অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের বেন্ডিগো শহরে দীর্ঘ এক দশকের প্রতীক্ষা ও প্রতিকূলতার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে উন্মোচিত হলো ওই অঞ্চলের প্রথম মসজিদের দুয়ার। ইসলামবিদ্বেষী ও উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর উসকানিমূলক প্রতিবাদ এবং দীর্ঘমেয়াদী আইনি বাধা মাড়িয়ে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে বেন্ডিগো মসজিদের উদ্বোধন করা হয়। এই উদ্বোধনকে দেশটিতে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০১৪ সালে বেন্ডিগো মসজিদ প্রকল্পের ঘোষণা আসার পর থেকেই অস্ট্রেলিয়ার কতিপয় উগ্র জাতীয়তাবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠী এর তীব্র বিরোধিতা শুরু করে। তাদের প্রধান দাবি ছিল, এই মসজিদ নির্মাণ করা হলে স্থানীয় এলাকায় যানজট বৃদ্ধি পাবে এবং এলাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ক্ষুণ্ণ হবে। মসজিদটির নির্মাণ বন্ধ করতে এই ঠুনকো অজুহাতে মামলা দায়ের করে এবং দীর্ঘ ৫ বছর ধরে বিচার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করে। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মেলবোর্ন ও বেন্ডিগোতে কট্টরপন্থী দলগুলো নিয়মিত মসজিদবিরোধী সমাবেশ করে, যেখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য প্রচার করা হয়। তাদের দাবি ছিল, "একটি অমুসলিম প্রধান শহরে বিশাল মসজিদ নির্মাণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।"
২১ এপ্রিল, ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের প্রিমিয়ার জাসিন্টা অ্যালান এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে বেন্ডিগো মসজিদটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। ২০১৪ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দীর্ঘ ১২ বছর পর এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখলো স্থানীয় প্রায় ২৫০টি মুসলিম পরিবার।
মসজিদটি নির্মাণে মুসলিমদের ওপর ব্যাপক মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। বেন্ডিগো ইসলামিক কমিউনিটি সেন্টারের সভাপতি আয়মান চেহনা জানান, ইসলামবিদ্বেষীদের দায়ের করা ভিত্তিহীন মামলার কারণে ৫ বছর সময় অপচয় হয়েছে, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতির কারণে নির্মাণ ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়। তিনি বলেন, "যদি মামলাটি না হতো, তবে আমরা অনেক আগেই এবং অনেক কম খরচে এটি সম্পন্ন করতে পারতাম।" ভিক্টোরিয়ার প্রিমিয়ার জাসিন্টা অ্যালান এই দিনটিকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে বলেন, "ধর্ম পালনের অধিকার সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত। বেন্ডিগোর মুসলমানদের আজ মাথা উঁচু করে গর্ব করার দিন।" দীর্ঘ এই সময়ে স্থানীয় মুসলিমরা কেবল আইনি লড়াই নয়, বরং সামাজিক অপপ্রচারের শিকারও হয়েছেন।
বেন্ডিগো মসজিদের এই দীর্ঘ লড়াই অস্ট্রেলিয়ার বিচার বিভাগ এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। ২০১৬ সালে আদালত মসজিদ বিরোধীদের দায়ের করা অভিযোগগুলোকে 'ভিত্তিহীন' বলে খারিজ করে দেয় এবং মামলাকারী পক্ষকেই সমস্ত আইনি খরচ বহন করার নির্দেশ দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, উন্নয়ন বা যানজটের নামে যে আপত্তি তোলা হয়েছিল তা ছিল মূলত ইসলামভীতি বা ইসলামোফোবিয়া প্রসূত।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং অস্ট্রেলিয়ার সংবিধান নাগরিককে নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়। বেন্ডিগোর ঘটনা শিক্ষা দেয় যে, উগ্রপন্থীদের অযৌক্তিক বাধার মুখেও যদি ধৈর্য ও আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে লড়াই করা যায়, তবে সত্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ এক দশকের অবদমনকে পেছনে ফেলে এই মসজিদের মিনার এখন কেবল প্রার্থনার স্থান নয়, বরং ধর্মীয় সহনশীলতা ও অবিচল সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
বিষয় : মসজিদ অস্ট্রেলিয়া বেন্ডিগো

বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬
অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের বেন্ডিগো শহরে দীর্ঘ এক দশকের প্রতীক্ষা ও প্রতিকূলতার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে উন্মোচিত হলো ওই অঞ্চলের প্রথম মসজিদের দুয়ার। ইসলামবিদ্বেষী ও উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর উসকানিমূলক প্রতিবাদ এবং দীর্ঘমেয়াদী আইনি বাধা মাড়িয়ে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে বেন্ডিগো মসজিদের উদ্বোধন করা হয়। এই উদ্বোধনকে দেশটিতে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০১৪ সালে বেন্ডিগো মসজিদ প্রকল্পের ঘোষণা আসার পর থেকেই অস্ট্রেলিয়ার কতিপয় উগ্র জাতীয়তাবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠী এর তীব্র বিরোধিতা শুরু করে। তাদের প্রধান দাবি ছিল, এই মসজিদ নির্মাণ করা হলে স্থানীয় এলাকায় যানজট বৃদ্ধি পাবে এবং এলাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ক্ষুণ্ণ হবে। মসজিদটির নির্মাণ বন্ধ করতে এই ঠুনকো অজুহাতে মামলা দায়ের করে এবং দীর্ঘ ৫ বছর ধরে বিচার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করে। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মেলবোর্ন ও বেন্ডিগোতে কট্টরপন্থী দলগুলো নিয়মিত মসজিদবিরোধী সমাবেশ করে, যেখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য প্রচার করা হয়। তাদের দাবি ছিল, "একটি অমুসলিম প্রধান শহরে বিশাল মসজিদ নির্মাণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।"
২১ এপ্রিল, ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের প্রিমিয়ার জাসিন্টা অ্যালান এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে বেন্ডিগো মসজিদটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। ২০১৪ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দীর্ঘ ১২ বছর পর এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখলো স্থানীয় প্রায় ২৫০টি মুসলিম পরিবার।
মসজিদটি নির্মাণে মুসলিমদের ওপর ব্যাপক মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। বেন্ডিগো ইসলামিক কমিউনিটি সেন্টারের সভাপতি আয়মান চেহনা জানান, ইসলামবিদ্বেষীদের দায়ের করা ভিত্তিহীন মামলার কারণে ৫ বছর সময় অপচয় হয়েছে, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতির কারণে নির্মাণ ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়। তিনি বলেন, "যদি মামলাটি না হতো, তবে আমরা অনেক আগেই এবং অনেক কম খরচে এটি সম্পন্ন করতে পারতাম।" ভিক্টোরিয়ার প্রিমিয়ার জাসিন্টা অ্যালান এই দিনটিকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে বলেন, "ধর্ম পালনের অধিকার সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত। বেন্ডিগোর মুসলমানদের আজ মাথা উঁচু করে গর্ব করার দিন।" দীর্ঘ এই সময়ে স্থানীয় মুসলিমরা কেবল আইনি লড়াই নয়, বরং সামাজিক অপপ্রচারের শিকারও হয়েছেন।
বেন্ডিগো মসজিদের এই দীর্ঘ লড়াই অস্ট্রেলিয়ার বিচার বিভাগ এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। ২০১৬ সালে আদালত মসজিদ বিরোধীদের দায়ের করা অভিযোগগুলোকে 'ভিত্তিহীন' বলে খারিজ করে দেয় এবং মামলাকারী পক্ষকেই সমস্ত আইনি খরচ বহন করার নির্দেশ দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, উন্নয়ন বা যানজটের নামে যে আপত্তি তোলা হয়েছিল তা ছিল মূলত ইসলামভীতি বা ইসলামোফোবিয়া প্রসূত।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং অস্ট্রেলিয়ার সংবিধান নাগরিককে নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়। বেন্ডিগোর ঘটনা শিক্ষা দেয় যে, উগ্রপন্থীদের অযৌক্তিক বাধার মুখেও যদি ধৈর্য ও আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে লড়াই করা যায়, তবে সত্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ এক দশকের অবদমনকে পেছনে ফেলে এই মসজিদের মিনার এখন কেবল প্রার্থনার স্থান নয়, বরং ধর্মীয় সহনশীলতা ও অবিচল সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

আপনার মতামত লিখুন