ভারতের বিহারের মধুবনী জেলায় লোহাড় সম্প্রদায়ের এক ক্ষুব্ধ জনতার গণপিটুনিতে গুরুত্বর আহত ৬৬ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ মুসলিম ব্যক্তি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। গত ১২ মে লুদগামা গ্রামে এই হামলার ঘটনাটি ঘটে এবং হাসপাতালে ১০ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে গত ২১ মে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পরপরই পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং বৃদ্ধের মৃত্যুর পরেই কেবল এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়।
ভারতের বিহারের মধুবনী জেলার বেনিপট্টি থানা এলাকায় এক তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গণপিটুনি ও বাড়িঘরে হামলার নৃশংস ঘটনায় ইসলাম নাদাফ নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। তবে এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে পুলিশের ভূমিকা, যেখানে মৃত্যুর আগে দীর্ঘ ১০ দিন পর্যন্ত কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত
বেনিপট্টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা যায়, গত ১২ মে ইসলাম নাদাফের এক ছেলে স্থানীয় লোহাড় সম্প্রদায়ের একটি বিয়েবাড়িতে আমন্ত্রিত না হয়েও প্রবেশ করেন এবং সেখানে নাচতে শুরু করেন। এ নিয়ে সেখানে উপস্থিত লোকজনের সাথে তার কথাকাটাকাটি ও গালিগালাজ শুরু হয়। একপর্যায়ে আত্মরক্ষার্থে ইসলাম নাদাফের ছেলে সেখানে এক যুবককে আঘাত করলে ওই যুবক সামান্য আহত হন।
বাড়িঘরে হামলা
এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে পরবর্তীতে লোহাড় সম্প্রদায়ের এক বিশাল ক্ষুব্ধ জনতা লাঠিসোটা নিয়ে ইসলাম নাদাফের বাড়িতে চড়াও হয়। উত্তেজিত জনতা তার বাড়ি ভাঙচুর করে এবং তার পরিবারের সদস্যদের ওপর বর্বর হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, হামলাকারীরা বাড়ির নারীদেরও রেহাই দেয়নি।
হামলার সময় ৬৬ বছর বয়সী ইসলাম নাদাফকে এত নির্মমভাবে মারধর করা হয় যে ঘটনাস্থলেই তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে। পরে তাকে বেনিপট্টির একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে দীর্ঘ ১০ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ২১ মে তিনি মারা যান।
পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ
নিহতের পরিবারের স্পষ্ট অভিযোগ, হামলার পরপরই তারা থানায় অভিযোগ করতে গেলেও পুলিশ কোনো প্রকার মামলা বা এফআইআর গ্রহণ করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে ইসলাম নাদাফ মারা যাওয়ার পরই কেবল পুলিশ মামলা নথিভুক্ত করতে বাধ্য হয়।
যদিও বেনিপট্টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এই বিলম্বের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, "মামলা নিবন্ধনে কোনো বিলম্ব হয়নি। আমরা অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথেই মামলা নিয়েছি এবং গত ২১ মে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ধারা ১০৩(১) (খুন) এর অধীনে একজনকে গ্রেপ্তার করেছি। তাকে ইতিমধ্যে বিচারিক রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে।" তবে ঘটনার সাথে জড়িত অন্য হামলাকারীদের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে এই পুলিশ কর্মকর্তা আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো আমলযোগ্য অপরাধের (Cognizable Offense) ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক এফআইআর দায়ের করা পুলিশের আইনি বাধ্যবাধকতা। এই ঘটনায় পুলিশ তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ কেন নেয়নি এবং মূল ঘটনার ১০ দিন পর কেন মামলা হলো, তা একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। ঘটনার সুস্থ তদন্ত এবং বাকি অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা না হলে স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহিতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
একটি সামাজিক ও পারিবারিক স্তরের বিরোধ কীভাবে প্রাণঘাতী সাম্প্রদায়িক বা গোষ্ঠীগত সহিংসতায় রূপ নিতে পারে, মধুবনীর ঘটনা তারই এক উদ্বেগজনক উদাহরণ। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা কঠোরভাবে দমন করা এবং নিহতের পরিবারের জন্য দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত।
বিষয় : ভারত সাম্প্রদায়িক

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬
ভারতের বিহারের মধুবনী জেলায় লোহাড় সম্প্রদায়ের এক ক্ষুব্ধ জনতার গণপিটুনিতে গুরুত্বর আহত ৬৬ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ মুসলিম ব্যক্তি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। গত ১২ মে লুদগামা গ্রামে এই হামলার ঘটনাটি ঘটে এবং হাসপাতালে ১০ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে গত ২১ মে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পরপরই পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং বৃদ্ধের মৃত্যুর পরেই কেবল এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়।
ভারতের বিহারের মধুবনী জেলার বেনিপট্টি থানা এলাকায় এক তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গণপিটুনি ও বাড়িঘরে হামলার নৃশংস ঘটনায় ইসলাম নাদাফ নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। তবে এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে পুলিশের ভূমিকা, যেখানে মৃত্যুর আগে দীর্ঘ ১০ দিন পর্যন্ত কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত
বেনিপট্টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা যায়, গত ১২ মে ইসলাম নাদাফের এক ছেলে স্থানীয় লোহাড় সম্প্রদায়ের একটি বিয়েবাড়িতে আমন্ত্রিত না হয়েও প্রবেশ করেন এবং সেখানে নাচতে শুরু করেন। এ নিয়ে সেখানে উপস্থিত লোকজনের সাথে তার কথাকাটাকাটি ও গালিগালাজ শুরু হয়। একপর্যায়ে আত্মরক্ষার্থে ইসলাম নাদাফের ছেলে সেখানে এক যুবককে আঘাত করলে ওই যুবক সামান্য আহত হন।
বাড়িঘরে হামলা
এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে পরবর্তীতে লোহাড় সম্প্রদায়ের এক বিশাল ক্ষুব্ধ জনতা লাঠিসোটা নিয়ে ইসলাম নাদাফের বাড়িতে চড়াও হয়। উত্তেজিত জনতা তার বাড়ি ভাঙচুর করে এবং তার পরিবারের সদস্যদের ওপর বর্বর হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, হামলাকারীরা বাড়ির নারীদেরও রেহাই দেয়নি।
হামলার সময় ৬৬ বছর বয়সী ইসলাম নাদাফকে এত নির্মমভাবে মারধর করা হয় যে ঘটনাস্থলেই তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে। পরে তাকে বেনিপট্টির একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে দীর্ঘ ১০ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ২১ মে তিনি মারা যান।
পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ
নিহতের পরিবারের স্পষ্ট অভিযোগ, হামলার পরপরই তারা থানায় অভিযোগ করতে গেলেও পুলিশ কোনো প্রকার মামলা বা এফআইআর গ্রহণ করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে ইসলাম নাদাফ মারা যাওয়ার পরই কেবল পুলিশ মামলা নথিভুক্ত করতে বাধ্য হয়।
যদিও বেনিপট্টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এই বিলম্বের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, "মামলা নিবন্ধনে কোনো বিলম্ব হয়নি। আমরা অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথেই মামলা নিয়েছি এবং গত ২১ মে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ধারা ১০৩(১) (খুন) এর অধীনে একজনকে গ্রেপ্তার করেছি। তাকে ইতিমধ্যে বিচারিক রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে।" তবে ঘটনার সাথে জড়িত অন্য হামলাকারীদের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে এই পুলিশ কর্মকর্তা আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো আমলযোগ্য অপরাধের (Cognizable Offense) ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক এফআইআর দায়ের করা পুলিশের আইনি বাধ্যবাধকতা। এই ঘটনায় পুলিশ তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ কেন নেয়নি এবং মূল ঘটনার ১০ দিন পর কেন মামলা হলো, তা একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। ঘটনার সুস্থ তদন্ত এবং বাকি অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা না হলে স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহিতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
একটি সামাজিক ও পারিবারিক স্তরের বিরোধ কীভাবে প্রাণঘাতী সাম্প্রদায়িক বা গোষ্ঠীগত সহিংসতায় রূপ নিতে পারে, মধুবনীর ঘটনা তারই এক উদ্বেগজনক উদাহরণ। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা কঠোরভাবে দমন করা এবং নিহতের পরিবারের জন্য দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত।

আপনার মতামত লিখুন