যুক্তরাজ্যে বসবাসরত মুসলিমদের প্রতি উগ্র ও বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাবের এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে কাজ করা থিংক-ট্যাংক 'ব্রিটিশ ফিউচার' এবং সরকারের ইসলামোফোবিয়া বিরোধী সহযোগী সংস্থা 'ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্ট'-এর যৌথ প্রতিবেদনে জানা গেছে, প্রতি ৬ জন ব্রিটিশ নাগরিকের মধ্যে ১ জন মুসলিমদের উপস্থিতিকে যুক্তরাজ্যের সংস্কৃতির জন্য হুমকি মনে করেন। তবে এই তীব্র নেতিবাচকতার বিপরীতে দেশের একটি বড় অংশ এখনো মুসলিমদের সমান নাগরিক অধিকার এবং সহাবস্থানে বিশ্বাস রাখে।
যুক্তরাজ্যে সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ মুসলিমদের দেশের সমান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করলেও, মুসলিম বিরোধী মনোভাব এবং ইসলামোফোবিয়া সমাজ ও অনলাইন মাধ্যমে বিপজ্জনকভাবে স্বাভাবিক রূপ নিচ্ছে। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, "আন্ডারস্ট্যান্ডিং অ্যান্টি-মুসলিম হসটিলিটি: ফাউন্ডেশনস ফর অ্যাকশন" (Understanding Anti-Muslim Hostility: Foundations for Action) শীর্ষক এই গবেষণাপত্রটি ২,০০০ সাধারণ নাগরিক এবং ১,০০০ মুসলিমের ওপর জরিপ চালিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
চরম বিদ্বেষের পরিসংখ্যান
জরিপে অংশ নেওয়া সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকদের ১৭ শতাংশ (প্রতি ৬ জনে ১ জন) সরাসরি একমত প্রকাশ করেছেন যে, "মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া যুক্তরাজ্যের সংস্কৃতির জন্য একটি মৌলিক হুমকি।" এছাড়া, ১৯ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া একজন মুসলিম কখনোই এখানে জন্ম নেওয়া একজন শ্বেতাঙ্গ বা অমুসলিম নাগরিকের মতো সমমানের ব্রিটিশ হতে পারেন না।
সম্প্রীতির আশা ও ইতিবাচক দিক
ভীতিকর এই পরিসংখ্যানের পাশাপাশি আশার আলো দেখা গেছে সিংহভাগ ব্রিটিশ নাগরিকদের ভাবনায়। জরিপ অনুযায়ী, ৫২ শতাংশ সাধারণ নাগরিক মনে করেন মুসলিমরা অন্য যেকোনো শ্বেতাঙ্গ বা অমুসলিম নাগরিকের মতোই সমানভাবে ব্রিটিশ। ৫৭ শতাংশ নাগরিক বিশ্বাস করেন, যুক্তরাজ্যের শহর ও জনপদে মুসলিম ও অমুসলিমরা অত্যন্ত চমৎকারভাবে একসঙ্গে বসবাস করতে পারে।
একই সঙ্গে, মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য যে বিদ্যমান, তা স্বীকার করেছেন ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা। আর ৬১ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক চান যে সরকার এই মুসলিম বিরোধী কুসংস্কার ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিক। এর বিপরীতে সরকারি পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ।
ব্রিটিশ মুসলিমদের গভীর স্বস্তি ও নিরাপত্তা শঙ্কা
যুক্তরাজ্যের মুসলিমদের মাঝে দেশাত্মবোধ এবং অধিকারের চেতনা অত্যন্ত সুদৃঢ়। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৩ শতাংশ মুসলিম মনে করেন, মুসলিম হিসেবে বসবাসের জন্য যুক্তরাজ্য একটি চমৎকার দেশ। এবং ৬৯ শতাংশ মুসলিম নিজেদের যুক্তরাজ্যের পূর্ণাঙ্গ ও সমান নাগরিক বলে মনে করেন।
তবে উগ্র ডানপন্থী ও বর্ণবাদীদের তৎপরতায় মুসলিমদের নিরাপত্তা শঙ্কা বাড়ছে। গত এক বছরে নিজের ধর্মের কারণে বৈষম্য বা বিদ্বেষের শিকার হয়েছেন এমন মুসলিমের হার ৫৬ শতাংশ। বিশেষ করে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে উগ্রপন্থীদের "ইউনাইট দ্য কিংডম" (Unite the Kingdom) নামক সমাবেশের পর থেকে ৬১ শতাংশ মুসলিম নিজেদের চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে এই নিরাপত্তাহীনতার হার আরও ভয়াবহ—প্রায় ৬৯ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও করণীয়
ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্টের পরিচালক আকিলা আহমেদ বলেন, "যুক্তরাজ্যের মুসলিমরা দেশের প্রতি গভীর অনুগত এবং ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু অনলাইন ও অফলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য ও ইসলামোফোবিক অপপ্রচার তাদের এই স্বস্তি ও অধিকারের জায়গায় আঘাত করছে।"
ব্রিটিশ ফিউচারের পরিচালক সুন্দরের কাটওয়ালা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, "মুসলিমদের বিরুদ্ধে এই বৈষম্য ও উগ্র বিদ্বেষকে সমাজে কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে দেওয়া যায় না। এখনই উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।"
বিষয় : যুক্তরাজ্য ইসলামোফোবিয়া

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬
যুক্তরাজ্যে বসবাসরত মুসলিমদের প্রতি উগ্র ও বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাবের এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে কাজ করা থিংক-ট্যাংক 'ব্রিটিশ ফিউচার' এবং সরকারের ইসলামোফোবিয়া বিরোধী সহযোগী সংস্থা 'ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্ট'-এর যৌথ প্রতিবেদনে জানা গেছে, প্রতি ৬ জন ব্রিটিশ নাগরিকের মধ্যে ১ জন মুসলিমদের উপস্থিতিকে যুক্তরাজ্যের সংস্কৃতির জন্য হুমকি মনে করেন। তবে এই তীব্র নেতিবাচকতার বিপরীতে দেশের একটি বড় অংশ এখনো মুসলিমদের সমান নাগরিক অধিকার এবং সহাবস্থানে বিশ্বাস রাখে।
যুক্তরাজ্যে সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ মুসলিমদের দেশের সমান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করলেও, মুসলিম বিরোধী মনোভাব এবং ইসলামোফোবিয়া সমাজ ও অনলাইন মাধ্যমে বিপজ্জনকভাবে স্বাভাবিক রূপ নিচ্ছে। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, "আন্ডারস্ট্যান্ডিং অ্যান্টি-মুসলিম হসটিলিটি: ফাউন্ডেশনস ফর অ্যাকশন" (Understanding Anti-Muslim Hostility: Foundations for Action) শীর্ষক এই গবেষণাপত্রটি ২,০০০ সাধারণ নাগরিক এবং ১,০০০ মুসলিমের ওপর জরিপ চালিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
চরম বিদ্বেষের পরিসংখ্যান
জরিপে অংশ নেওয়া সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকদের ১৭ শতাংশ (প্রতি ৬ জনে ১ জন) সরাসরি একমত প্রকাশ করেছেন যে, "মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া যুক্তরাজ্যের সংস্কৃতির জন্য একটি মৌলিক হুমকি।" এছাড়া, ১৯ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া একজন মুসলিম কখনোই এখানে জন্ম নেওয়া একজন শ্বেতাঙ্গ বা অমুসলিম নাগরিকের মতো সমমানের ব্রিটিশ হতে পারেন না।
সম্প্রীতির আশা ও ইতিবাচক দিক
ভীতিকর এই পরিসংখ্যানের পাশাপাশি আশার আলো দেখা গেছে সিংহভাগ ব্রিটিশ নাগরিকদের ভাবনায়। জরিপ অনুযায়ী, ৫২ শতাংশ সাধারণ নাগরিক মনে করেন মুসলিমরা অন্য যেকোনো শ্বেতাঙ্গ বা অমুসলিম নাগরিকের মতোই সমানভাবে ব্রিটিশ। ৫৭ শতাংশ নাগরিক বিশ্বাস করেন, যুক্তরাজ্যের শহর ও জনপদে মুসলিম ও অমুসলিমরা অত্যন্ত চমৎকারভাবে একসঙ্গে বসবাস করতে পারে।
একই সঙ্গে, মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য যে বিদ্যমান, তা স্বীকার করেছেন ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা। আর ৬১ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক চান যে সরকার এই মুসলিম বিরোধী কুসংস্কার ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিক। এর বিপরীতে সরকারি পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ।
ব্রিটিশ মুসলিমদের গভীর স্বস্তি ও নিরাপত্তা শঙ্কা
যুক্তরাজ্যের মুসলিমদের মাঝে দেশাত্মবোধ এবং অধিকারের চেতনা অত্যন্ত সুদৃঢ়। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৩ শতাংশ মুসলিম মনে করেন, মুসলিম হিসেবে বসবাসের জন্য যুক্তরাজ্য একটি চমৎকার দেশ। এবং ৬৯ শতাংশ মুসলিম নিজেদের যুক্তরাজ্যের পূর্ণাঙ্গ ও সমান নাগরিক বলে মনে করেন।
তবে উগ্র ডানপন্থী ও বর্ণবাদীদের তৎপরতায় মুসলিমদের নিরাপত্তা শঙ্কা বাড়ছে। গত এক বছরে নিজের ধর্মের কারণে বৈষম্য বা বিদ্বেষের শিকার হয়েছেন এমন মুসলিমের হার ৫৬ শতাংশ। বিশেষ করে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে উগ্রপন্থীদের "ইউনাইট দ্য কিংডম" (Unite the Kingdom) নামক সমাবেশের পর থেকে ৬১ শতাংশ মুসলিম নিজেদের চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে এই নিরাপত্তাহীনতার হার আরও ভয়াবহ—প্রায় ৬৯ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও করণীয়
ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্টের পরিচালক আকিলা আহমেদ বলেন, "যুক্তরাজ্যের মুসলিমরা দেশের প্রতি গভীর অনুগত এবং ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু অনলাইন ও অফলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য ও ইসলামোফোবিক অপপ্রচার তাদের এই স্বস্তি ও অধিকারের জায়গায় আঘাত করছে।"
ব্রিটিশ ফিউচারের পরিচালক সুন্দরের কাটওয়ালা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, "মুসলিমদের বিরুদ্ধে এই বৈষম্য ও উগ্র বিদ্বেষকে সমাজে কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে দেওয়া যায় না। এখনই উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।"

আপনার মতামত লিখুন