বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬
বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬
কওমী টাইমস

সব কাগজ থাকার পরও আমাদের ঘর-মসজিদ ভাঙা হলো। আমাদের কান্না শোনার কেউ নেই। চোখের পানি আর প্রতিরোধ উপেক্ষা করে রাজস্থানে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো মুসলিম ও আদিবাসীদের বসতভিটা।

রাজস্থানে সীমান্তে মুসলিম ও আদিবাসী বসতিতে বুলডোজার আতঙ্ক: মসজিদ-মাদ্রাসার পর ভাঙা হলো ভিটেমাটি



রাজস্থানে সীমান্তে মুসলিম ও আদিবাসী বসতিতে বুলডোজার আতঙ্ক: মসজিদ-মাদ্রাসার পর ভাঙা হলো ভিটেমাটি

ভারতের রাজস্থান রাজ্যের পাকিস্তান সীমান্তবর্তী বারমের জেলায় ‘অপারেশন ক্লিন’-এর নামে মুসলিম ও ভিল আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, মসজিদ এবং মাদ্রাসা উচ্ছেদ করেছে প্রশাসন। ২৫ জুন প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও ভিডিওতে দেখা যায়, তীব্র প্রতিরোধ ও চোখের জল উপেক্ষা করে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষের শেষ সম্বল। প্রশাসনের দাবি, এগুলো 'অবৈধ দখলদারিত্ব', তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক মেরুকরণের অংশ হিসেবেই বেছে বেছে এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে।

ভারতের রাজস্থান রাজ্যে পাকিস্তান সীমান্তবর্তী ১৫ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে কথিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ‘অপারেশন ক্লিন’ শুরু করেছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি নিয়ন্ত্রিত প্রশাসন। গত এক সপ্তাহ ধরে চলা এই অভিযানের মূল লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে স্থানীয় সংখ্যালঘু মুসলিম এবং পিছিয়ে পড়া ভিল আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ও ধর্মীয় উপাসনালয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি হৃদয়বিদারক ভিডিওতে দেখা যায়, বারমের জেলার এক তরুণী ভিল আদিবাসী নারী নিজের আধা-পাকা ঘরের ভেতর বসে বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। নারী পুলিশ সদস্যরা তাকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে ঘর থেকে বের করার চেষ্টা করলেও তিনি মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাকে নির্মমভাবে টেনে বের করে এনে তার একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁইটি চোখের পলকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। অন্য আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, অসহায় নারী ও শিশুরা কর্মকর্তাদের সামনে হাত জোড় করে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন এবং তাদের ঘরবাড়ি না ভাঙার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন। কিন্তু প্রশাসনের নিষ্ঠুর কর্মকর্তাদের মনে সেই কান্না কোনো দাগ কাটতে পারেনি।

আইনি বৈধতা সত্ত্বেও উচ্ছেদ

প্রশাসনের এই আগ্রাসনের শিকার হয়েছে ওই অঞ্চলের বহু বছরের পুরনো মসজিদ ও মাদ্রাসা। ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় জয়সিন্ধর গ্রাম পঞ্চায়েতের আওতাধীন একটি মসজিদ ও মাদ্রাসা মাত্র একদিনের নোটিশে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

মাদ্রাসার দায়িত্বে থাকা মৌলভি হাসাম খান জানান, মাদ্রাসাটি ২০০৯ সাল থেকে এবং মসজিদটি প্রায় দুই বছর আগে নির্মিত হয়েছিল। পূর্ববর্তী কংগ্রেস সরকারের আমলে সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী সালেহ মোহাম্মদ এই মাদ্রাসার ভবন নির্মাণের জন্য ১৫ লাখ রুপি সরকারি অনুদানও দিয়েছিলেন। হাসাম খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,

"যখন মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এই জমি আবাসিক (আবাদী) হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ ছিল। জয়সিন্ধর গ্রাম পঞ্চায়েত এবং গাদরা রোড পঞ্চায়েত সমিতি—উভয় কর্তৃপক্ষই এই মাদ্রাসার নামে বৈধ লিজ বা ইজারা দলিল ইস্যু করেছিল। সমস্ত বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন এটিকে অবৈধ তকমা দিয়ে ভেঙে ফেলেছে।"

রাজনৈতিক মেরুকরণ

বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও এভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রান্তিক মানুষের ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলার এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন রাজস্থানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অশোক গেহলট।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স (টুইটার)-এ একটি পোস্টে তিনি বলেন, রাজস্থানের এই সীমান্ত অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে সব সম্প্রদায়ের মানুষ পরম শান্তিতে ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাথে বসবাস করে আসছে। তিনি বর্তমান বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে লেখেন,

"সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এবং কেন্দ্রে বসা উগ্রপন্থী শক্তির ইশারায় এই অঞ্চলে উত্তেজনা ও মেরুকরণ তৈরির লক্ষ্যেই বেছে বেছে মসজিদ, মাদ্রাসা এবং সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের টার্গেট করা হচ্ছে। এই ধরণের পদক্ষেপ অত্যন্ত অনুচিত এবং নিন্দনীয়।"

বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত সুরক্ষার অজুহাত তুলে মূলত উগ্র হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় মুসলিম ও অনগ্রসর উপজাতিদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতেই এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে, যা স্পষ্টতই মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬


রাজস্থানে সীমান্তে মুসলিম ও আদিবাসী বসতিতে বুলডোজার আতঙ্ক: মসজিদ-মাদ্রাসার পর ভাঙা হলো ভিটেমাটি

প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুলাই ২০২৬

featured Image

ভারতের রাজস্থান রাজ্যের পাকিস্তান সীমান্তবর্তী বারমের জেলায় ‘অপারেশন ক্লিন’-এর নামে মুসলিম ও ভিল আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, মসজিদ এবং মাদ্রাসা উচ্ছেদ করেছে প্রশাসন। ২৫ জুন প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও ভিডিওতে দেখা যায়, তীব্র প্রতিরোধ ও চোখের জল উপেক্ষা করে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষের শেষ সম্বল। প্রশাসনের দাবি, এগুলো 'অবৈধ দখলদারিত্ব', তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক মেরুকরণের অংশ হিসেবেই বেছে বেছে এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে।

ভারতের রাজস্থান রাজ্যে পাকিস্তান সীমান্তবর্তী ১৫ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে কথিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ‘অপারেশন ক্লিন’ শুরু করেছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি নিয়ন্ত্রিত প্রশাসন। গত এক সপ্তাহ ধরে চলা এই অভিযানের মূল লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে স্থানীয় সংখ্যালঘু মুসলিম এবং পিছিয়ে পড়া ভিল আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ও ধর্মীয় উপাসনালয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি হৃদয়বিদারক ভিডিওতে দেখা যায়, বারমের জেলার এক তরুণী ভিল আদিবাসী নারী নিজের আধা-পাকা ঘরের ভেতর বসে বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। নারী পুলিশ সদস্যরা তাকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে ঘর থেকে বের করার চেষ্টা করলেও তিনি মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাকে নির্মমভাবে টেনে বের করে এনে তার একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁইটি চোখের পলকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। অন্য আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, অসহায় নারী ও শিশুরা কর্মকর্তাদের সামনে হাত জোড় করে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন এবং তাদের ঘরবাড়ি না ভাঙার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন। কিন্তু প্রশাসনের নিষ্ঠুর কর্মকর্তাদের মনে সেই কান্না কোনো দাগ কাটতে পারেনি।

আইনি বৈধতা সত্ত্বেও উচ্ছেদ

প্রশাসনের এই আগ্রাসনের শিকার হয়েছে ওই অঞ্চলের বহু বছরের পুরনো মসজিদ ও মাদ্রাসা। ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় জয়সিন্ধর গ্রাম পঞ্চায়েতের আওতাধীন একটি মসজিদ ও মাদ্রাসা মাত্র একদিনের নোটিশে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

মাদ্রাসার দায়িত্বে থাকা মৌলভি হাসাম খান জানান, মাদ্রাসাটি ২০০৯ সাল থেকে এবং মসজিদটি প্রায় দুই বছর আগে নির্মিত হয়েছিল। পূর্ববর্তী কংগ্রেস সরকারের আমলে সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী সালেহ মোহাম্মদ এই মাদ্রাসার ভবন নির্মাণের জন্য ১৫ লাখ রুপি সরকারি অনুদানও দিয়েছিলেন। হাসাম খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,

"যখন মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এই জমি আবাসিক (আবাদী) হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ ছিল। জয়সিন্ধর গ্রাম পঞ্চায়েত এবং গাদরা রোড পঞ্চায়েত সমিতি—উভয় কর্তৃপক্ষই এই মাদ্রাসার নামে বৈধ লিজ বা ইজারা দলিল ইস্যু করেছিল। সমস্ত বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন এটিকে অবৈধ তকমা দিয়ে ভেঙে ফেলেছে।"

রাজনৈতিক মেরুকরণ

বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও এভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রান্তিক মানুষের ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলার এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন রাজস্থানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অশোক গেহলট।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স (টুইটার)-এ একটি পোস্টে তিনি বলেন, রাজস্থানের এই সীমান্ত অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে সব সম্প্রদায়ের মানুষ পরম শান্তিতে ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাথে বসবাস করে আসছে। তিনি বর্তমান বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে লেখেন,

"সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এবং কেন্দ্রে বসা উগ্রপন্থী শক্তির ইশারায় এই অঞ্চলে উত্তেজনা ও মেরুকরণ তৈরির লক্ষ্যেই বেছে বেছে মসজিদ, মাদ্রাসা এবং সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের টার্গেট করা হচ্ছে। এই ধরণের পদক্ষেপ অত্যন্ত অনুচিত এবং নিন্দনীয়।"

বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত সুরক্ষার অজুহাত তুলে মূলত উগ্র হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় মুসলিম ও অনগ্রসর উপজাতিদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতেই এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে, যা স্পষ্টতই মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ