শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
কওমী টাইমস

ফিলিস্তিনের অবিসংবাদিত কার্টুনিস্ট নাজি আল-আলীর হাত ধরে জন্ম নেওয়া ১০ বছরের বালক ‘হানজালা’ কেবল একটি চিত্রকর্ম নয়; এটি জায়নবাদী আগ্রাসন, বৈশ্বিক নীরবতা ও ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডচ্যুত করার বিরুদ্ধে এক অপরাজেয় প্রতিরোধের প্রতীক

যে নিশ্চুপ শিশু বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছে



যে নিশ্চুপ শিশু বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছে

১৯৪৮ সালের 'নাকবা' বা মহা-বিপর্যয়ের মাধ্যমে নিজের জন্মভূমি থেকে উৎখাত হওয়া ফিলিস্তিনি শিল্পী নাজি সেলিম আল-আলী তাঁর তুলির আঁচড়ে সৃষ্টি করেছিলেন এক কালজয়ী চরিত্র—'হানজালা'। পিঠ ফেরানো, ছেঁড়া কাপড় পরা, খালি পায়ের এই ১০ বছরের বালকটি কোনো দিন বুড়িয়ে যাবে না, যতক্ষণ না ফিলিস্তিন মুক্ত হয়। ইসরায়েলি জায়নবাদী দখলদারিত্ব, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের দ্বিমুখী নীতি এবং অকর্মণ্য আরব শাসকবর্গের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতেই হানজালার মুখ চিরতরে ঘুরিয়ে রাখা হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে লন্ডনে আততায়ীর গুলিতে শহীদ হন নাজি আল-আলী, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট হানজালা আজও বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত মুসলিমদের অধিকার আদায়ের স্লোগান হয়ে বেঁচে আছে।

ভিটামাটি হারানোর বেদনা ও নাকবার ট্র্যাজেডি

১৯৩৮ সালে ফিলিস্তিনের গালিলী (জালিল) অঞ্চলের শেজারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নাজি আল-আলী। সেই সময় শেজারা ছিল মুসলিম, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের এক শান্তিপূর্ণ আবাসস্থল। কিন্তু ১৯৪৮ সালের ১৫ মে ইসরায়েল নামক অবৈধ রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয় 'নাকবা' (মহাবিপর্যয়)।

জায়নবাদী সন্ত্রাসী চক্রগুলো পরিকল্পিতভাবে শত শত ফিলিস্তিনি গ্রাম ধ্বংস করে এবং প্রায় সাড়ে নয় লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে। ১০ বছর বয়সী বালক নাজি আল-আলী ও তাঁর পরিবারকে তাঁদের ভিটেমাটি ছেড়ে লেবাননের আইন আল-হিলওয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে হয়।

ক্যাম্পের দেওয়াল থেকে আন্তর্জাতিক মাধ্যম: প্রতিবাদের জন্ম

শরণার্থী শিবিরের নির্মম বাস্তবতা ও জীর্ণ তাঁবুর জীবন নাজি আল-আলীর চিন্তাজগৎকে গভীর নাড়া দেয়। সেখানে দাঁড়িয়েই তিনি শিবিরের কাঁচা দেওয়ালে নিজের ক্ষোভ ও বেদনার ছবি আঁকা শুরু করেন। পরবর্তীতে কাজের খোঁজে সৌদি আরব গমন এবং বৈরুত একাডেমি অব আর্টসে পড়াশোনা শেষে তিনি পুরোদস্তুর সাংবাদিক ও কার্টুনিস্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ফিলিস্তিনের প্রখ্যাত লেখক ও শহীদ সাংবাদিক গাসসান কানাফানি তাঁর ভেতরের প্রতিভাকে প্রথম আবিষ্কার করেন এবং তাঁকে সংবাদমাধ্যমে কাজের সুযোগ করে দেন।

'হানজালা'র জন্ম: একটি নীরব কিন্তু প্রকম্পিত কণ্ঠস্বর

১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই, কুয়েতের ‘আস-সিয়াসা’ পত্রিকায় প্রথম আত্মপ্রকাশ করে হানজালা।

"হানজালার বয়স সবসময় ১০ বছরই থাকবে—ঠিক যে বয়সে আমি জন্মভূমি ছেড়েছিলাম। ফিলিস্তিনিরা যেদিন স্বদেশে ফিরে যেতে পারবে, হানজালাও সেদিন থেকে বড় হওয়া শুরু করবে।"

— নাজি আল-আলী

  • নামের অর্থ: 'হানজাল' হলো ফিলিস্তিনের একপ্রকার তেঁতো ফল, যা দুঃখ ও সহনশীলতার প্রতীক।
  • মায়ের নাম: নাকবা (মহা-বিপর্যয়)।
  • অবস্থান: পিছন ফিরে দাঁড়ানো, হাত দুটি পেছনে বাঁধা—জায়নবাদী দখলদারিত্ব এবং পশ্চিমা বিশ্বের দ্বিমুখী নীতির বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ।

হানজালার কোনো নির্ধারিত জাতীয়তা ছিল না; সে ছিল নিপীড়িত মানবতা, সিরিয়ায় বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন শিশু কিংবা আফ্রিকার ক্ষুধার্ত শিশুদের প্রতিনিধি।

ইসরায়েলি তোষামোদ ও আরব শাসকদের নপুংসকতার বিরুদ্ধে কলম

নাজি আল-আলী কেবল ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লেখেননি; তিনি কঠোর সমালোচনা করেছেন সেইসব আরব শাসকদের, যারা নিজেদের ক্ষমতার লোভে ফিলিস্তিনিদের রক্ত নিয়ে রাজনীতি করেছে।

ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি (১৯৭৯): মিসর কর্তৃক ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঐতিহাসিক চুক্তিকে তিনি ফিলিস্তিনিদের পিঠে ছুরি মারার শামিল বলে চিহ্নিত করেন।

সাবরা ও শাতিলা গণহত্যা (১৯৮২): লেবাননে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় ৩,০০০ অশ্বেত ফিলিস্তিনি শরণার্থীকে হত্যা করা হলে হানজালার তুলিতে ফুটে ওঠে সেই বিভীষিকা।

অসলো চুক্তি প্রক্রিয়া: ইয়াসির আরাফাত ও আমেরিকার মধ্যস্থতায় চলা তথাকথিত 'শান্তি আলোচনা'কে তিনি ফিলিস্তিন বেচাকেনার প্রতারণা বলে অভিহিত করেছিলেন।

শাহাদাত ও হানজালার অমরত্ব

নাজি আল-আলীর তীক্ষ্ণ ও আপসহীন রূপচিত্র ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং স্বার্থান্বেষী মহলগুলোর ঘুম হারাম করে দিয়েছিল। বিভিন্ন দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে তিনি আশীতিপর দশকে লন্ডনে আশ্রয় নেন।

১৯৮৭ সালের ২২ জুলাই লন্ডনে দৈনিক 'আল-কাবাস' পত্রিকার অফিসের সামনে তাঁকে লক্ষ্য করে আততায়ী গুলি বর্ষণ করে। টানা পাঁচ সপ্তাহ কোমায় থাকার পর ২৯ আগস্ট তিনি শাহাদাত বরণ করেন। নাজি আল-আলীর দৈহিক মৃত্যু হলেও মোসাদের বুলেট হানজালাকে হত্যা করতে পারেনি। আজ গাজা থেকে কাশ্মীর—বিশ্বের যেখানেই অন্যায় ও নিপীড়ন, সেখানেই দেয়ালচিত্রে জেগে ওঠে হানজালা।

বিষয় : ফিলিস্তিন হানজালা

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬


যে নিশ্চুপ শিশু বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছে

প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুলাই ২০২৬

featured Image

১৯৪৮ সালের 'নাকবা' বা মহা-বিপর্যয়ের মাধ্যমে নিজের জন্মভূমি থেকে উৎখাত হওয়া ফিলিস্তিনি শিল্পী নাজি সেলিম আল-আলী তাঁর তুলির আঁচড়ে সৃষ্টি করেছিলেন এক কালজয়ী চরিত্র—'হানজালা'। পিঠ ফেরানো, ছেঁড়া কাপড় পরা, খালি পায়ের এই ১০ বছরের বালকটি কোনো দিন বুড়িয়ে যাবে না, যতক্ষণ না ফিলিস্তিন মুক্ত হয়। ইসরায়েলি জায়নবাদী দখলদারিত্ব, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের দ্বিমুখী নীতি এবং অকর্মণ্য আরব শাসকবর্গের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতেই হানজালার মুখ চিরতরে ঘুরিয়ে রাখা হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে লন্ডনে আততায়ীর গুলিতে শহীদ হন নাজি আল-আলী, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট হানজালা আজও বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত মুসলিমদের অধিকার আদায়ের স্লোগান হয়ে বেঁচে আছে।

ভিটামাটি হারানোর বেদনা ও নাকবার ট্র্যাজেডি

১৯৩৮ সালে ফিলিস্তিনের গালিলী (জালিল) অঞ্চলের শেজারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নাজি আল-আলী। সেই সময় শেজারা ছিল মুসলিম, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের এক শান্তিপূর্ণ আবাসস্থল। কিন্তু ১৯৪৮ সালের ১৫ মে ইসরায়েল নামক অবৈধ রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয় 'নাকবা' (মহাবিপর্যয়)।

জায়নবাদী সন্ত্রাসী চক্রগুলো পরিকল্পিতভাবে শত শত ফিলিস্তিনি গ্রাম ধ্বংস করে এবং প্রায় সাড়ে নয় লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে। ১০ বছর বয়সী বালক নাজি আল-আলী ও তাঁর পরিবারকে তাঁদের ভিটেমাটি ছেড়ে লেবাননের আইন আল-হিলওয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে হয়।

ক্যাম্পের দেওয়াল থেকে আন্তর্জাতিক মাধ্যম: প্রতিবাদের জন্ম

শরণার্থী শিবিরের নির্মম বাস্তবতা ও জীর্ণ তাঁবুর জীবন নাজি আল-আলীর চিন্তাজগৎকে গভীর নাড়া দেয়। সেখানে দাঁড়িয়েই তিনি শিবিরের কাঁচা দেওয়ালে নিজের ক্ষোভ ও বেদনার ছবি আঁকা শুরু করেন। পরবর্তীতে কাজের খোঁজে সৌদি আরব গমন এবং বৈরুত একাডেমি অব আর্টসে পড়াশোনা শেষে তিনি পুরোদস্তুর সাংবাদিক ও কার্টুনিস্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ফিলিস্তিনের প্রখ্যাত লেখক ও শহীদ সাংবাদিক গাসসান কানাফানি তাঁর ভেতরের প্রতিভাকে প্রথম আবিষ্কার করেন এবং তাঁকে সংবাদমাধ্যমে কাজের সুযোগ করে দেন।

'হানজালা'র জন্ম: একটি নীরব কিন্তু প্রকম্পিত কণ্ঠস্বর

১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই, কুয়েতের ‘আস-সিয়াসা’ পত্রিকায় প্রথম আত্মপ্রকাশ করে হানজালা।

"হানজালার বয়স সবসময় ১০ বছরই থাকবে—ঠিক যে বয়সে আমি জন্মভূমি ছেড়েছিলাম। ফিলিস্তিনিরা যেদিন স্বদেশে ফিরে যেতে পারবে, হানজালাও সেদিন থেকে বড় হওয়া শুরু করবে।"

— নাজি আল-আলী

  • নামের অর্থ: 'হানজাল' হলো ফিলিস্তিনের একপ্রকার তেঁতো ফল, যা দুঃখ ও সহনশীলতার প্রতীক।
  • মায়ের নাম: নাকবা (মহা-বিপর্যয়)।
  • অবস্থান: পিছন ফিরে দাঁড়ানো, হাত দুটি পেছনে বাঁধা—জায়নবাদী দখলদারিত্ব এবং পশ্চিমা বিশ্বের দ্বিমুখী নীতির বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ।

হানজালার কোনো নির্ধারিত জাতীয়তা ছিল না; সে ছিল নিপীড়িত মানবতা, সিরিয়ায় বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন শিশু কিংবা আফ্রিকার ক্ষুধার্ত শিশুদের প্রতিনিধি।

ইসরায়েলি তোষামোদ ও আরব শাসকদের নপুংসকতার বিরুদ্ধে কলম

নাজি আল-আলী কেবল ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লেখেননি; তিনি কঠোর সমালোচনা করেছেন সেইসব আরব শাসকদের, যারা নিজেদের ক্ষমতার লোভে ফিলিস্তিনিদের রক্ত নিয়ে রাজনীতি করেছে।

ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি (১৯৭৯): মিসর কর্তৃক ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঐতিহাসিক চুক্তিকে তিনি ফিলিস্তিনিদের পিঠে ছুরি মারার শামিল বলে চিহ্নিত করেন।

সাবরা ও শাতিলা গণহত্যা (১৯৮২): লেবাননে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় ৩,০০০ অশ্বেত ফিলিস্তিনি শরণার্থীকে হত্যা করা হলে হানজালার তুলিতে ফুটে ওঠে সেই বিভীষিকা।

অসলো চুক্তি প্রক্রিয়া: ইয়াসির আরাফাত ও আমেরিকার মধ্যস্থতায় চলা তথাকথিত 'শান্তি আলোচনা'কে তিনি ফিলিস্তিন বেচাকেনার প্রতারণা বলে অভিহিত করেছিলেন।

শাহাদাত ও হানজালার অমরত্ব

নাজি আল-আলীর তীক্ষ্ণ ও আপসহীন রূপচিত্র ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং স্বার্থান্বেষী মহলগুলোর ঘুম হারাম করে দিয়েছিল। বিভিন্ন দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে তিনি আশীতিপর দশকে লন্ডনে আশ্রয় নেন।

১৯৮৭ সালের ২২ জুলাই লন্ডনে দৈনিক 'আল-কাবাস' পত্রিকার অফিসের সামনে তাঁকে লক্ষ্য করে আততায়ী গুলি বর্ষণ করে। টানা পাঁচ সপ্তাহ কোমায় থাকার পর ২৯ আগস্ট তিনি শাহাদাত বরণ করেন। নাজি আল-আলীর দৈহিক মৃত্যু হলেও মোসাদের বুলেট হানজালাকে হত্যা করতে পারেনি। আজ গাজা থেকে কাশ্মীর—বিশ্বের যেখানেই অন্যায় ও নিপীড়ন, সেখানেই দেয়ালচিত্রে জেগে ওঠে হানজালা।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ