মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
কওমী টাইমস

মার্কিন-ইরান চুক্তি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না নেতানিয়াহু, 'গণহত্যার ভীতি' ছড়িয়ে নিজের ব্যর্থতা ঢাকছেন বলে ইসরায়েলি গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের বিস্ফোরক দাবি

ওয়াশিংটন-তেহরান চুক্তিতে কোণঠাসা ইসরায়েল, নেতানিয়াহুকে ‘ব্যর্থ ও মিথ্যাবাদী’ বলছেন দেশটির বিশ্লেষকরা



ওয়াশিংটন-তেহরান চুক্তিতে কোণঠাসা ইসরায়েল, নেতানিয়াহুকে ‘ব্যর্থ ও মিথ্যাবাদী’ বলছেন দেশটির বিশ্লেষকরা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া আকস্মিক যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা চুক্তি থেকে সম্পূর্ণ বাদ পড়ে চরম আন্তর্জাতিক অবমাননার শিকার হয়েছেন ইহুদিবাদী ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। খোদ ইসরায়েলের শীর্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গণমাধ্যমগুলো নেতানিয়াহুকে "মিথ্যাবাদী", "প্রতারক" এবং "ব্যর্থতার প্রধান কারিগর" বলে আখ্যায়িত করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেল আবিবকে পাশ কাটিয়ে এই চুক্তি সম্পন্ন করার মাধ্যমে নেতানিয়াহুকে চরমভাবে জুতোপেটা ও অপমান করেছেন বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলি বোদ্ধারা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক নিয়ে ইসরায়েলের ভেতরে তৈরি হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ভূমিকম্প। গত সোমবার রাতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেই স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যে ডিজিটাল চুক্তি সই হয়েছে, তার ভেতরের কোনো বিবরণই তিনি জানতেন না। এই ঘটনাকে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় "কৌশলগত ও কূটনৈতিক পরাজয়" হিসেবে দেখছেন দেশটির বিশ্লেষকরা।

ব্যর্থতার কারিগর ও মিথ্যার বেসাতি

ইসরায়েলের প্রভাবশালী দৈনিক হারেৎজ (Haaretz)-এ প্রখ্যাত বিশ্লেষক ইয়োসি ভের্টার নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করে একটি নিবন্ধ লিখেছেন, যার শিরোনাম— "লজ্জাহীনভাবে ব্যর্থতার কারিগর দাবি করছেন তিনি ইসরায়েলকে গণমৃত্যু থেকে বাঁচিয়েছেন.. এটি তার অসংখ্য মিথ্যার মধ্যে আরেকটি নতুন মিথ্যা।"

ভের্টার লিখেছেন, নেতানিয়াহু গত ত্রিশ বছর ধরে একই রেকর্ডের মতো বাজিয়ে যাচ্ছেন যে, তিনি ক্ষমতায় থাকলে ইরান পরমাণু অস্ত্র পাবে না। অথচ আজ ইসরায়েলকে চরম এক ব্যর্থতার চূড়ায় এনে দাঁড় করিয়েছেন। ইরান, পাকিস্তান এমনকি কাতারের মতো দেশগুলো যে চুক্তির বিষয়ে আগে থেকে সব জানত, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হয়েও নেতানিয়াহু তা জানতেন না। ট্রাম্পের সাথে সম্পর্ক নিয়ে মিথ্যাচার করছেন তিনি। ট্রাম্প তাকে নিয়মিত গালিগালাজ ও অপমান করছেন, যা ঘরের সবচেয়ে ভালো পরিবারেও ঘটে না।

নেতানিয়াহুর দাবি ছিল, ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ইরানের ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করেছে। কিন্তু ভের্টার এই দাবিকে নাকচ করে বলেন, নেতানিয়াহু এই সত্যটি আড়াল করছেন যে, এই চুক্তির ফলে ইরানের অবরুদ্ধ শত শত কোটি ডলারের তহবিল মুক্ত হবে এবং নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় ইরান দ্রুত অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হবে। ভের্টারের মতে, নেতানিয়াহুর সংবাদ সম্মেলন থেকে পরাজয়ের চরম হতাশা প্রকাশ পেয়েছে।

নেতানিয়াহুর সার্কাস শেষ, ট্রাম্প তাকে বাসের নিচে ফেলে দিয়েছেন

অপরদিকে, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম معاريف (Maariv)-এ কলামিস্ট বেন কাস্পিত লিখেছেন, "নেতানিয়াহুর শো বা সার্কাস শেষ হয়েছে; ট্রাম্প তাকে চলন্ত বাসের নিচে ফেলে দিয়েছেন।"

বেন কাস্পিত প্রশ্ন তোলেন, নেতানিয়াহু বারবার ভীতি ছড়াচ্ছেন যে আমরা নিশ্চিত ধ্বংস বা গণহত্যা থেকে বেঁচে গেছি। কিন্তু ইসরায়েলকে এই খাদের কিনারায় নিয়ে এলো কে? এই ভীতি প্রদর্শন আসলে ইরানের বিরুদ্ধে তার চরম ব্যর্থতা এবং ২০২৪ সাল থেকে গাজায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICC) যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ার দায় এড়ানোর অপচেষ্টা মাত্র। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির মতোই এবারও নেতানিয়াহুকে দরজার বাইরে অবাধ্য শিশুর মতো দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। ইরান এখন হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করবে, শুল্ক আদায় করবে এবং তেল বিক্রি করে আরও শক্তিশালী হবে, সেখানে ইসরায়েলের সাময়িক ক্ষতি সাধন কোনো কাজেই আসবে না।

ইতিহাসের নিকৃষ্টতম অবমাননা

রাজনৈতিক বিশ্লেষক বারাক সেরি হিব্রু ওয়েবসাইট ওয়ালা (Walla)-এ লিখেছেন, নেতানিয়াহুর সমস্ত অহংকার মাত্র একদিনে চরম উদ্বেগ ও নিকৃষ্টতম অপমানে পরিণত হয়েছে। গত মার্চ মাস থেকে হিজবুল্লাহর রকেট হামলায় ইসরায়েলিদের মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির মুখেও যিনি দেশের গণমাধ্যমে মুখ দেখাননি, তিনি গতকাল তাড়াহুড়ো করে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। কারণ ট্রাম্পের এই চুক্তিতে ইসরায়েলের স্বার্থকে বিন্দুমাত্র পাত্তাই দেওয়া হয়নি।

সেরি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যুদ্ধের একটা লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। ইরানের পরমাণু বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি দূর করা যায়নি, ইরানের শাসনব্যবস্থা উপড়ে ফেলার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে এবং হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুথিদের প্রতি ইরানের সমর্থনও বন্ধ করা যায়নি। উল্টো ট্রাম্প ইসরায়েল ও নেতানিয়াহুকে বিশ্বমঞ্চে গণমাধ্যমের সামনে চরমভাবে অপদস্থ ও অপমান করেছেন।

দখলদার ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের এই স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম প্রতিরোধ ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সামনে ইহুদিবাদী আগ্রাসন আজ কতটা কোণঠাসা এবং তাদের তথাকথিত পশ্চিমা মিত্রদের কাছেও তারা কতটা মূল্যহীন।

বিষয় : ইসরায়েল

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬


ওয়াশিংটন-তেহরান চুক্তিতে কোণঠাসা ইসরায়েল, নেতানিয়াহুকে ‘ব্যর্থ ও মিথ্যাবাদী’ বলছেন দেশটির বিশ্লেষকরা

প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬

featured Image

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া আকস্মিক যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা চুক্তি থেকে সম্পূর্ণ বাদ পড়ে চরম আন্তর্জাতিক অবমাননার শিকার হয়েছেন ইহুদিবাদী ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। খোদ ইসরায়েলের শীর্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গণমাধ্যমগুলো নেতানিয়াহুকে "মিথ্যাবাদী", "প্রতারক" এবং "ব্যর্থতার প্রধান কারিগর" বলে আখ্যায়িত করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেল আবিবকে পাশ কাটিয়ে এই চুক্তি সম্পন্ন করার মাধ্যমে নেতানিয়াহুকে চরমভাবে জুতোপেটা ও অপমান করেছেন বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলি বোদ্ধারা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক নিয়ে ইসরায়েলের ভেতরে তৈরি হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ভূমিকম্প। গত সোমবার রাতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেই স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যে ডিজিটাল চুক্তি সই হয়েছে, তার ভেতরের কোনো বিবরণই তিনি জানতেন না। এই ঘটনাকে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় "কৌশলগত ও কূটনৈতিক পরাজয়" হিসেবে দেখছেন দেশটির বিশ্লেষকরা।

ব্যর্থতার কারিগর ও মিথ্যার বেসাতি

ইসরায়েলের প্রভাবশালী দৈনিক হারেৎজ (Haaretz)-এ প্রখ্যাত বিশ্লেষক ইয়োসি ভের্টার নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করে একটি নিবন্ধ লিখেছেন, যার শিরোনাম— "লজ্জাহীনভাবে ব্যর্থতার কারিগর দাবি করছেন তিনি ইসরায়েলকে গণমৃত্যু থেকে বাঁচিয়েছেন.. এটি তার অসংখ্য মিথ্যার মধ্যে আরেকটি নতুন মিথ্যা।"

ভের্টার লিখেছেন, নেতানিয়াহু গত ত্রিশ বছর ধরে একই রেকর্ডের মতো বাজিয়ে যাচ্ছেন যে, তিনি ক্ষমতায় থাকলে ইরান পরমাণু অস্ত্র পাবে না। অথচ আজ ইসরায়েলকে চরম এক ব্যর্থতার চূড়ায় এনে দাঁড় করিয়েছেন। ইরান, পাকিস্তান এমনকি কাতারের মতো দেশগুলো যে চুক্তির বিষয়ে আগে থেকে সব জানত, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হয়েও নেতানিয়াহু তা জানতেন না। ট্রাম্পের সাথে সম্পর্ক নিয়ে মিথ্যাচার করছেন তিনি। ট্রাম্প তাকে নিয়মিত গালিগালাজ ও অপমান করছেন, যা ঘরের সবচেয়ে ভালো পরিবারেও ঘটে না।

নেতানিয়াহুর দাবি ছিল, ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ইরানের ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করেছে। কিন্তু ভের্টার এই দাবিকে নাকচ করে বলেন, নেতানিয়াহু এই সত্যটি আড়াল করছেন যে, এই চুক্তির ফলে ইরানের অবরুদ্ধ শত শত কোটি ডলারের তহবিল মুক্ত হবে এবং নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় ইরান দ্রুত অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হবে। ভের্টারের মতে, নেতানিয়াহুর সংবাদ সম্মেলন থেকে পরাজয়ের চরম হতাশা প্রকাশ পেয়েছে।

নেতানিয়াহুর সার্কাস শেষ, ট্রাম্প তাকে বাসের নিচে ফেলে দিয়েছেন

অপরদিকে, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম معاريف (Maariv)-এ কলামিস্ট বেন কাস্পিত লিখেছেন, "নেতানিয়াহুর শো বা সার্কাস শেষ হয়েছে; ট্রাম্প তাকে চলন্ত বাসের নিচে ফেলে দিয়েছেন।"

বেন কাস্পিত প্রশ্ন তোলেন, নেতানিয়াহু বারবার ভীতি ছড়াচ্ছেন যে আমরা নিশ্চিত ধ্বংস বা গণহত্যা থেকে বেঁচে গেছি। কিন্তু ইসরায়েলকে এই খাদের কিনারায় নিয়ে এলো কে? এই ভীতি প্রদর্শন আসলে ইরানের বিরুদ্ধে তার চরম ব্যর্থতা এবং ২০২৪ সাল থেকে গাজায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICC) যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ার দায় এড়ানোর অপচেষ্টা মাত্র। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির মতোই এবারও নেতানিয়াহুকে দরজার বাইরে অবাধ্য শিশুর মতো দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। ইরান এখন হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করবে, শুল্ক আদায় করবে এবং তেল বিক্রি করে আরও শক্তিশালী হবে, সেখানে ইসরায়েলের সাময়িক ক্ষতি সাধন কোনো কাজেই আসবে না।

ইতিহাসের নিকৃষ্টতম অবমাননা

রাজনৈতিক বিশ্লেষক বারাক সেরি হিব্রু ওয়েবসাইট ওয়ালা (Walla)-এ লিখেছেন, নেতানিয়াহুর সমস্ত অহংকার মাত্র একদিনে চরম উদ্বেগ ও নিকৃষ্টতম অপমানে পরিণত হয়েছে। গত মার্চ মাস থেকে হিজবুল্লাহর রকেট হামলায় ইসরায়েলিদের মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির মুখেও যিনি দেশের গণমাধ্যমে মুখ দেখাননি, তিনি গতকাল তাড়াহুড়ো করে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। কারণ ট্রাম্পের এই চুক্তিতে ইসরায়েলের স্বার্থকে বিন্দুমাত্র পাত্তাই দেওয়া হয়নি।

সেরি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যুদ্ধের একটা লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। ইরানের পরমাণু বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি দূর করা যায়নি, ইরানের শাসনব্যবস্থা উপড়ে ফেলার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে এবং হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুথিদের প্রতি ইরানের সমর্থনও বন্ধ করা যায়নি। উল্টো ট্রাম্প ইসরায়েল ও নেতানিয়াহুকে বিশ্বমঞ্চে গণমাধ্যমের সামনে চরমভাবে অপদস্থ ও অপমান করেছেন।

দখলদার ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের এই স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম প্রতিরোধ ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সামনে ইহুদিবাদী আগ্রাসন আজ কতটা কোণঠাসা এবং তাদের তথাকথিত পশ্চিমা মিত্রদের কাছেও তারা কতটা মূল্যহীন।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ