শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
কওমী টাইমস

পশ্চিমা রাজনীতিতে ব্যবহৃত ‘ইহুদি-খ্রিস্টান ঐতিহ্য’ মূলত মুসলিমদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার এবং ইসরায়েলের বর্বরতাকে আড়াল করার একটি রাজনৈতিক ফাঁদ—জর্জেটাউন বিশ্ববিদালয়ের গবেষক মোবাশরা তাজাম্মুল।

ইহুদি-খ্রিস্টান মূল্যবোধ: পশ্চিমের এক ইসলামবিদ্বেষী রাজনৈতিক অস্ত্র ও গাজায় গণহত্যার বয়ান



ইহুদি-খ্রিস্টান মূল্যবোধ: পশ্চিমের এক ইসলামবিদ্বেষী রাজনৈতিক অস্ত্র ও গাজায় গণহত্যার বয়ান

পশ্চিমা রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ‘ইহুদি-খ্রিস্টান মূল্যবোধ’ (Judeo-Christian values) ধারণাটিকে একটি যৌথ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে প্রচার করা হলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি একটি চরম বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক সীমানায় পরিণত হয়েছে। জর্জেটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিজেস ইনিশিয়েটিভের সহকারী পরিচালক মোবাশরা তাজাম্মুল এক সাক্ষাৎকারে প্রকাশ করেছেন যে, কীভাবে এই পরিভাষা ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের "সভ্যতার শত্রু" এবং "অভ্যন্তরীণ হুমকি" হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হলো পশ্চিমা সমাজে ইসলামফোবিয়া ছড়িয়ে দেওয়া এবং গাজায় ইসরায়েলের নজিরবিহীন গণহত্যা ও বর্ণবাদী নীতিকে শর্তহীন সমর্থন জোগানো।

পশ্চিমা মিডিয়া ও রাজনীতিতে বহুল ব্যবহৃত ‘ইহুদি-খ্রিস্টান মূল্যবোধ’ কোনো ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কৌশল—যার মাধ্যমে মুসলিমদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদকে বৈধতা দেওয়া হয়। তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ওয়াশিংটন ডিসির জর্জেটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দ্য ব্রিজেস ইনিশিয়েটিভ’ (The Bridge Initiative)-এর উপ-পরিচালক মোবাশরা তাজাম্মুল এই বিস্ফোরক বিশ্লেষণ পেশ করেছেন।

ভাষা যখন বৈষম্য ও হিংসা তৈরির হাতিয়ার

মোবাশরা তাজাম্মুল বলেন, "যেকোনো সমাজ বা ধর্মের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয় ব্যবহৃত ভাষার মাধ্যমে। পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিমদের নিয়ে যে পরিভাষা ও ভাষা ব্যবহার করা হয়, তা মূলত তাদেরকে ‘বিপজ্জনক’, ‘সহিংস’ এবং ‘পশ্চিমা জীবনযাত্রার জন্য হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে ইসলাম ও মুসলিমদের সম্পর্কে একটি গভীর পক্ষপাতদুষ্ট ও ক্ষতিকর ধারণা তৈরি করা হয়েছে।"

তিনি জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চালু হওয়া ‘ইহুদি-খ্রিস্টান মূল্যবোধ’ পরিভাষাটি মুসলিমদের জাতিগত ও ধর্মীয়ভাবে ‘অপর’ বা ‘বহিরাগত’ বানানোর একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। এটি স্যামুয়েল হান্টিংটন ও বার্নার্ড লিউইসের বিতর্কিত ‘সভ্যতার দ্বন্দ্ব’ (Clash of Civilizations) তত্ত্বেরই আধুনিক সংস্করণ।

‘ইহুদি-খ্রিস্টান মূল্যবোধ’: বর্ণবাদের নতুন আবরণ

নেদারল্যান্ডসের উগ্র হিন্দুত্ববাদী ও ইসলামবিদ্বেষীদের ঘনিষ্ঠ জোটসঙ্গী খিয়ার্ট ভিল্ডার্স, যুক্তরাজ্যের নাইজেল ফারাজ এবং ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো রাজনৈতিক নেতারা এই শব্দযুগলকে ধার্মিকতার প্রকাশ হিসেবে নয়, বরং বৈষম্য ও বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।

তাজাম্মুল ব্যাখ্যা করেন, "৯/১১-পরবর্তী নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশে মুসলিমরা কেবল কোনো সংখ্যালঘু বা অভিবাসী গোষ্ঠী নয়, বরং তাদের একটি ধর্মীয় ও জাতিগত ‘অভ্যন্তরীণ শত্রু’ হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। এটি ক্রুসেড আমলের সেই দৃষ্টিভঙ্গির পুনরাবৃত্তি—‘যারা আমাদের বিশ্বাসে বিশ্বাস করে না, তারা আমাদের সভ্যতার শত্রু’।"

তিনি আরও বলেন, "রাজনৈতিক নেতারা যখন ‘জনসংখ্যাগত দখলদারিত্ব’, ‘দেশ ছেয়ে যাওয়া’ বা ‘অনুপ্রবেশ’ শব্দগুলো ব্যবহার করেন, তখন তা কেবল অভিবাসনবিরোধী বার্তা থাকে না; বরং মুসলিমদের জীবনযাত্রাকে মূল পশ্চিমা সমাজের হুমকি বানিয়ে তাদের নাগরিক অধিকার খর্ব করা, দেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা এবং চরম ক্ষেত্রে বহিষ্কারের চক্রান্তকে বৈধতা দেওয়া হয়।"

ইসরায়েল: মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা ঔপনিবেশিকতার ‘অগ্রবর্তী ফাঁড়ি’

রাজনীতিবিদদের মুখে ‘ইহুদি-খ্রিস্টান মূল্যবোধ’ কোনো ধর্মীয় সম্পর্কের পরিচয় দেয় না, বরং এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক জোটের প্রতিনিধিত্ব করে। এই মতাদর্শের অধীনে ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি স্বাভাবিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হয় না; বরং তাকে ভূখণ্ডের মধ্যে ‘পশ্চিমা সভ্যতার রক্ষাকবচ’ এবং ‘অগ্রবর্তী ফাঁড়ি’ (Forward Outpost) হিসেবে তুলে ধরা হয়।

গাজায় চলমান গণমানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞ প্রসঙ্গে তাজাম্মুল বলেন, "এই দৃষ্টিভঙ্গি গাজার গণহত্যাকে একটি রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট হিসেবে দেখতে দেয় না, বরং একে একটি ‘অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ’ বানিয়ে ফেলে। সেখানে ইসরায়েলকে শর্তহীন সমর্থন দেওয়ার অর্থ দাঁড়ায় ‘আমাদের পক্ষকে সমর্থন করা’, যেখানে লাখ লাখ বেসামরিক নাগরিকের জীবন সম্পূর্ণ উপেক্ষিত।"

তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, "এই পরিভাষা কিন্তু ইহুদি বা ইহুদিধর্মকে রক্ষা করছে না। এটি একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের দখলদারিত্বমূলক নীতিকে রক্ষা করছে এবং ‘ইহুদি পরিচয়’কে তার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। যেসব প্রগতিশীল বা সত্যবাদী ইহুদি গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার বিরোধিতা করছেন, তাদেরকেও এই ‘ইহুদি-খ্রিস্টান’ বলয়ের বাইরে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে। এতেই প্রমাণিত হয়, এটি কোনো ধর্মীয় ধারণা নয়, এটি একটি নোংরা ভূ-রাজনৈতিক খেলা। যেখানে ইসরায়েলের নীতি মেনে চললেই কেবল আপনাকে গ্রহণ করা হবে।"

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, যদি এই ধারণা সত্যিই ধর্মীয় হতো, তবে ফিলিস্তিন ও লেবাননের প্রাচীনতম খ্রিস্টান সম্প্রদায়গুলো কেন আজ ইসরায়েলি বোমার শিকার হচ্ছে? ইসরায়েল গাজা ও লেবাননে ঐতিহাসিক গির্জাগুলোতেও হামলা চালাচ্ছে, যা প্রমাণ করে তাদের মূল উদ্দেশ্য ধ্বংস ও দখলদারিত্ব, কোনো ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা নয়। এমনকি অনেক ইহুদি বিশ্লেষকও স্বীকার করেছেন যে, ইউরোপে শত শত বছর ধরে চলা ইহুদি নিধন ও নির্মম নির্যাতনের ইতিহাস আড়াল করতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই ‘ইহুদি-খ্রিস্টান ঐতিহ্য’ নামক মিথ বা কাল্পনিক ধারণা তৈরি করা হয়েছিল।

দ্বিমুখী নীতি ও পরিকল্পিত বৈষম্য

পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমগুলোতে মুসলিমদের স্বাভাবিক প্রতিবেশী বা নাগরিক হিসেবে না দেখিয়ে তাদের জন্মহার ও স্বাভাবিক অভিবাসনাকে ‘আক্রমণ’ বা ‘শত্রুভাবাপন্ন দল’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

তাজাম্মুল ২০১৫ সালে ইউরোপে সিরীয় শরণার্থীদের আগমন এবং সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধের উদাহরণ টেনে বলেন, "সিরীয় মুসলিমদের বেলায় বলা হয়েছিল ‘অনুপ্রবেশ’ বা ‘আক্রমণ’, কিন্তু ইউক্রেনীয়দের বেলায় পরম সহানুভূতি দেখানো হয়েছিল। এই স্পষ্ট পার্থক্যই বলে দেয় পশ্চিমা বিশ্বে কাকে জাতিগত শত্রু হিসেবে দেখা হয়। এমনকি যুক্তরাজ্যে কট্টরপন্থী এমপি নিক টিমোথি যখন মুসলিমদের সালাত (নামাজ)-কে ‘আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেন, তখন স্পষ্ট হয় যে ইসলামফোবিয়া আর প্রান্তিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই, এটি মূলধারার রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে।"

ইউরোপের উগ্র ডানপন্থীদের ‘পুনঃঅভিবাসন’ (Remigration) বা মুসলিমদের জোরপূর্বক বিতাড়নের প্রস্তাবগুলো এখন মূলধারার রাজনীতিতে আলোচনার সুযোগ পাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও মুসলিম অধিকারের ওপর চরম আঘাত।

পরিসংখ্যান ও বর্তমান বাস্তবতার চিত্র

সম্প্রতি ইউরোপে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপে বসবাসকারী প্রায় অর্ধেক মুসলিম কোনো না কোনোভাবে বর্ণবাদ ও বৈষম্যের শিকার হন। যুক্তরাজ্যের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধের (Hate Crimes) প্রায় অর্ধেক ঘটনাতেই টার্গেট করা হয় মুসলিমদের।

সংবাদ সম্পাদকের ভাষায়, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও উগ্রপন্থীরা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী ‘ইহুদি-খ্রিস্টান মূলবোধের’ জিকির তুলে বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মৌলিক অধিকার দমন করতে চায়। কিন্তু সত্য ও মানবাধিকারের পক্ষে বিশ্ব মুসলিম জনমত আজ আরও সোচ্চার।

বিষয় : সাক্ষাৎকার

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬


ইহুদি-খ্রিস্টান মূল্যবোধ: পশ্চিমের এক ইসলামবিদ্বেষী রাজনৈতিক অস্ত্র ও গাজায় গণহত্যার বয়ান

প্রকাশের তারিখ : ১৪ আগস্ট ২০২৬

featured Image

পশ্চিমা রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ‘ইহুদি-খ্রিস্টান মূল্যবোধ’ (Judeo-Christian values) ধারণাটিকে একটি যৌথ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে প্রচার করা হলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি একটি চরম বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক সীমানায় পরিণত হয়েছে। জর্জেটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিজেস ইনিশিয়েটিভের সহকারী পরিচালক মোবাশরা তাজাম্মুল এক সাক্ষাৎকারে প্রকাশ করেছেন যে, কীভাবে এই পরিভাষা ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের "সভ্যতার শত্রু" এবং "অভ্যন্তরীণ হুমকি" হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হলো পশ্চিমা সমাজে ইসলামফোবিয়া ছড়িয়ে দেওয়া এবং গাজায় ইসরায়েলের নজিরবিহীন গণহত্যা ও বর্ণবাদী নীতিকে শর্তহীন সমর্থন জোগানো।

পশ্চিমা মিডিয়া ও রাজনীতিতে বহুল ব্যবহৃত ‘ইহুদি-খ্রিস্টান মূল্যবোধ’ কোনো ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কৌশল—যার মাধ্যমে মুসলিমদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদকে বৈধতা দেওয়া হয়। তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ওয়াশিংটন ডিসির জর্জেটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দ্য ব্রিজেস ইনিশিয়েটিভ’ (The Bridge Initiative)-এর উপ-পরিচালক মোবাশরা তাজাম্মুল এই বিস্ফোরক বিশ্লেষণ পেশ করেছেন।

ভাষা যখন বৈষম্য ও হিংসা তৈরির হাতিয়ার

মোবাশরা তাজাম্মুল বলেন, "যেকোনো সমাজ বা ধর্মের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয় ব্যবহৃত ভাষার মাধ্যমে। পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিমদের নিয়ে যে পরিভাষা ও ভাষা ব্যবহার করা হয়, তা মূলত তাদেরকে ‘বিপজ্জনক’, ‘সহিংস’ এবং ‘পশ্চিমা জীবনযাত্রার জন্য হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে ইসলাম ও মুসলিমদের সম্পর্কে একটি গভীর পক্ষপাতদুষ্ট ও ক্ষতিকর ধারণা তৈরি করা হয়েছে।"

তিনি জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চালু হওয়া ‘ইহুদি-খ্রিস্টান মূল্যবোধ’ পরিভাষাটি মুসলিমদের জাতিগত ও ধর্মীয়ভাবে ‘অপর’ বা ‘বহিরাগত’ বানানোর একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। এটি স্যামুয়েল হান্টিংটন ও বার্নার্ড লিউইসের বিতর্কিত ‘সভ্যতার দ্বন্দ্ব’ (Clash of Civilizations) তত্ত্বেরই আধুনিক সংস্করণ।

‘ইহুদি-খ্রিস্টান মূল্যবোধ’: বর্ণবাদের নতুন আবরণ

নেদারল্যান্ডসের উগ্র হিন্দুত্ববাদী ও ইসলামবিদ্বেষীদের ঘনিষ্ঠ জোটসঙ্গী খিয়ার্ট ভিল্ডার্স, যুক্তরাজ্যের নাইজেল ফারাজ এবং ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো রাজনৈতিক নেতারা এই শব্দযুগলকে ধার্মিকতার প্রকাশ হিসেবে নয়, বরং বৈষম্য ও বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।

তাজাম্মুল ব্যাখ্যা করেন, "৯/১১-পরবর্তী নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশে মুসলিমরা কেবল কোনো সংখ্যালঘু বা অভিবাসী গোষ্ঠী নয়, বরং তাদের একটি ধর্মীয় ও জাতিগত ‘অভ্যন্তরীণ শত্রু’ হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। এটি ক্রুসেড আমলের সেই দৃষ্টিভঙ্গির পুনরাবৃত্তি—‘যারা আমাদের বিশ্বাসে বিশ্বাস করে না, তারা আমাদের সভ্যতার শত্রু’।"

তিনি আরও বলেন, "রাজনৈতিক নেতারা যখন ‘জনসংখ্যাগত দখলদারিত্ব’, ‘দেশ ছেয়ে যাওয়া’ বা ‘অনুপ্রবেশ’ শব্দগুলো ব্যবহার করেন, তখন তা কেবল অভিবাসনবিরোধী বার্তা থাকে না; বরং মুসলিমদের জীবনযাত্রাকে মূল পশ্চিমা সমাজের হুমকি বানিয়ে তাদের নাগরিক অধিকার খর্ব করা, দেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা এবং চরম ক্ষেত্রে বহিষ্কারের চক্রান্তকে বৈধতা দেওয়া হয়।"

ইসরায়েল: মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা ঔপনিবেশিকতার ‘অগ্রবর্তী ফাঁড়ি’

রাজনীতিবিদদের মুখে ‘ইহুদি-খ্রিস্টান মূল্যবোধ’ কোনো ধর্মীয় সম্পর্কের পরিচয় দেয় না, বরং এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক জোটের প্রতিনিধিত্ব করে। এই মতাদর্শের অধীনে ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি স্বাভাবিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হয় না; বরং তাকে ভূখণ্ডের মধ্যে ‘পশ্চিমা সভ্যতার রক্ষাকবচ’ এবং ‘অগ্রবর্তী ফাঁড়ি’ (Forward Outpost) হিসেবে তুলে ধরা হয়।

গাজায় চলমান গণমানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞ প্রসঙ্গে তাজাম্মুল বলেন, "এই দৃষ্টিভঙ্গি গাজার গণহত্যাকে একটি রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট হিসেবে দেখতে দেয় না, বরং একে একটি ‘অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ’ বানিয়ে ফেলে। সেখানে ইসরায়েলকে শর্তহীন সমর্থন দেওয়ার অর্থ দাঁড়ায় ‘আমাদের পক্ষকে সমর্থন করা’, যেখানে লাখ লাখ বেসামরিক নাগরিকের জীবন সম্পূর্ণ উপেক্ষিত।"

তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, "এই পরিভাষা কিন্তু ইহুদি বা ইহুদিধর্মকে রক্ষা করছে না। এটি একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের দখলদারিত্বমূলক নীতিকে রক্ষা করছে এবং ‘ইহুদি পরিচয়’কে তার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। যেসব প্রগতিশীল বা সত্যবাদী ইহুদি গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার বিরোধিতা করছেন, তাদেরকেও এই ‘ইহুদি-খ্রিস্টান’ বলয়ের বাইরে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে। এতেই প্রমাণিত হয়, এটি কোনো ধর্মীয় ধারণা নয়, এটি একটি নোংরা ভূ-রাজনৈতিক খেলা। যেখানে ইসরায়েলের নীতি মেনে চললেই কেবল আপনাকে গ্রহণ করা হবে।"

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, যদি এই ধারণা সত্যিই ধর্মীয় হতো, তবে ফিলিস্তিন ও লেবাননের প্রাচীনতম খ্রিস্টান সম্প্রদায়গুলো কেন আজ ইসরায়েলি বোমার শিকার হচ্ছে? ইসরায়েল গাজা ও লেবাননে ঐতিহাসিক গির্জাগুলোতেও হামলা চালাচ্ছে, যা প্রমাণ করে তাদের মূল উদ্দেশ্য ধ্বংস ও দখলদারিত্ব, কোনো ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষা নয়। এমনকি অনেক ইহুদি বিশ্লেষকও স্বীকার করেছেন যে, ইউরোপে শত শত বছর ধরে চলা ইহুদি নিধন ও নির্মম নির্যাতনের ইতিহাস আড়াল করতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই ‘ইহুদি-খ্রিস্টান ঐতিহ্য’ নামক মিথ বা কাল্পনিক ধারণা তৈরি করা হয়েছিল।

দ্বিমুখী নীতি ও পরিকল্পিত বৈষম্য

পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমগুলোতে মুসলিমদের স্বাভাবিক প্রতিবেশী বা নাগরিক হিসেবে না দেখিয়ে তাদের জন্মহার ও স্বাভাবিক অভিবাসনাকে ‘আক্রমণ’ বা ‘শত্রুভাবাপন্ন দল’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

তাজাম্মুল ২০১৫ সালে ইউরোপে সিরীয় শরণার্থীদের আগমন এবং সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধের উদাহরণ টেনে বলেন, "সিরীয় মুসলিমদের বেলায় বলা হয়েছিল ‘অনুপ্রবেশ’ বা ‘আক্রমণ’, কিন্তু ইউক্রেনীয়দের বেলায় পরম সহানুভূতি দেখানো হয়েছিল। এই স্পষ্ট পার্থক্যই বলে দেয় পশ্চিমা বিশ্বে কাকে জাতিগত শত্রু হিসেবে দেখা হয়। এমনকি যুক্তরাজ্যে কট্টরপন্থী এমপি নিক টিমোথি যখন মুসলিমদের সালাত (নামাজ)-কে ‘আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেন, তখন স্পষ্ট হয় যে ইসলামফোবিয়া আর প্রান্তিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই, এটি মূলধারার রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে।"

ইউরোপের উগ্র ডানপন্থীদের ‘পুনঃঅভিবাসন’ (Remigration) বা মুসলিমদের জোরপূর্বক বিতাড়নের প্রস্তাবগুলো এখন মূলধারার রাজনীতিতে আলোচনার সুযোগ পাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও মুসলিম অধিকারের ওপর চরম আঘাত।

পরিসংখ্যান ও বর্তমান বাস্তবতার চিত্র

সম্প্রতি ইউরোপে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপে বসবাসকারী প্রায় অর্ধেক মুসলিম কোনো না কোনোভাবে বর্ণবাদ ও বৈষম্যের শিকার হন। যুক্তরাজ্যের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধের (Hate Crimes) প্রায় অর্ধেক ঘটনাতেই টার্গেট করা হয় মুসলিমদের।

সংবাদ সম্পাদকের ভাষায়, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও উগ্রপন্থীরা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী ‘ইহুদি-খ্রিস্টান মূলবোধের’ জিকির তুলে বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মৌলিক অধিকার দমন করতে চায়। কিন্তু সত্য ও মানবাধিকারের পক্ষে বিশ্ব মুসলিম জনমত আজ আরও সোচ্চার।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ