দীর্ঘ ১২ বছর পর নিজ জন্মভূমিতে ফিরে এসেছিলেন ৭৫ বছর বয়সী সিরীয় নাগরিক আহমেদ আব্বাস। হাতে সযত্নে রাখা ছিল পরম মমতায় আগলে রাখা ঘরের চাবিটি। কিন্তু উত্তর সিরিয়ার রাক্কা প্রদেশের সালিব গ্রামে পৌঁছানোর পর তাঁর সব আশা-আকাঙ্ক্ষা চুরমার হয়ে যায়। পিকেকে/ওয়াইপিজি (PKK/YPG) সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নৃশংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞে সেখানে না ছিল কোনো ঘর, না ছিল কোনো দরজা—চারিদিকে কেবল ধ্বংসস্তূপ ও মাইনের আঘাত।
সিরিয়ার রাক্কা প্রদেশের সীমান্তঘেঁষা সালিব গ্রামে শৈশব ও জীবনের বহু স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে ছিলেন ৫ সন্তানের জনক ৭৫ বছর বয়সী আহমেদ আব্বাস। প্রায় ১২ বছর আগে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ওয়াইপিজি (YPG)-এর নিপীড়ন ও সহিংসতার মুখে বাধ্য হয়ে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে পরিবারসহ বাস্তুচ্যুত হন তিনি। তবে এই এক যুগের দীর্ঘ নির্বাসনেও তিনি হৃদয়ে লালন করেছিলেন একটিই স্বপ্ন—একদিন নিজের বাড়ি ফিরে যাবেন। সেই বিশ্বাস থেকে ঘরের চাবিটি তিনি পরম যত্নে পকেটে ও হৃদয়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
অবশেষে নিজ গ্রামে ফিরে আসার সুযোগ পেলেও, সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল এক হৃদয়বিদারক বাস্তবতা। আনাদোলু এজেন্সির সাথে আলাপকালে অশ্রুসজল চোখে আহমেদ আব্বাস বলেন, "আমাদের একমাত্র স্বপ্ন ছিল নিজের ঘরে ফিরে যাওয়া। আমরা ভেবেছিলাম ফিরে গিয়ে ঘরবাড়ি যেমন আছে তেমনই পাব—হয়তো একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আর গুছিয়ে নিলেই থাকার যোগ্য হয়ে যাবে। কিন্তু যা দেখলাম, তা আমাদের সব আশা ধ্বংস করে দিয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "আমি বছরের পর বছর ধরে আমার ঘরের চাবিটি যত্ন করে রেখেছিলাম। কিন্তু ফিরে এসে দেখি, ঘর তো দূরের কথা, শুধু ধ্বংসস্তূপ আর দরজার কিছু অবশিষ্ট অংশ পড়ে আছে। আমি আশা করেছিলাম ভাই ও সন্তানদের নিয়ে আবার এই ঘরে ঢুকব, কিন্তু পেয়েছি কেবল ইট-পাথরের স্তূপ।"
গাছের ছায়াও আজ উধাও
আহমেদ আব্বাসের স্মৃতিতে এখনো তাজা ছিল প্রাঙ্গণের সেই আখরোট গাছগুলো, যেগুলোর ছায়ায় তিনি বছরের পর বছর বসে বিশ্রাম নিতেন। কিন্তু আজ সেখানে কোনো গাছের চিহ্নও নেই। পুরো গ্রামের ধ্বংসচিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি জানান, গ্রামটির ৯০ শতাংশেরও বেশি এলাকা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। অধিকাংশ বাড়িঘর খুড়ে ফেলা হয়েছে এবং সেখানে মাইন পুঁতে রেখে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে।
সম্প্রীতির অতীত ও ওয়াইপিজি-এর ধ্বংসযজ্ঞ
গ্রামে এই ভয়াবহ তাণ্ডবের জন্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ওয়াইপিজি-কে সরাসরি দায়ী করেন আব্বাস। এই অঞ্চলে অতীতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ একসাথে শান্তিতে বাস করত উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমরা কুর্দিদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলাম, ভাই ভাই হয়ে শান্তিতে বাস করতাম। আমাদের মধ্যে খুব চমৎকার ও শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্ক ছিল।" কিন্তু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আগমনে সেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তির পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যায়।
মায়ের শেষ আয়নাটির সন্ধান
ধ্বংসস্তূপের মাঝে হাঁটতে হাঁটতে আহমেদ আব্বাস হন্যে হয়ে খুঁজেছিলেন তাঁর মায়ের একটি স্মৃতি—একটি বড় আয়না, যা তাঁর মা-বাবার একমাত্র অবশিষ্ট স্মারক ছিল। এ কথা বলতে গিয়ে নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি এই প্রবীণ।
"আয়নাটি আমার মায়ের রেখে যাওয়া স্মৃতি ছিল, মা-বাবার শেষ চিহ্ন। ফিরে এসে সেটাও আর খুঁজে পাইনি। কেবল ঘর বা গাছপালা নয়, আমি আমার পরিবারের সব স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছি। 'ধ্বংস' শব্দ দিয়ে এই নির্মমতাকে বর্ণনা করা সম্ভব নয়," আকুল কণ্ঠে বলেন আহমেদ আব্বাস।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বাস্তুচ্যুতির এই চিত্র কেবল আহমেদ আব্বাসের একা নয়, বরং সিরিয়ার সংঘাতময় অঞ্চলে ওয়াইপিজির তাণ্ডবে গৃহহীন হওয়া হাজার হাজার সাধারণ মুসলিম পরিবারের এক নির্মম দলিল।
বিষয় : মানবাধিকার সিরিয়া

সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুলাই ২০২৬
দীর্ঘ ১২ বছর পর নিজ জন্মভূমিতে ফিরে এসেছিলেন ৭৫ বছর বয়সী সিরীয় নাগরিক আহমেদ আব্বাস। হাতে সযত্নে রাখা ছিল পরম মমতায় আগলে রাখা ঘরের চাবিটি। কিন্তু উত্তর সিরিয়ার রাক্কা প্রদেশের সালিব গ্রামে পৌঁছানোর পর তাঁর সব আশা-আকাঙ্ক্ষা চুরমার হয়ে যায়। পিকেকে/ওয়াইপিজি (PKK/YPG) সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নৃশংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞে সেখানে না ছিল কোনো ঘর, না ছিল কোনো দরজা—চারিদিকে কেবল ধ্বংসস্তূপ ও মাইনের আঘাত।
সিরিয়ার রাক্কা প্রদেশের সীমান্তঘেঁষা সালিব গ্রামে শৈশব ও জীবনের বহু স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে ছিলেন ৫ সন্তানের জনক ৭৫ বছর বয়সী আহমেদ আব্বাস। প্রায় ১২ বছর আগে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ওয়াইপিজি (YPG)-এর নিপীড়ন ও সহিংসতার মুখে বাধ্য হয়ে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে পরিবারসহ বাস্তুচ্যুত হন তিনি। তবে এই এক যুগের দীর্ঘ নির্বাসনেও তিনি হৃদয়ে লালন করেছিলেন একটিই স্বপ্ন—একদিন নিজের বাড়ি ফিরে যাবেন। সেই বিশ্বাস থেকে ঘরের চাবিটি তিনি পরম যত্নে পকেটে ও হৃদয়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
অবশেষে নিজ গ্রামে ফিরে আসার সুযোগ পেলেও, সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল এক হৃদয়বিদারক বাস্তবতা। আনাদোলু এজেন্সির সাথে আলাপকালে অশ্রুসজল চোখে আহমেদ আব্বাস বলেন, "আমাদের একমাত্র স্বপ্ন ছিল নিজের ঘরে ফিরে যাওয়া। আমরা ভেবেছিলাম ফিরে গিয়ে ঘরবাড়ি যেমন আছে তেমনই পাব—হয়তো একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আর গুছিয়ে নিলেই থাকার যোগ্য হয়ে যাবে। কিন্তু যা দেখলাম, তা আমাদের সব আশা ধ্বংস করে দিয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "আমি বছরের পর বছর ধরে আমার ঘরের চাবিটি যত্ন করে রেখেছিলাম। কিন্তু ফিরে এসে দেখি, ঘর তো দূরের কথা, শুধু ধ্বংসস্তূপ আর দরজার কিছু অবশিষ্ট অংশ পড়ে আছে। আমি আশা করেছিলাম ভাই ও সন্তানদের নিয়ে আবার এই ঘরে ঢুকব, কিন্তু পেয়েছি কেবল ইট-পাথরের স্তূপ।"
গাছের ছায়াও আজ উধাও
আহমেদ আব্বাসের স্মৃতিতে এখনো তাজা ছিল প্রাঙ্গণের সেই আখরোট গাছগুলো, যেগুলোর ছায়ায় তিনি বছরের পর বছর বসে বিশ্রাম নিতেন। কিন্তু আজ সেখানে কোনো গাছের চিহ্নও নেই। পুরো গ্রামের ধ্বংসচিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি জানান, গ্রামটির ৯০ শতাংশেরও বেশি এলাকা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। অধিকাংশ বাড়িঘর খুড়ে ফেলা হয়েছে এবং সেখানে মাইন পুঁতে রেখে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে।
সম্প্রীতির অতীত ও ওয়াইপিজি-এর ধ্বংসযজ্ঞ
গ্রামে এই ভয়াবহ তাণ্ডবের জন্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ওয়াইপিজি-কে সরাসরি দায়ী করেন আব্বাস। এই অঞ্চলে অতীতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ একসাথে শান্তিতে বাস করত উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমরা কুর্দিদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলাম, ভাই ভাই হয়ে শান্তিতে বাস করতাম। আমাদের মধ্যে খুব চমৎকার ও শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্ক ছিল।" কিন্তু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আগমনে সেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তির পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যায়।
মায়ের শেষ আয়নাটির সন্ধান
ধ্বংসস্তূপের মাঝে হাঁটতে হাঁটতে আহমেদ আব্বাস হন্যে হয়ে খুঁজেছিলেন তাঁর মায়ের একটি স্মৃতি—একটি বড় আয়না, যা তাঁর মা-বাবার একমাত্র অবশিষ্ট স্মারক ছিল। এ কথা বলতে গিয়ে নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি এই প্রবীণ।
"আয়নাটি আমার মায়ের রেখে যাওয়া স্মৃতি ছিল, মা-বাবার শেষ চিহ্ন। ফিরে এসে সেটাও আর খুঁজে পাইনি। কেবল ঘর বা গাছপালা নয়, আমি আমার পরিবারের সব স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছি। 'ধ্বংস' শব্দ দিয়ে এই নির্মমতাকে বর্ণনা করা সম্ভব নয়," আকুল কণ্ঠে বলেন আহমেদ আব্বাস।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বাস্তুচ্যুতির এই চিত্র কেবল আহমেদ আব্বাসের একা নয়, বরং সিরিয়ার সংঘাতময় অঞ্চলে ওয়াইপিজির তাণ্ডবে গৃহহীন হওয়া হাজার হাজার সাধারণ মুসলিম পরিবারের এক নির্মম দলিল।

আপনার মতামত লিখুন