সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬
সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬
কওমী টাইমস

সম্ভলে দশকের পুরোনো মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর মহানবীর প্রতি ভালোবাসার পোস্টারকে ‘আপত্তিকর’ বলে ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা!

মসজিদ ভাঙার পর ‘আই লাভ মোহাম্মদ’ পোস্টার পাওয়ায় ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা



মসজিদ ভাঙার পর ‘আই লাভ মোহাম্মদ’ পোস্টার পাওয়ায় ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা

ভারতের উত্তরপ্রদেশের সম্ভলে উচ্ছেদ অভিযানের সময় একটি ভেঙে ফেলা মসজিদের ভেতর থেকে ‘আই লাভ মোহাম্মদ’ লেখা পোস্টার এবং একটি সবুজ পতাকা উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ও নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসন দাবি করেছে, মসজিদটি সরকারি কবরস্থানের জায়গার ওপর অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছিল। তবে উচ্ছেদের পর এই পোস্টার উদ্ধারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মুসলিম কমিটির ৭ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ, যা এলাকায় তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

উত্তরপ্রদেশের সম্ভল জেলার নাখাসা এলাকার কাসেরুয়া গ্রামে গত শনিবার একটি উচ্ছেদ অভিযান চালায় স্থানীয় প্রশাসন। তাদের দাবি, মুস্তফা কাদরি মসজিদটি সরকারি রাজস্ব রেকর্ডে কবরস্থান হিসেবে চিহ্নিত প্রায় ১২০ বর্গমিটার জমির ওপর অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। তেহসিলদার আদালতে মালিকানার কোনো বৈধ নথিপত্র দেখাতে না পারায় আদালত এটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতেও আপিল করে কোনো প্রতিকার পায়নি মসজিদ কমিটি।

ভাঙার কাজ শুরু হওয়ার আগে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ মসজিদে শেষবারের মতো নামাজ আদায় করেন। উচ্ছেদ অভিযান চলাকালীন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।

পোস্টার উদ্ধারে পুলিশের তদন্ত

বিতর্কের সূত্রপাত হয় মসজিদটি ভেঙে ফেলার পর। পুলিশের দাবি, মুস্তফা কাদরি মসজিদের প্রথম তলা থেকে ‘আই লাভ মোহাম্মদ’ (I Love Mohammad) লেখা পোস্টার এবং একটি সবুজ পতাকা উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তা কৃষ্ণ কুমার বিষ্ণোই জানান, এই পোস্টার এবং পতাকাগুলো পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এগুলো কে ছেপেছে এবং কী উদ্দেশ্যে মসজিদের ভেতরে রাখা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কুলদীপ সিং জানিয়েছেন যে, সিলগালা ও ধ্বংসের প্রক্রিয়ার সময় কিছু "আপত্তিকর সামগ্রী" পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ধারায় মসজিদ কমিটির সাথে যুক্ত ৭ জনের বিরুদ্ধে একটি এফআইআর (FIR) বা প্রথম তথ্য বিবরণী দায়ের করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সংসদ সদস্যের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া

প্রশাসনের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও মসজিদ প্রতিনিধিরা। তাদের দাবি, এই মসজিদটি বহু দশকের পুরোনো এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রামের মানুষ এখানে নামাজ আদায় করে আসছেন। এটিকে হঠাৎ অবৈধ ঘোষণা করে ভেঙে ফেলা এবং মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার পোস্টারকে ‘আপত্তিকর’ আখ্যা দিয়ে মামলা করা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের শামিল।

এই ঘটনাটি দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। সম্ভলের সংসদ সদস্য (MP) জিয়া উর রহমান বার্ক এই পোস্টার বিতর্ক এবং মসজিদ ভাঙার তীব্র সমালোচনা করেছেন। প্রশাসনের এমন ভূমিকার জবাবে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও আবেগপূর্ণ কণ্ঠে তিনি বলেন:

"আমি বলব ‘আই লাভ মুহাম্মদ’। যদি আপনাদের সাহস থাকে, তবে আমাকে ফাঁসি দিন।"

ঐতিহাসিক একটি উপাসনালয় ধ্বংসের পর রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার সাধারণ পোস্টারকে কেন্দ্র করে ফৌজদারি মামলা দায়েরের এই ঘটনাটি নিয়ে বর্তমানে পুরো উত্তরপ্রদেশে তীব্র সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় বইছে।

ভারতে ধর্মীয় উপাসনালয় উচ্ছেদ এবং পরবর্তীতে ধর্মীয় প্রতীক বা স্লোগানকে "আপত্তিকর সামগ্রী" হিসেবে গণ্য করে মামলা দায়েরের ঘটনাটি আইনি ও নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দেশের আইন অনুযায়ী যেকোনো নাগরিকের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশ বা প্রচার করার অধিকার রয়েছে। শান্তি বিঘ্নিত না করে "আই লাভ মোহাম্মদ" বা কোনো ধর্মীয় উক্তি পোস্টারে রাখা কীভাবে আইনি অপরাধ বা আপত্তিকর হতে পারে, তা নিয়ে অধিকারকর্মীরা প্রশ্ন তুলছেন। এই পদক্ষেপ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকারের সুরক্ষায় প্রশাসনের নিরপেক্ষতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

উত্তরপ্রদেশে গত কয়েক বছর ধরে সরকারি জমি, রাস্তা বা খাস জমি দখলমুক্ত করার নামে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা, বিশেষ করে মসজিদ ও মাজার উচ্ছেদের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্ভলের এই ঘটনাটি সেই ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযানেরই অংশ, যা প্রায়শই স্থানীয় জনবিন্যাস ও সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্যের ওপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলছে।

উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার পর ধর্মীয় পোস্টারকে কেন্দ্র করে মামলা দায়েরের বিষয়টি সম্ভলের স্থানীয় পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। প্রশাসনের উচিত আইনি প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে যেন কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতি বা নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ না হয়, সেদিকে কঠোরভাবে নজর রাখা। শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পক্ষপাতহীন তদন্তই এখন একমাত্র পথ।

বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬


মসজিদ ভাঙার পর ‘আই লাভ মোহাম্মদ’ পোস্টার পাওয়ায় ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা

প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬

featured Image

ভারতের উত্তরপ্রদেশের সম্ভলে উচ্ছেদ অভিযানের সময় একটি ভেঙে ফেলা মসজিদের ভেতর থেকে ‘আই লাভ মোহাম্মদ’ লেখা পোস্টার এবং একটি সবুজ পতাকা উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ও নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসন দাবি করেছে, মসজিদটি সরকারি কবরস্থানের জায়গার ওপর অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছিল। তবে উচ্ছেদের পর এই পোস্টার উদ্ধারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মুসলিম কমিটির ৭ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ, যা এলাকায় তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

উত্তরপ্রদেশের সম্ভল জেলার নাখাসা এলাকার কাসেরুয়া গ্রামে গত শনিবার একটি উচ্ছেদ অভিযান চালায় স্থানীয় প্রশাসন। তাদের দাবি, মুস্তফা কাদরি মসজিদটি সরকারি রাজস্ব রেকর্ডে কবরস্থান হিসেবে চিহ্নিত প্রায় ১২০ বর্গমিটার জমির ওপর অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। তেহসিলদার আদালতে মালিকানার কোনো বৈধ নথিপত্র দেখাতে না পারায় আদালত এটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতেও আপিল করে কোনো প্রতিকার পায়নি মসজিদ কমিটি।

ভাঙার কাজ শুরু হওয়ার আগে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ মসজিদে শেষবারের মতো নামাজ আদায় করেন। উচ্ছেদ অভিযান চলাকালীন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।

পোস্টার উদ্ধারে পুলিশের তদন্ত

বিতর্কের সূত্রপাত হয় মসজিদটি ভেঙে ফেলার পর। পুলিশের দাবি, মুস্তফা কাদরি মসজিদের প্রথম তলা থেকে ‘আই লাভ মোহাম্মদ’ (I Love Mohammad) লেখা পোস্টার এবং একটি সবুজ পতাকা উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তা কৃষ্ণ কুমার বিষ্ণোই জানান, এই পোস্টার এবং পতাকাগুলো পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এগুলো কে ছেপেছে এবং কী উদ্দেশ্যে মসজিদের ভেতরে রাখা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কুলদীপ সিং জানিয়েছেন যে, সিলগালা ও ধ্বংসের প্রক্রিয়ার সময় কিছু "আপত্তিকর সামগ্রী" পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ধারায় মসজিদ কমিটির সাথে যুক্ত ৭ জনের বিরুদ্ধে একটি এফআইআর (FIR) বা প্রথম তথ্য বিবরণী দায়ের করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সংসদ সদস্যের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া

প্রশাসনের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও মসজিদ প্রতিনিধিরা। তাদের দাবি, এই মসজিদটি বহু দশকের পুরোনো এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রামের মানুষ এখানে নামাজ আদায় করে আসছেন। এটিকে হঠাৎ অবৈধ ঘোষণা করে ভেঙে ফেলা এবং মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার পোস্টারকে ‘আপত্তিকর’ আখ্যা দিয়ে মামলা করা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের শামিল।

এই ঘটনাটি দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। সম্ভলের সংসদ সদস্য (MP) জিয়া উর রহমান বার্ক এই পোস্টার বিতর্ক এবং মসজিদ ভাঙার তীব্র সমালোচনা করেছেন। প্রশাসনের এমন ভূমিকার জবাবে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও আবেগপূর্ণ কণ্ঠে তিনি বলেন:

"আমি বলব ‘আই লাভ মুহাম্মদ’। যদি আপনাদের সাহস থাকে, তবে আমাকে ফাঁসি দিন।"

ঐতিহাসিক একটি উপাসনালয় ধ্বংসের পর রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার সাধারণ পোস্টারকে কেন্দ্র করে ফৌজদারি মামলা দায়েরের এই ঘটনাটি নিয়ে বর্তমানে পুরো উত্তরপ্রদেশে তীব্র সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় বইছে।

ভারতে ধর্মীয় উপাসনালয় উচ্ছেদ এবং পরবর্তীতে ধর্মীয় প্রতীক বা স্লোগানকে "আপত্তিকর সামগ্রী" হিসেবে গণ্য করে মামলা দায়েরের ঘটনাটি আইনি ও নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দেশের আইন অনুযায়ী যেকোনো নাগরিকের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশ বা প্রচার করার অধিকার রয়েছে। শান্তি বিঘ্নিত না করে "আই লাভ মোহাম্মদ" বা কোনো ধর্মীয় উক্তি পোস্টারে রাখা কীভাবে আইনি অপরাধ বা আপত্তিকর হতে পারে, তা নিয়ে অধিকারকর্মীরা প্রশ্ন তুলছেন। এই পদক্ষেপ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকারের সুরক্ষায় প্রশাসনের নিরপেক্ষতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

উত্তরপ্রদেশে গত কয়েক বছর ধরে সরকারি জমি, রাস্তা বা খাস জমি দখলমুক্ত করার নামে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা, বিশেষ করে মসজিদ ও মাজার উচ্ছেদের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্ভলের এই ঘটনাটি সেই ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযানেরই অংশ, যা প্রায়শই স্থানীয় জনবিন্যাস ও সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্যের ওপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলছে।

উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার পর ধর্মীয় পোস্টারকে কেন্দ্র করে মামলা দায়েরের বিষয়টি সম্ভলের স্থানীয় পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। প্রশাসনের উচিত আইনি প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে যেন কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতি বা নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ না হয়, সেদিকে কঠোরভাবে নজর রাখা। শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পক্ষপাতহীন তদন্তই এখন একমাত্র পথ।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ