রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬
রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬
কওমী টাইমস

১৯৯০ সালের ২ জুলাই মক্কার মুয়াইসিম টানেলে পদদলিত হয়ে ১,৪২৬ জন হাজির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়, যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হজ বিপর্যয়

মক্কা টানেল ট্র্যাজেডি: ১৯৯০ সালে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ হজ বিপর্যয়ের ৩৬ বছর



মক্কা টানেল ট্র্যাজেডি: ১৯৯০ সালে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ হজ বিপর্যয়ের ৩৬ বছর

আজ থেকে ঠিক ৩৬ বছর আগে, ১৯৯০ সালের ২ জুলাই (সোমবার) পবিত্র মক্কার মিনা ও আরাফাতকে সংযোগকারী মুয়াইসিম টানেলে হজের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও নির্মম মানবীয় বিপর্যয় ঘটে। শয়তানকে পাথর মারার আচার (রমি আল-জামারাত) পালনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া প্রায় ৫,০০০ হাজি মাত্র ১,০০০ ধারণক্ষমতার একটি সংকীর্ণ টানেলে আটকা পড়েন। তীব্র গরম, কৃত্রিম অক্সিজেন সংকট এবং হঠাৎ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে সৃষ্ট চরম আতঙ্কে একে অপরের নিচে পিষ্ট হয়ে ১৪২৬ জন আল্লাহর মেহমান শাহাদাত বরণ করেন, যার মধ্যে ৪৪৭ জনই ছিলেন তুর্কি নাগরিক।

আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ও হৃদয়বিদারক হজ বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত ‘মক্কা টানেল ট্র্যাজেডি’র ৩৬ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৯০ সালের ২ জুলাই সংঘটিত এই নির্মম ঘটনাটি আজও বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত হিসেবে বিরাজ করছে। তৎকালীন সময়ে পবিত্র স্থানগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে সৌদি সরকারের ১৫ বিলিয়ন ডলারের মেগা প্রকল্পের অংশ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল ৫৫০ মিটার দীর্ঘ এবং ১০ মিটার প্রশস্ত মুয়াইসিম টানেল। তবে এই বিশাল প্রকল্পের নিরাপত্তা ত্রুটি এবং অব্যবস্থাপনা শেষ পর্যন্ত এক অভাবনীয় মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে।

যেভাবে শুরু হয়েছিল বিপর্যয় 

ঘটনার দিন সকাল আনুমানিক ১০ টার দিকে হাজিরা যখন মিনার দিকে শয়তানকে পাথর মারার জন্য যাচ্ছিলেন, তখন মুয়াইসিম টানেলের দিকে সংযোগকারী একটি পদচারী সেতুর (Footbridge) রেলিং ভেঙে পড়ে। এর ফলে সেতু থেকে ৭ জন হাজি নিচে টানেল থেকে বের হতে থাকা অন্যান্য হাজিদের ওপর পড়ে যান। এই আকস্মিক ঘটনায় টানেলের প্রবেশ ও বহির্গমন পথে চরম বিশৃঙ্খলা ও স্থবিরতা তৈরি হয়।

ধারণক্ষমতার চেয়ে পাঁচ গুণ মানুষ ও অন্ধকার পরিবেশ

মাত্র ১,০০০ মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ওই সংকীর্ণ সুড়ঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে প্রায় ৫,০০০ হাজি প্রবেশ করেন। ভেতরে প্রচণ্ড ভিড় ও আটকা পড়ার কারণে হাজিদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাইরের তাপমাত্রা তখন ছিল ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১১৩ ফারেনহাইট)। টানেলের ভেতরের ত্রুটিপূর্ণ ও অপর্যাপ্ত বায়ুচলাচল (Ventilation) ব্যবস্থা পরিস্থিতিকে আরও শ্বাসরুদ্ধকর করে তোলে। এর মধ্যেই আকস্মিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে পুরো টানেলটি ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। অন্ধকারে বাঁচার আকুতিতে মানুষ দিকবিদিক ছুটতে গিয়ে একে অপরকে মাড়িয়ে যেতে শুরু করে। তীব্র চাপে বহু হাজির পাঁজরের হাড় ভেঙে যায় এবং অক্সিজেনের অভাবে দম বন্ধ হয়ে শত শত হাজি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

নিহতদের পরিচয় ও ক্ষয়ক্ষতি

সৌদি কর্তৃপক্ষের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই ভয়াবহ পদদলিত ও শ্বাসরোধের ঘটনায় মোট ১,৪২৬ জন হাজি মারা যান। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান এবং স্থানীয় মক্কার বহু হাজি এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।

এই ট্র্যাজেডির পর বিশ্বজুড়ে শোক ও ক্ষোভের জোয়ার বয়ে যায়। তবে তৎকালীন সৌদি শাসক রাজা ফাহাদ এটিকে "আল্লাহর অপরিবর্তনীয় ইচ্ছা (তাকদির)" বলে অভিহিত করেছিলেন এবং মন্তব্য করেছিলেন, "তারা যদি এখানে মারা না যেতেন, তবে অন্য কোথাও একই সময়ে মারা যেতেন।" যদিও এই বক্তব্যটি বিশ্ব মুসলিম মহলে তীব্র সমালোচিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এবং ভবিষ্যতে এই ধরণের দুর্ঘটনা এড়াতে সৌদি কর্তৃপক্ষ মিনার যাতায়াত ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে, ওয়াকিং র‍্যাম্প তৈরি করে এবং টানেলগুলোর ধারণক্ষমতা ও বায়ুচলাচল ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করতে বাধ্য হয়।

বিষয় : সৌদি আরব মক্কা

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬


মক্কা টানেল ট্র্যাজেডি: ১৯৯০ সালে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ হজ বিপর্যয়ের ৩৬ বছর

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬

featured Image

আজ থেকে ঠিক ৩৬ বছর আগে, ১৯৯০ সালের ২ জুলাই (সোমবার) পবিত্র মক্কার মিনা ও আরাফাতকে সংযোগকারী মুয়াইসিম টানেলে হজের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও নির্মম মানবীয় বিপর্যয় ঘটে। শয়তানকে পাথর মারার আচার (রমি আল-জামারাত) পালনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া প্রায় ৫,০০০ হাজি মাত্র ১,০০০ ধারণক্ষমতার একটি সংকীর্ণ টানেলে আটকা পড়েন। তীব্র গরম, কৃত্রিম অক্সিজেন সংকট এবং হঠাৎ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে সৃষ্ট চরম আতঙ্কে একে অপরের নিচে পিষ্ট হয়ে ১৪২৬ জন আল্লাহর মেহমান শাহাদাত বরণ করেন, যার মধ্যে ৪৪৭ জনই ছিলেন তুর্কি নাগরিক।

আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ও হৃদয়বিদারক হজ বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত ‘মক্কা টানেল ট্র্যাজেডি’র ৩৬ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৯০ সালের ২ জুলাই সংঘটিত এই নির্মম ঘটনাটি আজও বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত হিসেবে বিরাজ করছে। তৎকালীন সময়ে পবিত্র স্থানগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে সৌদি সরকারের ১৫ বিলিয়ন ডলারের মেগা প্রকল্পের অংশ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল ৫৫০ মিটার দীর্ঘ এবং ১০ মিটার প্রশস্ত মুয়াইসিম টানেল। তবে এই বিশাল প্রকল্পের নিরাপত্তা ত্রুটি এবং অব্যবস্থাপনা শেষ পর্যন্ত এক অভাবনীয় মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে।

যেভাবে শুরু হয়েছিল বিপর্যয় 

ঘটনার দিন সকাল আনুমানিক ১০ টার দিকে হাজিরা যখন মিনার দিকে শয়তানকে পাথর মারার জন্য যাচ্ছিলেন, তখন মুয়াইসিম টানেলের দিকে সংযোগকারী একটি পদচারী সেতুর (Footbridge) রেলিং ভেঙে পড়ে। এর ফলে সেতু থেকে ৭ জন হাজি নিচে টানেল থেকে বের হতে থাকা অন্যান্য হাজিদের ওপর পড়ে যান। এই আকস্মিক ঘটনায় টানেলের প্রবেশ ও বহির্গমন পথে চরম বিশৃঙ্খলা ও স্থবিরতা তৈরি হয়।

ধারণক্ষমতার চেয়ে পাঁচ গুণ মানুষ ও অন্ধকার পরিবেশ

মাত্র ১,০০০ মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ওই সংকীর্ণ সুড়ঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে প্রায় ৫,০০০ হাজি প্রবেশ করেন। ভেতরে প্রচণ্ড ভিড় ও আটকা পড়ার কারণে হাজিদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাইরের তাপমাত্রা তখন ছিল ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১১৩ ফারেনহাইট)। টানেলের ভেতরের ত্রুটিপূর্ণ ও অপর্যাপ্ত বায়ুচলাচল (Ventilation) ব্যবস্থা পরিস্থিতিকে আরও শ্বাসরুদ্ধকর করে তোলে। এর মধ্যেই আকস্মিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে পুরো টানেলটি ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। অন্ধকারে বাঁচার আকুতিতে মানুষ দিকবিদিক ছুটতে গিয়ে একে অপরকে মাড়িয়ে যেতে শুরু করে। তীব্র চাপে বহু হাজির পাঁজরের হাড় ভেঙে যায় এবং অক্সিজেনের অভাবে দম বন্ধ হয়ে শত শত হাজি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

নিহতদের পরিচয় ও ক্ষয়ক্ষতি

সৌদি কর্তৃপক্ষের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই ভয়াবহ পদদলিত ও শ্বাসরোধের ঘটনায় মোট ১,৪২৬ জন হাজি মারা যান। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান এবং স্থানীয় মক্কার বহু হাজি এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।

এই ট্র্যাজেডির পর বিশ্বজুড়ে শোক ও ক্ষোভের জোয়ার বয়ে যায়। তবে তৎকালীন সৌদি শাসক রাজা ফাহাদ এটিকে "আল্লাহর অপরিবর্তনীয় ইচ্ছা (তাকদির)" বলে অভিহিত করেছিলেন এবং মন্তব্য করেছিলেন, "তারা যদি এখানে মারা না যেতেন, তবে অন্য কোথাও একই সময়ে মারা যেতেন।" যদিও এই বক্তব্যটি বিশ্ব মুসলিম মহলে তীব্র সমালোচিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এবং ভবিষ্যতে এই ধরণের দুর্ঘটনা এড়াতে সৌদি কর্তৃপক্ষ মিনার যাতায়াত ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে, ওয়াকিং র‍্যাম্প তৈরি করে এবং টানেলগুলোর ধারণক্ষমতা ও বায়ুচলাচল ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করতে বাধ্য হয়।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ