ভারতের মধ্যপ্রদেশে ২০২২ সালের একটি নৃশংস গণপিটুনি (মব লিঞ্চিং) মামলায় ১৪ জন তথাকথিত 'গো-রক্ষক'কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ায় চরম সাইবার হামলা ও সাম্প্রদায়িক হেনস্তার শিকার হয়েছেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তাবাসসুম খান। সাজাপ্রাপ্তরা সবাই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্য হওয়ায় এবং রায়দানকারী বিচারক মুসলিম নারী হওয়ায় পুরো ঘটনাটিকে হিন্দুত্ববাদী উগ্রপন্থীরা চরম সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচারকের ধর্ম তুলে ধরে কুৎসিত গালাগাল ও দেশজুড়ে 'রক্তগঙ্গা' বইয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
ভারতে মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের নির্যাতন এবং বিচারব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখানোর আরও একটি নগ্ন রূপ প্রকাশ পেল মধ্যপ্রদেশে। ২০২২ সালে নাজির আহমেদ নামে এক মুসলিম ট্রাক চালককে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার দায়ে ১৪ জন গো-রক্ষককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তাবাসসুম খান। আর এই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কট্টর হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো ওই মুসলিম নারী বিচারকের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তীব্র বিদ্বেষমূলক ও উগ্র প্রচারণা শুরু করেছে।
মামলা ও আদালতের রায়
ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২২ সালের ২ আগস্ট রাতে। মধ্যপ্রদেশ থেকে মহারাষ্ট্রে গবাদি পশু পরিবহন করার সময় বারখার গ্রামে নাজির আহমেদ নামে এক ব্যক্তির ওপর চড়াও হয় উগ্র গো-রক্ষকরা। তারা নাজিরকে চরম বর্বরতায় পিটিয়ে হত্যা করে। দীর্ঘ প্রায় চার বছর মামলা চলার পর গত ১২ জুন বিচারক তাবাসসুম খান এই রায় ঘোষণা করেন। রায় দিতে গিয়ে বিজ্ঞ আদালত এই হত্যাকাণ্ডকে "অত্যন্ত নৃশংস" বলে অভিহিত করেন এবং স্পষ্ট জানান, আসামিরা একটি বেআইনি দল গঠন করে সাধারণ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য ভুক্তভোগীর ওপর পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালিয়েছিল। আদালত আসামিদের অপরাধের অকাট্য প্রমাণ পেয়ে ১৪ জনকেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন।
উগ্রপন্থীদের তাণ্ডব ও বিচারককে হুমকি
আদালতের এই ন্যায়সঙ্গত রায়ের পর থেকেই ভারতের কট্টর ডানপন্থী উপাদান এবং তথাকথিত 'গৌ রক্ষা পরিষদ'-এর মতো উগ্র সংগঠনগুলো বিচারক তাবাসসুম খানের বিরুদ্ধে মাঠে নামে। বিচারক মুসলিম হওয়ায় এই আইনি রায়কে তারা "হিন্দু-বিরোধী" তকমা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
উগ্রপন্থীরা রাস্তায় নেমে বিচারক খানের কুশপুত্তলিকা দাহ করে এবং "তাবাসসুম বেগম নিপাত যাক" বলে স্লোগান দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভাইরাল ভিডিওতে এক হিন্দুত্ববাদী যুবককে বিচারক তাবাসসুম খানকে অত্যন্ত আপত্তিকর ও কুৎসিত ভাষায় ("মুল্লি" ও তার সাথে অশ্রাব্য গালিগালাজ) সম্বোধন করতে দেখা যায়। শুধু তাই নয়, ওই উগ্রপন্থী হুমকি দেয় যে, আগামী ১০ দিনের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত ১৪ "ভাইকে" মুক্তি না দিলে পুরো মধ্যপ্রদেশসহ ভারতজুড়ে "রক্তগঙ্গা" বইয়ে দেওয়া হবে। ভিডিওতে সে আরও বলে, "হিন্দুরা শোনো, যারা গরু কাটে তারা বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আজ এক মুল্লি জাজ হয়ে আমাদের ১৪ ভাইয়ের রুটি-রুজি কেড়ে নিল।"
সরকারি নীরবতা ও উগ্রবাদীদের পক্ষে মিডিয়া ট্রায়াল
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই চরম উগ্রবাদী ও দাঙ্গাবাজ যুবকের বিরুদ্ধে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সাইবার ক্রাইম কোঅর্ডিনেশন সেন্টার কঠোর কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি। উল্টো তাকে কেবল একটি নোটিশ পাঠিয়ে ভিডিওটি ডিলিট করতে বলা হয়েছে, যা মোদি সরকারের আমলে সংখ্যালঘু-বিদ্বেষী উগ্রপন্থীদের প্রতি প্রশাসনের পরোক্ষ প্রশ্রয়কে আবারও প্রমাণ করে।
পাশাপাশি, কট্টর হিন্দুত্ববাদী ও পক্ষপাতদুষ্ট গণমাধ্যম 'সুদর্শন নিউজ'-এর সম্পাদক সুরেশ চভাহানকে প্রকাশ্যে এই বিদ্বেষী প্রচারণাকে সমর্থন করেছেন। তিনি আদালতের এই রায়কে অন-এয়ার "জুডিশিয়াল লিঞ্চিং" (বিচারিক হত্যা) বলে আখ্যা দেন এবং বলেন, "আমরা সব গো-রক্ষক ও তাদের পরিবারের পাশে আছি। এই লড়াই শুধু আপনাদের নয়, আমাদেরও।"
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও বর্তমান পরিস্থিতি
এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা পবন খেরা। তিনি বলেন, "ওই হিন্দু পুরুষদের তাদের ধর্মের কারণে সাজা দেওয়া হয়নি; তদন্তে দাঙ্গা, হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অপরাধে তারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছে বলেই সাজা পেয়েছে। অথচ ভিডিওর ওই হিন্দু ভাইটির তাদের অপরাধ নিয়ে কোনো ক্ষোভ নেই, তার একমাত্র ক্ষোভ হলো রায়দানকারী বিচারক একজন মুসলিম নারী।" খেরা আরও যোগ করেন, একটি সভ্য সমাজে এমন ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতো, কিন্তু মোদির ভারতে ঘৃণা ছড়ানো ব্যক্তিরা অবাধে ঘুরে বেড়ায় আর প্রশ্নকারীদের নোটিশ পাঠানো হয়।
অবশেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার পর সেওনি মালওয়া পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে (suo motu) একটি এফআইআর (FIR) দায়ের করেছে এবং দেশজুড়ে গণহত্যা বা রক্তগঙ্গার ডাক দেওয়া ওই ভিডিও তৈরিকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। তবে ভারতের বিচার বিভাগের একজন সম্মানিত নারী সদস্যের ওপর এমন নগ্ন ও সাম্প্রদায়িক হামলা দেশের বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং মুসলিমদের নিরাপত্তার ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করেছে।
বিষয় : ভারত

বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬
ভারতের মধ্যপ্রদেশে ২০২২ সালের একটি নৃশংস গণপিটুনি (মব লিঞ্চিং) মামলায় ১৪ জন তথাকথিত 'গো-রক্ষক'কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ায় চরম সাইবার হামলা ও সাম্প্রদায়িক হেনস্তার শিকার হয়েছেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তাবাসসুম খান। সাজাপ্রাপ্তরা সবাই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্য হওয়ায় এবং রায়দানকারী বিচারক মুসলিম নারী হওয়ায় পুরো ঘটনাটিকে হিন্দুত্ববাদী উগ্রপন্থীরা চরম সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচারকের ধর্ম তুলে ধরে কুৎসিত গালাগাল ও দেশজুড়ে 'রক্তগঙ্গা' বইয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
ভারতে মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের নির্যাতন এবং বিচারব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখানোর আরও একটি নগ্ন রূপ প্রকাশ পেল মধ্যপ্রদেশে। ২০২২ সালে নাজির আহমেদ নামে এক মুসলিম ট্রাক চালককে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার দায়ে ১৪ জন গো-রক্ষককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তাবাসসুম খান। আর এই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কট্টর হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো ওই মুসলিম নারী বিচারকের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তীব্র বিদ্বেষমূলক ও উগ্র প্রচারণা শুরু করেছে।
মামলা ও আদালতের রায়
ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২২ সালের ২ আগস্ট রাতে। মধ্যপ্রদেশ থেকে মহারাষ্ট্রে গবাদি পশু পরিবহন করার সময় বারখার গ্রামে নাজির আহমেদ নামে এক ব্যক্তির ওপর চড়াও হয় উগ্র গো-রক্ষকরা। তারা নাজিরকে চরম বর্বরতায় পিটিয়ে হত্যা করে। দীর্ঘ প্রায় চার বছর মামলা চলার পর গত ১২ জুন বিচারক তাবাসসুম খান এই রায় ঘোষণা করেন। রায় দিতে গিয়ে বিজ্ঞ আদালত এই হত্যাকাণ্ডকে "অত্যন্ত নৃশংস" বলে অভিহিত করেন এবং স্পষ্ট জানান, আসামিরা একটি বেআইনি দল গঠন করে সাধারণ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য ভুক্তভোগীর ওপর পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালিয়েছিল। আদালত আসামিদের অপরাধের অকাট্য প্রমাণ পেয়ে ১৪ জনকেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন।
উগ্রপন্থীদের তাণ্ডব ও বিচারককে হুমকি
আদালতের এই ন্যায়সঙ্গত রায়ের পর থেকেই ভারতের কট্টর ডানপন্থী উপাদান এবং তথাকথিত 'গৌ রক্ষা পরিষদ'-এর মতো উগ্র সংগঠনগুলো বিচারক তাবাসসুম খানের বিরুদ্ধে মাঠে নামে। বিচারক মুসলিম হওয়ায় এই আইনি রায়কে তারা "হিন্দু-বিরোধী" তকমা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
উগ্রপন্থীরা রাস্তায় নেমে বিচারক খানের কুশপুত্তলিকা দাহ করে এবং "তাবাসসুম বেগম নিপাত যাক" বলে স্লোগান দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভাইরাল ভিডিওতে এক হিন্দুত্ববাদী যুবককে বিচারক তাবাসসুম খানকে অত্যন্ত আপত্তিকর ও কুৎসিত ভাষায় ("মুল্লি" ও তার সাথে অশ্রাব্য গালিগালাজ) সম্বোধন করতে দেখা যায়। শুধু তাই নয়, ওই উগ্রপন্থী হুমকি দেয় যে, আগামী ১০ দিনের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত ১৪ "ভাইকে" মুক্তি না দিলে পুরো মধ্যপ্রদেশসহ ভারতজুড়ে "রক্তগঙ্গা" বইয়ে দেওয়া হবে। ভিডিওতে সে আরও বলে, "হিন্দুরা শোনো, যারা গরু কাটে তারা বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আজ এক মুল্লি জাজ হয়ে আমাদের ১৪ ভাইয়ের রুটি-রুজি কেড়ে নিল।"
সরকারি নীরবতা ও উগ্রবাদীদের পক্ষে মিডিয়া ট্রায়াল
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই চরম উগ্রবাদী ও দাঙ্গাবাজ যুবকের বিরুদ্ধে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সাইবার ক্রাইম কোঅর্ডিনেশন সেন্টার কঠোর কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি। উল্টো তাকে কেবল একটি নোটিশ পাঠিয়ে ভিডিওটি ডিলিট করতে বলা হয়েছে, যা মোদি সরকারের আমলে সংখ্যালঘু-বিদ্বেষী উগ্রপন্থীদের প্রতি প্রশাসনের পরোক্ষ প্রশ্রয়কে আবারও প্রমাণ করে।
পাশাপাশি, কট্টর হিন্দুত্ববাদী ও পক্ষপাতদুষ্ট গণমাধ্যম 'সুদর্শন নিউজ'-এর সম্পাদক সুরেশ চভাহানকে প্রকাশ্যে এই বিদ্বেষী প্রচারণাকে সমর্থন করেছেন। তিনি আদালতের এই রায়কে অন-এয়ার "জুডিশিয়াল লিঞ্চিং" (বিচারিক হত্যা) বলে আখ্যা দেন এবং বলেন, "আমরা সব গো-রক্ষক ও তাদের পরিবারের পাশে আছি। এই লড়াই শুধু আপনাদের নয়, আমাদেরও।"
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও বর্তমান পরিস্থিতি
এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা পবন খেরা। তিনি বলেন, "ওই হিন্দু পুরুষদের তাদের ধর্মের কারণে সাজা দেওয়া হয়নি; তদন্তে দাঙ্গা, হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অপরাধে তারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছে বলেই সাজা পেয়েছে। অথচ ভিডিওর ওই হিন্দু ভাইটির তাদের অপরাধ নিয়ে কোনো ক্ষোভ নেই, তার একমাত্র ক্ষোভ হলো রায়দানকারী বিচারক একজন মুসলিম নারী।" খেরা আরও যোগ করেন, একটি সভ্য সমাজে এমন ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতো, কিন্তু মোদির ভারতে ঘৃণা ছড়ানো ব্যক্তিরা অবাধে ঘুরে বেড়ায় আর প্রশ্নকারীদের নোটিশ পাঠানো হয়।
অবশেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার পর সেওনি মালওয়া পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে (suo motu) একটি এফআইআর (FIR) দায়ের করেছে এবং দেশজুড়ে গণহত্যা বা রক্তগঙ্গার ডাক দেওয়া ওই ভিডিও তৈরিকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। তবে ভারতের বিচার বিভাগের একজন সম্মানিত নারী সদস্যের ওপর এমন নগ্ন ও সাম্প্রদায়িক হামলা দেশের বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং মুসলিমদের নিরাপত্তার ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করেছে।

আপনার মতামত লিখুন