের এক ব্যক্তি বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। তার সাথে ছিল দীর্ঘ পথ না খেয়ে পাড়ি দেওয়া তার পোষা কুকুরটি। যখন সৈন্যরা তাদের ওপর আক্রমণ করেছিল, তখন এই কুকুরটিই জীবন বাজি রেখে তেড়ে গিয়েছিল। নাফ নদীর পাড়ে দীর্ঘ পাঁচ দিন সাদেকের পরিবারের সাথে বসে থাকার পর, তারা যখন ট্রলারে করে বাংলাদেশের শাহপরীর দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা হয়, তখন কুকুরটিকে ঘাটে রেখে আসা হয়েছিল।

কিন্তু ট্রলার ছেড়ে দেওয়ার পর কুকুরটি পাড়ে দাঁড়িয়ে ডাকাডাকি শুরু করে এবং একপর্যায়ে মালিকের টানে উত্তাল নদীর স্রোতে সাঁতার কাটতে শুরু করে। কুকুরের এই অবর্ণনীয় ভালোবাসা দেখে ট্রলারের মাঝিরা ট্রলার ঘুরিয়ে আনতে বাধ্য হন এবং অতিরিক্ত একজন মানুষের সমপরিমাণ ভাড়া দেওয়ার শর্তে কুকুরটিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়।

বিশ্বজুড়ে কুকুরের বিশ্বস্ততার অমর ইতিহাস

কুকুরের এই চরম আনুগত্যের উদাহরণ কেবল ২০১৭ সালের এই ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। জাপানের ‘হাচিকো’ নামক কুকুরের গল্প বিশ্ববিখ্যাত, যে তার মৃত প্রফেসরের অপেক্ষায় দীর্ঘ ৯ বছর শিবুয়া ট্রেন স্টেশনে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বসে থেকে সেখানেই প্রাণত্যাগ করেছিল। কিংবা অস্ট্রেলিয়ার ‘রেড ডগ’, যে তার মালিকের মৃত্যুর পর পুরো অস্ট্রেলিয়ার উপকূল চষে বেড়িয়েছিল মালিকের খোঁজে।

সুফিবাদের মহান সাধক হযরত শিবলি (র.)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি তাসাউফ বা আধ্যাত্মিকতা কীভাবে শিখলেন? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, এক রাতে তিনি দেখেছিলেন এক কুকুরকে তার মালিক বারবার তাড়িয়ে দিলেও সে অবাধ্য না হয়ে পরম নির্লজ্জের মতো মালিকের দরজায় পড়ে আছে। কারণ, তার যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই। একইভাবে যুন-নূন তাসাউফের সংজ্ঞায় বলেছেন— প্রেমাষ্পদ বা আল্লাহ যদি তাড়িয়েও দেন, তবুও তাঁর দরজায় পড়ে থাকার নামই তাসাউফ, যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই অবলা প্রাণীটি।

অতএব, মানুষের চোখে যা অপ্রয়োজনীয় বা অপবিত্র মনে হয়, আল্লাহর সৃষ্টিগত প্রজ্ঞায় তার পেছনে লুকিয়ে থাকে এক গভীর শিক্ষা। ২০১৭ সালের শরণার্থীদের সাথে আসা সেই কুকুরটি আজো মানুষকে মনে করিয়ে দেয়— আল্লাহর কোনো সৃষ্টিই হিকমতের বাইরে নয়।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ