ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি আগ্রাসন হাজার হাজার পরিবারের জীবন ও স্বপ্নকে পুরোপুরি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের একটি আশ্রয়শিবিরে ৬ সন্তান এবং আহত স্বামীকে নিয়ে বেঁচে থাকার আকুল সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছেন উইসাল আবু হাতাব নামের এক ইংরেজি শিক্ষিকা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে কোমলমতি শিশুদের শিক্ষাদানের পেশা ছেড়ে তাকে বেছে নিতে হয়েছে মাটির চুলোয় রুটি বানানোর কঠোর পরিশ্রম।
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষা শেখানো এবং একটি নতুন প্রজন্মকে সুশিক্ষায় গড়ে তোলাই ছিল তার স্বপ্ন। কিন্তু দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন হামলায় থমকে গেছে গাজার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, ধ্বংস হয়েছে হাজারও পরিবারের ভবিষ্য়ত। সেই নির্মম বাস্তবতার শিকার হয়ে আজ শ্রেণিকক্ষের চাট-চক ছেড়ে মাটির চুলোর উত্তাপ সহ্য করছেন গাজার শিক্ষিকা উইসাল আবু হাতাব।
দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের একটি স্কুলে গড়ে ওঠা শরণার্থী শিবিরে পরিবারসহ আশ্রয় নিয়েছেন উইসাল। ইসরায়েলি হামলায় তার স্বামী গুরুতর আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। ঘরে ৬টি ছোট ছোট সন্তান, যাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মতো কেউ নেই। বাধ্য হয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে এবং সন্তানদের ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে আশ্রয়শিবিরের পাশে একটি তাঁবুতে মাটির চুলো বানিয়ে রুটি বিক্রির কাজ শুরু করেছেন এই শিক্ষিকা।
নিজের জীবনের এই মর্মান্তিক পরিবর্তন সম্পর্কে উইসাল আবু হাতাব বলেন, "যুদ্ধের আগে আমি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সাথে সময় কাটাতাম, নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতাম। আর আজ কাজের এপ্রোন পরে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত—টানা ১২-১৩ ঘণ্টা মাটির চুলোর পাশে দাঁড়িয়ে রুটি সেঁকি।"
গাজায় জ্বালানি ও রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ এখন ইলেকট্রিক বা গ্যাস ওভেনের বদলে উইসালের এই মাটির চুলোর ওপর নির্ভর করছেন। কেবল রুটি তৈরিই নয়, অনেকে নিজেদের রাতের বা দুপুরের খাবারটুকুও রান্না করতে নিয়ে আসছেন তার এই অস্থায়ী চুলোয়।
তবে এই কাজ চালানোও সহজ নয়। অবরুদ্ধ গাজায় জ্বালানির বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। উইসাল জানান, চুলো জ্বালানোর জন্য তিনি সবজির কাগজ বা শক্ত পিচবোর্ড (কার্টন) ব্যবহার করেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবরোধের কারণে গাজায় সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের প্রবেশ সীমিত থাকায় এখন সেই কাগজ কুড়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
উইসাল আক্ষেপ করে বলেন, "সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আগুনের পাশে বসে রুটি আর খাবার তৈরি করি। কাজ শেষে আশ্রয় নেওয়া ক্লাসরুমের দৈনন্দিন কাজ সারতেই দিন শেষ হয়ে যায়। সন্তানদের একটু সময়ও দিতে পারি না, শুধু তাদের পেট ভরানোই এখন আমার প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
আকাশে সার্বক্ষণিক যুদ্ধবিমানের গর্জন আর অবিরাম হামলার ভয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, "যেকোনো মুহূর্তে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এই তো কিছুক্ষণ আগেই আমাদের একদম কাছে একটি বিমান হামলা হয়েছে, বেশ কয়েকজন শহীদ হয়েছেন। প্রতিদিন সকালে ট্যাংকের গর্জনে আমাদের ঘুম ভাঙে। গাজায় রক্তপাত ও যুদ্ধ কখনোই থামেনি।"
বিশ্ববাসীর প্রতি ব্যাকুল আকুতি জানিয়ে এই ফিলিস্তিনি নারী ও শিক্ষিকা আহ্বান জানান, "অনতিবিলম্বে গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা ও এই নৃশংস যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিন।"
বিষয় : ফিলিস্তিন

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুলাই ২০২৬
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি আগ্রাসন হাজার হাজার পরিবারের জীবন ও স্বপ্নকে পুরোপুরি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের একটি আশ্রয়শিবিরে ৬ সন্তান এবং আহত স্বামীকে নিয়ে বেঁচে থাকার আকুল সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছেন উইসাল আবু হাতাব নামের এক ইংরেজি শিক্ষিকা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে কোমলমতি শিশুদের শিক্ষাদানের পেশা ছেড়ে তাকে বেছে নিতে হয়েছে মাটির চুলোয় রুটি বানানোর কঠোর পরিশ্রম।
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষা শেখানো এবং একটি নতুন প্রজন্মকে সুশিক্ষায় গড়ে তোলাই ছিল তার স্বপ্ন। কিন্তু দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন হামলায় থমকে গেছে গাজার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, ধ্বংস হয়েছে হাজারও পরিবারের ভবিষ্য়ত। সেই নির্মম বাস্তবতার শিকার হয়ে আজ শ্রেণিকক্ষের চাট-চক ছেড়ে মাটির চুলোর উত্তাপ সহ্য করছেন গাজার শিক্ষিকা উইসাল আবু হাতাব।
দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের একটি স্কুলে গড়ে ওঠা শরণার্থী শিবিরে পরিবারসহ আশ্রয় নিয়েছেন উইসাল। ইসরায়েলি হামলায় তার স্বামী গুরুতর আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। ঘরে ৬টি ছোট ছোট সন্তান, যাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মতো কেউ নেই। বাধ্য হয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে এবং সন্তানদের ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে আশ্রয়শিবিরের পাশে একটি তাঁবুতে মাটির চুলো বানিয়ে রুটি বিক্রির কাজ শুরু করেছেন এই শিক্ষিকা।
নিজের জীবনের এই মর্মান্তিক পরিবর্তন সম্পর্কে উইসাল আবু হাতাব বলেন, "যুদ্ধের আগে আমি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সাথে সময় কাটাতাম, নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতাম। আর আজ কাজের এপ্রোন পরে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত—টানা ১২-১৩ ঘণ্টা মাটির চুলোর পাশে দাঁড়িয়ে রুটি সেঁকি।"
গাজায় জ্বালানি ও রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ এখন ইলেকট্রিক বা গ্যাস ওভেনের বদলে উইসালের এই মাটির চুলোর ওপর নির্ভর করছেন। কেবল রুটি তৈরিই নয়, অনেকে নিজেদের রাতের বা দুপুরের খাবারটুকুও রান্না করতে নিয়ে আসছেন তার এই অস্থায়ী চুলোয়।
তবে এই কাজ চালানোও সহজ নয়। অবরুদ্ধ গাজায় জ্বালানির বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। উইসাল জানান, চুলো জ্বালানোর জন্য তিনি সবজির কাগজ বা শক্ত পিচবোর্ড (কার্টন) ব্যবহার করেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবরোধের কারণে গাজায় সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের প্রবেশ সীমিত থাকায় এখন সেই কাগজ কুড়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
উইসাল আক্ষেপ করে বলেন, "সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আগুনের পাশে বসে রুটি আর খাবার তৈরি করি। কাজ শেষে আশ্রয় নেওয়া ক্লাসরুমের দৈনন্দিন কাজ সারতেই দিন শেষ হয়ে যায়। সন্তানদের একটু সময়ও দিতে পারি না, শুধু তাদের পেট ভরানোই এখন আমার প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
আকাশে সার্বক্ষণিক যুদ্ধবিমানের গর্জন আর অবিরাম হামলার ভয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, "যেকোনো মুহূর্তে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এই তো কিছুক্ষণ আগেই আমাদের একদম কাছে একটি বিমান হামলা হয়েছে, বেশ কয়েকজন শহীদ হয়েছেন। প্রতিদিন সকালে ট্যাংকের গর্জনে আমাদের ঘুম ভাঙে। গাজায় রক্তপাত ও যুদ্ধ কখনোই থামেনি।"
বিশ্ববাসীর প্রতি ব্যাকুল আকুতি জানিয়ে এই ফিলিস্তিনি নারী ও শিক্ষিকা আহ্বান জানান, "অনতিবিলম্বে গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা ও এই নৃশংস যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিন।"

আপনার মতামত লিখুন