মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

রাম নবমী ও হোলির আড়ালে মুসলিম ও দলিতদের লক্ষ্যবস্তু করার ভয়ংকর পরিসংখ্যান উন্মোচন

ভারতে সংখ্যালঘু নিপীড়ন: মার্চে ৫৮টি ঘৃণ্য অপরাধ, উৎসবের মাসেও অব্যাহত সহিংসতা



ভারতে সংখ্যালঘু নিপীড়ন: মার্চে ৫৮টি ঘৃণ্য অপরাধ, উৎসবের মাসেও অব্যাহত সহিংসতা

২০২৬ সালের মার্চ মাস ভারতের সংখ্যালঘু বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিভীষিকাময় সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। রমজান, ঈদুল ফিতর এবং রাম নবমীর সন্ধিক্ষণে দেশজুড়ে অন্তত ৫৮টি বড় ধরনের 'ঘৃণ্য অপরাধ' রেকর্ড করা হয়েছে। সিয়াসত ডটকমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, উৎসবের আড়ালে পরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন বলয়ের সমর্থক গোষ্ঠী এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এসব কর্মকাণ্ডকে প্রায়শই 'ধর্মীয় আত্মরক্ষা' বা 'জাতীয় সংহতি' রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করা হয়। উত্তরপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের কতিপয় সরকারি কর্মকর্তার বক্তব্যে উঠে এসেছে যে, "শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় এবং অবৈধ গো-পাচার রুখতে" কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন শোভাযাত্রার আয়োজকদের দাবি, তারা কেবল তাদের ধর্মীয় অধিকার চর্চা করছেন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তরপ্রদেশে ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটি একটি 'রুটিন প্রক্রিয়া' এবং এতে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ সত্ত্বেও অনেক স্থানে প্রশাসন উগ্রপন্থীদের উস্কানিমূলক স্লোগান ও মিছিলকে 'মত প্রকাশের স্বাধীনতা' হিসেবে দেখছে।

২০২৬ সালের মার্চ মাস জুড়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম ও দলিত জনগোষ্ঠীর ওপর যে নির্মমতা চালানো হয়েছে, তার চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। ২০ মার্চ রমজান শেষ এবং ২৯ মার্চ রাম নবমীর মধ্যবর্তী সময়ে উত্তরপ্রদেশে সর্বোচ্চ ৯টি এবং তেলেঙ্গানায় ৬টি বড় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

নৃশংস হত্যাকাণ্ড: সবজি বহনকারী ট্রাক চালক আমির (২৮) নামে এক মুসলিম যুবককে গো-রক্ষার নামে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। দিল্লিতে কেবল 'হোলির শুভেচ্ছা' জানানোর জন্য এক দলিত ব্যক্তিকে প্রাণ দিতে হয়েছে।

নারী ও শিশুদের ওপর লাঞ্ছনা: বিহারে রোশন খাতুন (৬৫) নামক এক বৃদ্ধাকে রোজা রাখা অবস্থায় জোরপূর্বক মদ পান করানো হয়েছে। ব্যাঙ্গালুরুতে ১৭ বছরের এক কিশোরকে অপহরণ করে নির্যাতন করেছে বজরং দল।

সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বয়কট: মহারাষ্ট্রে 'দ্য কেরালা স্টোরি ২' নামক প্রোপাগান্ডা সিনেমা প্রদর্শনের সময় প্রকাশ্যে মুসলিমদের অর্থনৈতিক বয়কটের শপথ নেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনিক ভূমিকা: সম্বল জেলা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (DSP) মুসলিমদের উদ্দেশ্যে 'ইরানে চলে যাওয়ার' ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। এছাড়া মিরাট পুলিশের পক্ষ থেকে মসজিদের বাইরে নামাজ পড়লে পাসপোর্ট বাতিলের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নন্দীগ্রামের মতো এলাকায় প্রায় ৯৫ শতাংশ মুসলিম ভোটারের নাম কৌশলে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা উম্মাহর রাজনৈতিক অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে বর্তমানে সংখ্যালঘু নিপীড়ন কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত এবং পদ্ধতিগত রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভারতের নিজস্ব সংবিধানের ২৫-২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকল নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটছে না।

সুপ্রিম কোর্ট পশ্চিম বঙ্গকে ভারতের সবচেয়ে 'মেরুকৃত' রাজ্য হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলে। পুলিশের সরাসরি অংশগ্রহণ এবং বুলডোজার সংস্কৃতির মাধ্যমে বিচারবহির্ভূতভাবে ঘরবাড়ি ধ্বংস করা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে ভারতে ইসলামফোবিয়াকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান, ভারতে সংখ্যালঘুদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এই ঘৃণ্য অপরাধের হোতাদের স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করতে কার্যকর চাপ প্রয়োগ করা এখন সময়ের দাবি।

বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬


ভারতে সংখ্যালঘু নিপীড়ন: মার্চে ৫৮টি ঘৃণ্য অপরাধ, উৎসবের মাসেও অব্যাহত সহিংসতা

প্রকাশের তারিখ : ২১ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

২০২৬ সালের মার্চ মাস ভারতের সংখ্যালঘু বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিভীষিকাময় সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। রমজান, ঈদুল ফিতর এবং রাম নবমীর সন্ধিক্ষণে দেশজুড়ে অন্তত ৫৮টি বড় ধরনের 'ঘৃণ্য অপরাধ' রেকর্ড করা হয়েছে। সিয়াসত ডটকমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, উৎসবের আড়ালে পরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন বলয়ের সমর্থক গোষ্ঠী এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এসব কর্মকাণ্ডকে প্রায়শই 'ধর্মীয় আত্মরক্ষা' বা 'জাতীয় সংহতি' রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করা হয়। উত্তরপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের কতিপয় সরকারি কর্মকর্তার বক্তব্যে উঠে এসেছে যে, "শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় এবং অবৈধ গো-পাচার রুখতে" কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন শোভাযাত্রার আয়োজকদের দাবি, তারা কেবল তাদের ধর্মীয় অধিকার চর্চা করছেন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তরপ্রদেশে ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটি একটি 'রুটিন প্রক্রিয়া' এবং এতে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ সত্ত্বেও অনেক স্থানে প্রশাসন উগ্রপন্থীদের উস্কানিমূলক স্লোগান ও মিছিলকে 'মত প্রকাশের স্বাধীনতা' হিসেবে দেখছে।

২০২৬ সালের মার্চ মাস জুড়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম ও দলিত জনগোষ্ঠীর ওপর যে নির্মমতা চালানো হয়েছে, তার চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। ২০ মার্চ রমজান শেষ এবং ২৯ মার্চ রাম নবমীর মধ্যবর্তী সময়ে উত্তরপ্রদেশে সর্বোচ্চ ৯টি এবং তেলেঙ্গানায় ৬টি বড় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

নৃশংস হত্যাকাণ্ড: সবজি বহনকারী ট্রাক চালক আমির (২৮) নামে এক মুসলিম যুবককে গো-রক্ষার নামে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। দিল্লিতে কেবল 'হোলির শুভেচ্ছা' জানানোর জন্য এক দলিত ব্যক্তিকে প্রাণ দিতে হয়েছে।

নারী ও শিশুদের ওপর লাঞ্ছনা: বিহারে রোশন খাতুন (৬৫) নামক এক বৃদ্ধাকে রোজা রাখা অবস্থায় জোরপূর্বক মদ পান করানো হয়েছে। ব্যাঙ্গালুরুতে ১৭ বছরের এক কিশোরকে অপহরণ করে নির্যাতন করেছে বজরং দল।

সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বয়কট: মহারাষ্ট্রে 'দ্য কেরালা স্টোরি ২' নামক প্রোপাগান্ডা সিনেমা প্রদর্শনের সময় প্রকাশ্যে মুসলিমদের অর্থনৈতিক বয়কটের শপথ নেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনিক ভূমিকা: সম্বল জেলা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (DSP) মুসলিমদের উদ্দেশ্যে 'ইরানে চলে যাওয়ার' ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। এছাড়া মিরাট পুলিশের পক্ষ থেকে মসজিদের বাইরে নামাজ পড়লে পাসপোর্ট বাতিলের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নন্দীগ্রামের মতো এলাকায় প্রায় ৯৫ শতাংশ মুসলিম ভোটারের নাম কৌশলে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা উম্মাহর রাজনৈতিক অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে বর্তমানে সংখ্যালঘু নিপীড়ন কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত এবং পদ্ধতিগত রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভারতের নিজস্ব সংবিধানের ২৫-২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকল নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটছে না।

সুপ্রিম কোর্ট পশ্চিম বঙ্গকে ভারতের সবচেয়ে 'মেরুকৃত' রাজ্য হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলে। পুলিশের সরাসরি অংশগ্রহণ এবং বুলডোজার সংস্কৃতির মাধ্যমে বিচারবহির্ভূতভাবে ঘরবাড়ি ধ্বংস করা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে ভারতে ইসলামফোবিয়াকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান, ভারতে সংখ্যালঘুদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এই ঘৃণ্য অপরাধের হোতাদের স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করতে কার্যকর চাপ প্রয়োগ করা এখন সময়ের দাবি।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত