ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় স্কুলগুলোতে ব্যবহৃত পাঠ্যপুস্তকগুলোতে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও পদ্ধতিগতভাবে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বকে আড়াল করা হচ্ছে। যেখানেই তাদের প্রসঙ্গ আসে, সেখানে ফিলিস্তিনিদের কোনো মানুষ বা স্বাধীন জাতি হিসেবে নয়, বরং একটি ‘সমাধানযোগ্য সমস্যা’ এবং ‘অভ্যন্তরীণ হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ও শিক্ষা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং ২০০১ সালের ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মর্যাদাপূর্ণ ‘শাখারভ পুরস্কার’ বিজয়ী মানবাধিকার কর্মী প্রফেসর ড. নূরিত পেলেড-এলহানান আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি শিক্ষা ব্যবস্থার এই চরম বর্ণবাদী ও জায়নবাদী আগ্রাসী রূপের তথ্য উন্মোচন করেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের পাঠ্যপুস্তক নিয়ে গবেষণা করা ড. নূরিত পেলেড-এলহানান জানান, ইসরায়েলি স্কুলগুলোর শিক্ষা উপকরণগুলো কেবল সাধারণ কোনো পড়াশোনার বিষয় নয়, বরং এগুলো শিক্ষার্থীদের মনে জাতীয়তাবাদী উগ্র অহংকার তৈরি করার এবং ‘অন্যদের’ প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শিক হাতিয়ার। ‘প্যালেস্টাইন ইন ইসরায়েলি স্কুল বুকস: ইডিওলজি অ্যান্ড প্রোপাগান্ডা ইন এডুকেশন’ (ইসরায়েলি পাঠ্যপুস্তকে ফিলিস্তিন: শিক্ষায় আদর্শ ও প্রোপাগান্ডা) গ্রন্থের এই লেখিকা জানান, তিনি মূলত ইসরায়েলের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় স্কুলগুলোতে পড়ানো মূল ধারার পাঠ্যপুস্তকগুলোর ওপরই তাঁর এই গবেষণাটি চালিয়েছেন।
ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব অস্বীকার ও কেবল ‘হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপন
গবেষণার সবচেয়ে ভয়াবহ ও উল্লেখযোগ্য দিকটি তুলে ধরে ড. পেলেড-এলহানান বলেন, “ইসরায়েলি পাঠ্যপুস্তকগুলোতে ফিলিস্তিনিদের প্রায় সম্পূর্ণ অদৃশ্য করে রাখা হয়েছে। ইসরায়েলিদের মনস্তত্ত্বে, সামাজিক আলোচনায় কিংবা সংস্কৃতিতে ফিলিস্তিনিদের কোনো অস্তিত্ব বা প্রতিনিধিত্ব নেই। যদি কখনো তাদের কথা উল্লেখ করাও হয়, তবে তা কেবলই একটি ‘সমস্যা’, ‘ভেতরের শত্রু’ অথবা ‘সমাধানযোগ্য একটি আপদ’ হিসেবে দেখানো হয়।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই পাঠ্যপুস্তকগুলো ফিলিস্তিনি সমাজের ব্যক্তিমানুষের পরিচয়কে পুরোপুরি মুছে দিয়েছে। ইসরায়েলি শিক্ষার্থীরা কোনোদিন ফিলিস্তিনি লেখক, বিজ্ঞানী, শিল্পী, সংগীতজ্ঞ বা শিক্ষাবিদদের সম্পর্কে জানতে পারে না। তাদের একটি সমজাতীয় বা একরোখা গোষ্ঠী হিসেবে দেখানো হয়। তিনি বলেন, “সেখানে কোনো ব্যক্তিমানুষ নেই। ফিলিস্তিনিদের কোনো সাংস্কৃতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয় সেখানে দেওয়া হয় না, যেন তাদের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।”
প্রফেসর পেলেড-এলহানান ব্যাখ্যা করেন, এটি কেবল তথ্যের অভাব বা অজ্ঞতা তৈরি করছে না, বরং ফিলিস্তিনিদের ‘মানুষ’ হিসেবে দেখার অনুভূতিটাই ইসরায়েলি শিশুদের মন থেকে কেড়ে নিচ্ছে এবং তাদের কেবল একটি বিমূর্ত ‘নিরাপত্তা সমস্যা’ হিসেবে রূপান্তর করছে। এই অমানবিক শিক্ষাই বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো ইসরায়েলি সৈন্যদের নৃশংস সহিংসতাকে তাদের সমাজে বৈধতা দিয়ে আসছে। পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি গ্রামে হামলা চালানো এক ইসরায়েলি সেনার বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, “পশ্চিম তীরের এক সেনা আমাকে বলেছিল— ‘আপনারাই তো আমাদের শিখিয়েছেন যে ফিলিস্তিনিরা হলো সমাধানযোগ্য সমস্যা। আমরা এখন সেই সমস্যারই সমাধান করছি।’ এটাই হলো তাদের শিক্ষা। সবকিছুই শিক্ষার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। শুধু পাঠ্যপুস্তকই নয়, পরিবার, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং কিন্ডারগার্টেন থেকে শিশুদের যে গানগুলো শেখানো হয়, তার সবই এই ঘৃণার রাজনীতির অংশ।”
মানচিত্রে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’—মুছে ফেলা হয়েছে ফিলিস্তিন
ড. পেলেড-এলহানান আরও জানান, পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহৃত মানচিত্রগুলোতেও একই চরমপন্থী জায়নবাদী ও বর্ণবাদী আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে। এই মানচিত্রগুলো শুধু স্কুলেই নয়, হাসপাতাল এবং ব্যাংকের মতো পাবলিক প্লেস বা জনসমক্ষেও ব্যবহার করা হয়। তিনি বলেন, “আপনি যদি ইসরায়েলের কোনো স্বাস্থ্য কেন্দ্র বা ব্যাংকে যান, তবে একই মানচিত্র দেখতে পাবেন। এটিই সেই মানচিত্র যাকে তারা ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ (Greater Israel) বলে ডাকে।”
এই মানচিত্রগুলোতে পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং এর বিপরীতে ফিলিস্তিনি বা আরব শহর ও গ্রামগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে মানচিত্র থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছে। এই পরিস্থিতি শিশুদের বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার ক্ষমতাকে সরাসরি বিকৃত করছে। ড. পেলেড-এলহানান বলেন:
“ইসরায়েলি সীমানার ভেতরেও কোনো আরব শহর বা গ্রামের নাম মানচিত্রে রাখা হয়নি। অথচ পশ্চিম তীরে আন্তর্জাতিকভাবে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইহুদি বসতিগুলোর প্রতিটি মানচিত্রে স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে। এর ফলে ইসরায়েলি শিশুরা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে ফিলিস্তিনিরাই আসলে বহিরাগত দখলদার! তারা ভাবে, ‘এই ভূমি আমাদের আর ফিলিস্তিনিরা এটি দখল করে রেখেছে।’ ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে কিছু ‘নতুন ঐতিহাসিক’ পাঠ্যপুস্তকে দেইর ইয়াসিন ও কাফর কাসিমের মতো ভয়াবহ ফিলিস্তিনি গণহত্যাগুলোকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্থান দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ইসরায়েলের মূল বয়ান তাতে মোটেও বদলায়নি। এমনকি পাঠ্যপুস্তকে ফিলিস্তিনিদের ‘ফিলিস্তিনি’ নামেও ডাকা হয় না, এর পরিবর্তে অনবরত ‘ইসরায়েলি আরব’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে ঘটে যাওয়া গণহত্যাগুলোর কথা কোথাও কোথাও উল্লেখ থাকলেও, অধ্যায়ের শেষে সবসময় ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ বা হত্যার ফলাফলকে ইসরায়েলিদের জন্য ‘ইতিবাচক ও ভালো’ হিসেবে দেখানো হতো। উদাহরণস্বরূপ, দেইর ইয়াসিন গণহত্যার বিবরণে লেখা রয়েছে— এই গণহত্যার ফলে আরবরা তাদের নিজেদের জমি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল, যা ইসরায়েলের জন্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি ছিল!”
ভয় ও ট্রমার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা শিক্ষা ব্যবস্থা
হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাবেক প্রফেসরের মতে, ইসরায়েলের জাতীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি এখন আর শুধু জায়নবাদ নয়, বরং তা হলো ‘হলোকাস্ট’ (Holocaust)-এর ভয়। হলোকাস্টের ইতিহাস শিক্ষা দেওয়ার পেছনে ঐতিহাসিক সত্য জানার চেয়ে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য বেশি কাজ করে। তিনি বলেন, “শিশুদের প্রতি বছর মানসিকভাবে ট্রমাটাইজড (আঘাতপ্রাপ্ত) করার জন্য এটি শেখানো হয়। তাদের বোঝানো হয় যে পুরো পৃথিবীই ইহুদি-বিদ্বেষী (antisemitic) এবং তাদের জন্য একমাত্র নিরাপদ স্থান হলো ইসরায়েল।”
শিক্ষকদের নির্দেশিকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর কোমলমতি শিশুদেরও শেখানো হয় যে, অতীতে ইহুদিদের কোনো রাষ্ট্র এবং নিজস্ব সেনাবাহিনী ছিল না বলেই তাদের হলোকাস্টের শিকার হতে হয়েছিল। এই শিক্ষা শিশুদের মধ্যে অনবরত একটি অদৃশ্য হুমকির ভয় তৈরি করে রাখে। এর স্বাভাবিক পরিণতি হলো ‘আমরা’ এবং ‘ওরা’ (বিজাতীয়)—এই চরম বিভাজন। ড. পেলেড-এলহানান বলেন, “এর মূল উদ্দেশ্য হলো এমন একদল মানুষ তৈরি করা, যারা নিজেদের গোষ্ঠী ছাড়া অন্য সবাইকে ভয় পাবে এবং ঘৃণা করবে। ইসরায়েলের ক্ষমতায় থাকা প্রধান গোষ্ঠীটি হলো পূর্ব ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত আশকেনাজি ইহুদি। এরা ছাড়া বাকি সবাইকে—তা সে অন্য কোনো জাতির মানুষ হোক বা আরব ইহুদি—সবাইকে হয় অবজ্ঞা করা হয়, উপহাস করা হয় অথবা পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়।” আরব ইহুদি (মিজরাহি) এবং ইথিওপীয় ইহুদিদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকেও একইভাবে ইসরায়েলি পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
গাজায় চলমান গণহত্যাকে ‘বিজয়’ হিসেবে দেখানোর আগাম প্রস্তুতি
বর্তমানে গাজায় বিশ্ববাসীর চোখের সামনে লাইভ সম্প্রচার হওয়া ভয়াবহ গণহত্যা ও জাতিগত নিধনযজ্ঞের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ড. পেলেড-এলহানান অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, “আজ গাজায় একটি লাইভ গণহত্যা ঘটছে। কিন্তু ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এটিকে এখনই তাদের পাঠ্যক্রমে একটি ‘মহান বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য ছক কষে ফেলেছে। তারা এটিকে অতীতে ঘটে যাওয়া হলোকাস্টের সাথে যুক্ত করে সমাজে এই বয়ান তৈরি করছে যে— ‘আমরা আবারো হুমকির মুখে পড়েছিলাম, আমাদের আবারো নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, আর আমাদের বীর সেনাবাহিনী আপনাদের সবাইকে রক্ষা করেছে।’”
পশ্চিমা বিশ্বের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ইউরোপের রাজনৈতিক ও একাডেমিক মহল ইসরায়েলের এই চরম বর্ণবাদী ও উগ্রপন্থী শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছে। অথচ ফিলিস্তিনিদের পাঠ্যপুস্তককে টার্গেট করে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক মহলে যে অপপ্রচার চালায়, তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত ছিল প্রকৃত একাডেমিক গবেষণাগুলোকে আমলে নেওয়া। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, ফিলিস্তিনি পাঠ্যপুস্তকগুলো সরাসরি ইসরায়েল এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে তীব্র সেন্সরশিপের শিকার হচ্ছে। এমনকি ইসরায়েলের শিক্ষা মন্ত্রণালয় পূর্ব জেরুজালেমে পড়ানো ফিলিস্তিনি স্কুলগুলোর পাঠ্যক্রমেও সরাসরি হস্তক্ষেপ ও তা বিকৃত করছে।
বিষয় : মানবাধিকার ফিলিস্তিন

শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুলাই ২০২৬
ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় স্কুলগুলোতে ব্যবহৃত পাঠ্যপুস্তকগুলোতে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও পদ্ধতিগতভাবে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বকে আড়াল করা হচ্ছে। যেখানেই তাদের প্রসঙ্গ আসে, সেখানে ফিলিস্তিনিদের কোনো মানুষ বা স্বাধীন জাতি হিসেবে নয়, বরং একটি ‘সমাধানযোগ্য সমস্যা’ এবং ‘অভ্যন্তরীণ হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ও শিক্ষা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং ২০০১ সালের ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মর্যাদাপূর্ণ ‘শাখারভ পুরস্কার’ বিজয়ী মানবাধিকার কর্মী প্রফেসর ড. নূরিত পেলেড-এলহানান আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি শিক্ষা ব্যবস্থার এই চরম বর্ণবাদী ও জায়নবাদী আগ্রাসী রূপের তথ্য উন্মোচন করেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের পাঠ্যপুস্তক নিয়ে গবেষণা করা ড. নূরিত পেলেড-এলহানান জানান, ইসরায়েলি স্কুলগুলোর শিক্ষা উপকরণগুলো কেবল সাধারণ কোনো পড়াশোনার বিষয় নয়, বরং এগুলো শিক্ষার্থীদের মনে জাতীয়তাবাদী উগ্র অহংকার তৈরি করার এবং ‘অন্যদের’ প্রতি ঘৃণা ছড়ানোর একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শিক হাতিয়ার। ‘প্যালেস্টাইন ইন ইসরায়েলি স্কুল বুকস: ইডিওলজি অ্যান্ড প্রোপাগান্ডা ইন এডুকেশন’ (ইসরায়েলি পাঠ্যপুস্তকে ফিলিস্তিন: শিক্ষায় আদর্শ ও প্রোপাগান্ডা) গ্রন্থের এই লেখিকা জানান, তিনি মূলত ইসরায়েলের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় স্কুলগুলোতে পড়ানো মূল ধারার পাঠ্যপুস্তকগুলোর ওপরই তাঁর এই গবেষণাটি চালিয়েছেন।
ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব অস্বীকার ও কেবল ‘হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপন
গবেষণার সবচেয়ে ভয়াবহ ও উল্লেখযোগ্য দিকটি তুলে ধরে ড. পেলেড-এলহানান বলেন, “ইসরায়েলি পাঠ্যপুস্তকগুলোতে ফিলিস্তিনিদের প্রায় সম্পূর্ণ অদৃশ্য করে রাখা হয়েছে। ইসরায়েলিদের মনস্তত্ত্বে, সামাজিক আলোচনায় কিংবা সংস্কৃতিতে ফিলিস্তিনিদের কোনো অস্তিত্ব বা প্রতিনিধিত্ব নেই। যদি কখনো তাদের কথা উল্লেখ করাও হয়, তবে তা কেবলই একটি ‘সমস্যা’, ‘ভেতরের শত্রু’ অথবা ‘সমাধানযোগ্য একটি আপদ’ হিসেবে দেখানো হয়।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই পাঠ্যপুস্তকগুলো ফিলিস্তিনি সমাজের ব্যক্তিমানুষের পরিচয়কে পুরোপুরি মুছে দিয়েছে। ইসরায়েলি শিক্ষার্থীরা কোনোদিন ফিলিস্তিনি লেখক, বিজ্ঞানী, শিল্পী, সংগীতজ্ঞ বা শিক্ষাবিদদের সম্পর্কে জানতে পারে না। তাদের একটি সমজাতীয় বা একরোখা গোষ্ঠী হিসেবে দেখানো হয়। তিনি বলেন, “সেখানে কোনো ব্যক্তিমানুষ নেই। ফিলিস্তিনিদের কোনো সাংস্কৃতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয় সেখানে দেওয়া হয় না, যেন তাদের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।”
প্রফেসর পেলেড-এলহানান ব্যাখ্যা করেন, এটি কেবল তথ্যের অভাব বা অজ্ঞতা তৈরি করছে না, বরং ফিলিস্তিনিদের ‘মানুষ’ হিসেবে দেখার অনুভূতিটাই ইসরায়েলি শিশুদের মন থেকে কেড়ে নিচ্ছে এবং তাদের কেবল একটি বিমূর্ত ‘নিরাপত্তা সমস্যা’ হিসেবে রূপান্তর করছে। এই অমানবিক শিক্ষাই বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো ইসরায়েলি সৈন্যদের নৃশংস সহিংসতাকে তাদের সমাজে বৈধতা দিয়ে আসছে। পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি গ্রামে হামলা চালানো এক ইসরায়েলি সেনার বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, “পশ্চিম তীরের এক সেনা আমাকে বলেছিল— ‘আপনারাই তো আমাদের শিখিয়েছেন যে ফিলিস্তিনিরা হলো সমাধানযোগ্য সমস্যা। আমরা এখন সেই সমস্যারই সমাধান করছি।’ এটাই হলো তাদের শিক্ষা। সবকিছুই শিক্ষার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। শুধু পাঠ্যপুস্তকই নয়, পরিবার, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং কিন্ডারগার্টেন থেকে শিশুদের যে গানগুলো শেখানো হয়, তার সবই এই ঘৃণার রাজনীতির অংশ।”
মানচিত্রে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’—মুছে ফেলা হয়েছে ফিলিস্তিন
ড. পেলেড-এলহানান আরও জানান, পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহৃত মানচিত্রগুলোতেও একই চরমপন্থী জায়নবাদী ও বর্ণবাদী আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে। এই মানচিত্রগুলো শুধু স্কুলেই নয়, হাসপাতাল এবং ব্যাংকের মতো পাবলিক প্লেস বা জনসমক্ষেও ব্যবহার করা হয়। তিনি বলেন, “আপনি যদি ইসরায়েলের কোনো স্বাস্থ্য কেন্দ্র বা ব্যাংকে যান, তবে একই মানচিত্র দেখতে পাবেন। এটিই সেই মানচিত্র যাকে তারা ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ (Greater Israel) বলে ডাকে।”
এই মানচিত্রগুলোতে পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং এর বিপরীতে ফিলিস্তিনি বা আরব শহর ও গ্রামগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে মানচিত্র থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছে। এই পরিস্থিতি শিশুদের বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার ক্ষমতাকে সরাসরি বিকৃত করছে। ড. পেলেড-এলহানান বলেন:
“ইসরায়েলি সীমানার ভেতরেও কোনো আরব শহর বা গ্রামের নাম মানচিত্রে রাখা হয়নি। অথচ পশ্চিম তীরে আন্তর্জাতিকভাবে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইহুদি বসতিগুলোর প্রতিটি মানচিত্রে স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে। এর ফলে ইসরায়েলি শিশুরা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে ফিলিস্তিনিরাই আসলে বহিরাগত দখলদার! তারা ভাবে, ‘এই ভূমি আমাদের আর ফিলিস্তিনিরা এটি দখল করে রেখেছে।’ ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে কিছু ‘নতুন ঐতিহাসিক’ পাঠ্যপুস্তকে দেইর ইয়াসিন ও কাফর কাসিমের মতো ভয়াবহ ফিলিস্তিনি গণহত্যাগুলোকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্থান দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ইসরায়েলের মূল বয়ান তাতে মোটেও বদলায়নি। এমনকি পাঠ্যপুস্তকে ফিলিস্তিনিদের ‘ফিলিস্তিনি’ নামেও ডাকা হয় না, এর পরিবর্তে অনবরত ‘ইসরায়েলি আরব’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে ঘটে যাওয়া গণহত্যাগুলোর কথা কোথাও কোথাও উল্লেখ থাকলেও, অধ্যায়ের শেষে সবসময় ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ বা হত্যার ফলাফলকে ইসরায়েলিদের জন্য ‘ইতিবাচক ও ভালো’ হিসেবে দেখানো হতো। উদাহরণস্বরূপ, দেইর ইয়াসিন গণহত্যার বিবরণে লেখা রয়েছে— এই গণহত্যার ফলে আরবরা তাদের নিজেদের জমি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল, যা ইসরায়েলের জন্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি ছিল!”
ভয় ও ট্রমার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা শিক্ষা ব্যবস্থা
হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাবেক প্রফেসরের মতে, ইসরায়েলের জাতীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি এখন আর শুধু জায়নবাদ নয়, বরং তা হলো ‘হলোকাস্ট’ (Holocaust)-এর ভয়। হলোকাস্টের ইতিহাস শিক্ষা দেওয়ার পেছনে ঐতিহাসিক সত্য জানার চেয়ে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য বেশি কাজ করে। তিনি বলেন, “শিশুদের প্রতি বছর মানসিকভাবে ট্রমাটাইজড (আঘাতপ্রাপ্ত) করার জন্য এটি শেখানো হয়। তাদের বোঝানো হয় যে পুরো পৃথিবীই ইহুদি-বিদ্বেষী (antisemitic) এবং তাদের জন্য একমাত্র নিরাপদ স্থান হলো ইসরায়েল।”
শিক্ষকদের নির্দেশিকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর কোমলমতি শিশুদেরও শেখানো হয় যে, অতীতে ইহুদিদের কোনো রাষ্ট্র এবং নিজস্ব সেনাবাহিনী ছিল না বলেই তাদের হলোকাস্টের শিকার হতে হয়েছিল। এই শিক্ষা শিশুদের মধ্যে অনবরত একটি অদৃশ্য হুমকির ভয় তৈরি করে রাখে। এর স্বাভাবিক পরিণতি হলো ‘আমরা’ এবং ‘ওরা’ (বিজাতীয়)—এই চরম বিভাজন। ড. পেলেড-এলহানান বলেন, “এর মূল উদ্দেশ্য হলো এমন একদল মানুষ তৈরি করা, যারা নিজেদের গোষ্ঠী ছাড়া অন্য সবাইকে ভয় পাবে এবং ঘৃণা করবে। ইসরায়েলের ক্ষমতায় থাকা প্রধান গোষ্ঠীটি হলো পূর্ব ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত আশকেনাজি ইহুদি। এরা ছাড়া বাকি সবাইকে—তা সে অন্য কোনো জাতির মানুষ হোক বা আরব ইহুদি—সবাইকে হয় অবজ্ঞা করা হয়, উপহাস করা হয় অথবা পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়।” আরব ইহুদি (মিজরাহি) এবং ইথিওপীয় ইহুদিদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকেও একইভাবে ইসরায়েলি পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
গাজায় চলমান গণহত্যাকে ‘বিজয়’ হিসেবে দেখানোর আগাম প্রস্তুতি
বর্তমানে গাজায় বিশ্ববাসীর চোখের সামনে লাইভ সম্প্রচার হওয়া ভয়াবহ গণহত্যা ও জাতিগত নিধনযজ্ঞের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ড. পেলেড-এলহানান অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, “আজ গাজায় একটি লাইভ গণহত্যা ঘটছে। কিন্তু ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এটিকে এখনই তাদের পাঠ্যক্রমে একটি ‘মহান বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য ছক কষে ফেলেছে। তারা এটিকে অতীতে ঘটে যাওয়া হলোকাস্টের সাথে যুক্ত করে সমাজে এই বয়ান তৈরি করছে যে— ‘আমরা আবারো হুমকির মুখে পড়েছিলাম, আমাদের আবারো নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, আর আমাদের বীর সেনাবাহিনী আপনাদের সবাইকে রক্ষা করেছে।’”
পশ্চিমা বিশ্বের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ইউরোপের রাজনৈতিক ও একাডেমিক মহল ইসরায়েলের এই চরম বর্ণবাদী ও উগ্রপন্থী শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছে। অথচ ফিলিস্তিনিদের পাঠ্যপুস্তককে টার্গেট করে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক মহলে যে অপপ্রচার চালায়, তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত ছিল প্রকৃত একাডেমিক গবেষণাগুলোকে আমলে নেওয়া। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, ফিলিস্তিনি পাঠ্যপুস্তকগুলো সরাসরি ইসরায়েল এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে তীব্র সেন্সরশিপের শিকার হচ্ছে। এমনকি ইসরায়েলের শিক্ষা মন্ত্রণালয় পূর্ব জেরুজালেমে পড়ানো ফিলিস্তিনি স্কুলগুলোর পাঠ্যক্রমেও সরাসরি হস্তক্ষেপ ও তা বিকৃত করছে।

আপনার মতামত লিখুন