সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
কওমী টাইমস

কারবালার শিক্ষা হোক ধৈর্য ও সুন্নতের অনুসরণ। শোকের নামে বিলাপ, মাতম ও তাজিয়া মিছিলের মতো বিদআতী সংস্কৃতি বর্জন করে খাঁটি তাওহীদের পথে ফিরে আসুন

কারবালার শিক্ষা ও শরীয়তের বিধান: মাতম ও তাজিয়া মিছিল প্রথার অসারতা



কারবালার শিক্ষা ও শরীয়তের বিধান: মাতম ও তাজিয়া মিছিল প্রথার অসারতা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের প্রায় ৫০ বছর পর ৬১ হিজরীর ১০ মুহাররমে কারবালার ময়দানে হযরত হুসাইন রাযি.-এর শাহাদাতের ঘটনা উম্মতের জন্য এক বিশাল ইমতিহান ও মুসিবত। এই ঐতিহাসিক ও বেদনাদায়ক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসলামে নতুন কোনো ফযীলত বা বিধান আবিষ্কার করার কোনো সুযোগ নেই। দুঃখ ও কষ্টের সময় উম্মতের একমাত্র দায়িত্ব হলো আল্লাহর দরবারে ‘সবর’ বা ধৈর্য ধারণ করা। শরীয়তের পূর্ণাঙ্গ বিধি-বিধান লঙ্ঘন করে মাতম, বিলাপ ও তাজিয়া তৈরি করার মতো বিদআতী ও শিরকী প্রথা থেকে মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

ইসলামের ইতিহাসে কারবালার প্রান্তরে হযরত হুসাইন রাযি.-এর শাহাদাত নিঃসন্দেহে তাঁর উঁচু মাকাম ও উচ্চ মর্যাদার পরিচয় বহন করে। তবে এই ঘটনা উম্মতের জন্য এক মহা পরীক্ষা। মানুষ এই বেদনাদায়ক ইতিহাস কখনো ভুলতে পারে না। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের আগেই মহান আল্লাহ তাআলা দ্বীন ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা সংরক্ষিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। সুতরাং, ইসলামের পবিত্র শরীয়তে নতুন কোনো হুকুম সংযোজন বা বিয়োজনের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর সংঘটিত কোনো আনন্দের বা দুঃখের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো ইবাদত বা বিধান তৈরি করা স্পষ্ট বিদআত ও গোমরাহী, যার শেষ ঠিকানা জাহান্নাম।

ইসলামে দুঃখ ও আনন্দ উভয়েরই সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। মুসিবতের সময় একজন মুমিনের করণীয় কী, তা পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। সূরা বাকারার ১৫৪-১৫৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন যে, যারা আল্লাহর পথে শহীদ হন তারা জীবিত। আল্লাহ মানুষকে ভয়, ক্ষুধা ও জান-মালের ক্ষতি দিয়ে পরীক্ষা করেন এবং এমন পরিস্থিতিতে যারা ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়ে ধৈর্য ধারণ করে, তাদের জন্যই আল্লাহর বিশেষ দয়া ও হিদায়াত রয়েছে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের একাধিক হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, কারো ইনতিকালে চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরা এবং মন উথাল-পাথাল হওয়া মানুষের স্বভাবজাত ও রহমতের অংশ। কিন্তু হাত ও মুখ ব্যবহার করে বিলাপ করা, শয়তানের কাজ।

দুর্ভাগ্যবশত, শরীয়তের এই শাশ্বত বিধান লঙ্ঘন করে শিয়া সম্প্রদায় হযরত হুসাইন রাযি.-এর শাহাদাতের দিনটিকে মাতমের দিন বানিয়ে নিয়েছে। ইসলামে তিন দিনের বেশি শোক পালন নিষিদ্ধ (কেবল স্ত্রীর জন্য স্বামীর মৃত্যুর ইদ্দত ব্যতীত)। ইতিহাস সাক্ষী, হযরত হুসাইন রাযি.-এর শাহাদাতের পর প্রায় ৩০০ বছর পর্যন্ত এই মাতম বা বুক চাপড়ানোর কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

সর্বপ্রথম ৩৫২ হিজরীতে বাগদাদের শিয়া শাসক মুঈযযুদ দাওলা দাইলামী এবং পরবর্তীতে ৩৬৩ হিজরীতে মিশরের ফাতিমী শাসক এই মাতম প্রথার সরকারি নির্দেশ জারি করে, যা বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনুল আসীর রচিত ‘আল-কামেল ফিত তারীখ’ (৭/২৭৯), ইবনে কাসীর রচিত ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ (১৫/২৬১) এবং মাওলানা হাবীবুর রহমান আযমী রচিত ‘ইবতালে আযাদারী’ গ্রন্থে এই প্রথা চালুর সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক বিবরণ রয়েছে। এমনকি আমীর আলী শিয়া-র বিখ্যাত গ্রন্থ ‘স্পিরিট অফ ইসলাম’ এবং ‘হিস্ট্রি অফ দ্য সারাসেনস’ সহ শিয়া ইতিহাসবিদ শাকির হুসাইন নাকভীর ‘মুজাহিদে আযম’ গ্রন্থেও স্বীকার করা হয়েছে যে, মুঈযযুদ দাওলাই আশুরার দিনটিকে প্রথম মাতমের দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

এর চেয়েও ভয়াবহ হলো ‘তাজিয়া’ প্রথা, যা শাহাদাতের প্রায় এক হাজার বছর পর তৈরি হওয়া একটি শিরকী প্রথা। ইসলামের ইতিহাসে কারবালার ট্র্যাজেডি রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তবে শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী, স্বয়ং নবী করীম (সা.)-এর ইনতিকাল কিংবা হযরত আলী (রাযি.)-এর শাহাদাতের মতো মহিমান্বিত ও বেদনাদায়ক দিনেও ইসলামে বাৎসরিক মাতম বা শোক মিছিলের কোনো দৃষ্টান্ত নেই। ফলে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের যুগে রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে যে প্রথার জন্ম হয়েছিল, তা আজ ধর্মীয় রূপ ধারণ করেছে।

তাওহীদে বিশ্বাসী কোনো মুসলমান এই তাজিয়া মিছিলে অংশ নিতে পারে না। অতএব, কারবালার প্রকৃত শিক্ষা বুকে ধারণ করে সব ধরনের বিদআত ও জাহিলী প্রথা বর্জন করে সুন্নাহর আলোকেই জীবন পরিচালনা করা প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব।

বিষয় : কারবালা মুহাররম তাজিয়া

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬


কারবালার শিক্ষা ও শরীয়তের বিধান: মাতম ও তাজিয়া মিছিল প্রথার অসারতা

প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬

featured Image

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের প্রায় ৫০ বছর পর ৬১ হিজরীর ১০ মুহাররমে কারবালার ময়দানে হযরত হুসাইন রাযি.-এর শাহাদাতের ঘটনা উম্মতের জন্য এক বিশাল ইমতিহান ও মুসিবত। এই ঐতিহাসিক ও বেদনাদায়ক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসলামে নতুন কোনো ফযীলত বা বিধান আবিষ্কার করার কোনো সুযোগ নেই। দুঃখ ও কষ্টের সময় উম্মতের একমাত্র দায়িত্ব হলো আল্লাহর দরবারে ‘সবর’ বা ধৈর্য ধারণ করা। শরীয়তের পূর্ণাঙ্গ বিধি-বিধান লঙ্ঘন করে মাতম, বিলাপ ও তাজিয়া তৈরি করার মতো বিদআতী ও শিরকী প্রথা থেকে মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

ইসলামের ইতিহাসে কারবালার প্রান্তরে হযরত হুসাইন রাযি.-এর শাহাদাত নিঃসন্দেহে তাঁর উঁচু মাকাম ও উচ্চ মর্যাদার পরিচয় বহন করে। তবে এই ঘটনা উম্মতের জন্য এক মহা পরীক্ষা। মানুষ এই বেদনাদায়ক ইতিহাস কখনো ভুলতে পারে না। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের আগেই মহান আল্লাহ তাআলা দ্বীন ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা সংরক্ষিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। সুতরাং, ইসলামের পবিত্র শরীয়তে নতুন কোনো হুকুম সংযোজন বা বিয়োজনের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর সংঘটিত কোনো আনন্দের বা দুঃখের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো ইবাদত বা বিধান তৈরি করা স্পষ্ট বিদআত ও গোমরাহী, যার শেষ ঠিকানা জাহান্নাম।

ইসলামে দুঃখ ও আনন্দ উভয়েরই সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। মুসিবতের সময় একজন মুমিনের করণীয় কী, তা পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। সূরা বাকারার ১৫৪-১৫৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন যে, যারা আল্লাহর পথে শহীদ হন তারা জীবিত। আল্লাহ মানুষকে ভয়, ক্ষুধা ও জান-মালের ক্ষতি দিয়ে পরীক্ষা করেন এবং এমন পরিস্থিতিতে যারা ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়ে ধৈর্য ধারণ করে, তাদের জন্যই আল্লাহর বিশেষ দয়া ও হিদায়াত রয়েছে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের একাধিক হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, কারো ইনতিকালে চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরা এবং মন উথাল-পাথাল হওয়া মানুষের স্বভাবজাত ও রহমতের অংশ। কিন্তু হাত ও মুখ ব্যবহার করে বিলাপ করা, শয়তানের কাজ।

দুর্ভাগ্যবশত, শরীয়তের এই শাশ্বত বিধান লঙ্ঘন করে শিয়া সম্প্রদায় হযরত হুসাইন রাযি.-এর শাহাদাতের দিনটিকে মাতমের দিন বানিয়ে নিয়েছে। ইসলামে তিন দিনের বেশি শোক পালন নিষিদ্ধ (কেবল স্ত্রীর জন্য স্বামীর মৃত্যুর ইদ্দত ব্যতীত)। ইতিহাস সাক্ষী, হযরত হুসাইন রাযি.-এর শাহাদাতের পর প্রায় ৩০০ বছর পর্যন্ত এই মাতম বা বুক চাপড়ানোর কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

সর্বপ্রথম ৩৫২ হিজরীতে বাগদাদের শিয়া শাসক মুঈযযুদ দাওলা দাইলামী এবং পরবর্তীতে ৩৬৩ হিজরীতে মিশরের ফাতিমী শাসক এই মাতম প্রথার সরকারি নির্দেশ জারি করে, যা বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনুল আসীর রচিত ‘আল-কামেল ফিত তারীখ’ (৭/২৭৯), ইবনে কাসীর রচিত ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ (১৫/২৬১) এবং মাওলানা হাবীবুর রহমান আযমী রচিত ‘ইবতালে আযাদারী’ গ্রন্থে এই প্রথা চালুর সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক বিবরণ রয়েছে। এমনকি আমীর আলী শিয়া-র বিখ্যাত গ্রন্থ ‘স্পিরিট অফ ইসলাম’ এবং ‘হিস্ট্রি অফ দ্য সারাসেনস’ সহ শিয়া ইতিহাসবিদ শাকির হুসাইন নাকভীর ‘মুজাহিদে আযম’ গ্রন্থেও স্বীকার করা হয়েছে যে, মুঈযযুদ দাওলাই আশুরার দিনটিকে প্রথম মাতমের দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

এর চেয়েও ভয়াবহ হলো ‘তাজিয়া’ প্রথা, যা শাহাদাতের প্রায় এক হাজার বছর পর তৈরি হওয়া একটি শিরকী প্রথা। ইসলামের ইতিহাসে কারবালার ট্র্যাজেডি রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তবে শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী, স্বয়ং নবী করীম (সা.)-এর ইনতিকাল কিংবা হযরত আলী (রাযি.)-এর শাহাদাতের মতো মহিমান্বিত ও বেদনাদায়ক দিনেও ইসলামে বাৎসরিক মাতম বা শোক মিছিলের কোনো দৃষ্টান্ত নেই। ফলে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের যুগে রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে যে প্রথার জন্ম হয়েছিল, তা আজ ধর্মীয় রূপ ধারণ করেছে।

তাওহীদে বিশ্বাসী কোনো মুসলমান এই তাজিয়া মিছিলে অংশ নিতে পারে না। অতএব, কারবালার প্রকৃত শিক্ষা বুকে ধারণ করে সব ধরনের বিদআত ও জাহিলী প্রথা বর্জন করে সুন্নাহর আলোকেই জীবন পরিচালনা করা প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ