২০১৯ সালের ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত বাবরি মসজিদ রায়ের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালানো ভারতের প্রবীণ আইনজীবী মাহমুদ প্রাচার অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার পরোয়ানা জারি করেছে দিল্লির একটি আদালত। নির্ধারিত ৬ লাখ রুপি জরিমানা অনাদায়ে গত ১৪ আগস্ট পাতিয়ালা হাউস কোর্টের বিচারক মেধা আরিয়া এই নির্দেশ প্রদান করেন। আদালত নিযুক্ত বেলিফকে (Bailiff) প্রয়েজনে তালা ভেঙে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী ১ অক্টোবর এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
ভারতে মুসলিমদের আইনি অধিকার রক্ষায় সোচ্চার প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহমুদ প্রাচার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে দেশটির বিচার বিভাগ। ২০১৯ সালের বাবরি মসজিদ রায়কে চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করার অপরাধে আরোপিত ৬ লাখ রুপি জরিমানা অনাদায়ে তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছে দিল্লির একটি আদালত।
নিউ দিল্লি ডিস্ট্রিক্ট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি (NDLSA)-র দায়ের করা এক কার্যকর আবেদনের পরিপ্রক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আদালতের নথি অনুযায়ী, জরিমানার বিষয়ে আপত্তি জানানোর জন্য মাহমুদ প্রাছাকে একাধিক সুযোগ দেওয়া হলেও তিনি কোনো আপত্তি দাখিল করেননি।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে মাহমুদ প্রাছার দায়ের করা একটি দেওয়ানি মামলাকে কেন্দ্র করে, যেখানে তিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ২০১৯ সালের বিতর্কিত অযোধ্যা রায়কে "বাতিল ও অকার্যকর" ঘোষণার দাবি জানিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, তৎকালীন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ অযোধ্যার ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের বিতর্কিত জমিটি রাম মন্দির ট্রাস্টকে হস্তান্তরের একপাক্ষিক রায় দেয় এবং মুসলিমদের বিকল্প স্থানে ৫ একর জমি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।
প্রাছা এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করলে নিম্ন আদালত শুরুতেই তার মামলাটি খারিজ করে এবং ১ লাখ রুপি জরিমানা করে। পরবর্তীতে এই আদেশের বিরুদ্ধে মাহমুদ প্রাছা জেলা আদালতে রিভিশন আবেদন করলে, গত বছরের ১৮ অক্টোবর বিচারক ধর্মেন্দার রানা আবেদনটি খারিজ করার পাশাপাশি জরিমানা বাড়িয়ে ৫ লাখ রুপি যোগ করে মোট ৬ লাখ রুপি নির্ধারণ করেন। বিচারক রানা তার আদেশে উল্লেখ করেছিলেন, আগের ১ লাখ রুপি জরিমানা যথেষ্ট ছিল না এবং এ ধরনের মামলা নিরুৎসাহিত করতে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
মাহমুদ প্রাছা তার মামলার মূল ভিত্তি করেছিলেন ভারতের সাবেক প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের ২০২৪ সালের একটি বিতর্কিত বক্তব্যের ওপর। পুনেতে দেওয়া ওই বক্তব্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন যে, বাবরি মসজিদ-অযোধ্যা বিবাদের সমাধানের জন্য তিনি "ভগবান শ্রী রাম লালা ভিরাজমান"-এর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন।
আইনজীবী মাহমুদ প্রাছা আদালতে যুক্তি দেন, সাবেক বিচারপতির এই বক্তব্য পরিষ্কার প্রমাণ করে যে রায়ে নিরপেক্ষতার অভাব ছিল এবং পক্ষপাতমূলক মনোভাব নিয়ে রায় প্রদান করা হয়েছিল।
তবে জেলা আদালত প্রাছার এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে দাবি করে, চন্দ্রচূড়ের প্রার্থনা ছিল কেবলই একটি "আধ্যাত্মিক অভিব্যক্তি" এবং এটাকে আদালতের নিরপেক্ষতা ভঙ্গের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। এছাড়া আদালত প্রাছার আইনি অধিকার (Legal Standing) নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং 'জাজেস (প্রোটেকশন) অ্যাক্ট, ১৯৮৫'-এর অজুহাত দিয়ে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার তীব্র সমালোচনা করে।
ভারতের চরমপন্থী রাজনৈতিক পরিবেশ এবং হিন্দুত্ববাদী প্রভাবের মধ্যে সংখ্যালঘু ও মুসলিম অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া আইনি কণ্ঠস্বরগুলোকে কীভাবে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোণঠাসা করা হচ্ছে, মাহমুদ প্রাচার এই ঘটনাকে তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে দেখছেন মানবাধিকার কর্মীরা। তবে আদালত বর্তমানে কেবল ৬ লাখ রুপি জরিমানার অর্থ আদায়েই সীমাবদ্ধ থেকে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়ে বেলিফ পাঠিয়েছে।
বিষয় : প্রতিবাদ আদালত বাবরি মসজিদ
.png)
শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬
২০১৯ সালের ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত বাবরি মসজিদ রায়ের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালানো ভারতের প্রবীণ আইনজীবী মাহমুদ প্রাচার অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার পরোয়ানা জারি করেছে দিল্লির একটি আদালত। নির্ধারিত ৬ লাখ রুপি জরিমানা অনাদায়ে গত ১৪ আগস্ট পাতিয়ালা হাউস কোর্টের বিচারক মেধা আরিয়া এই নির্দেশ প্রদান করেন। আদালত নিযুক্ত বেলিফকে (Bailiff) প্রয়েজনে তালা ভেঙে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী ১ অক্টোবর এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
ভারতে মুসলিমদের আইনি অধিকার রক্ষায় সোচ্চার প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহমুদ প্রাচার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে দেশটির বিচার বিভাগ। ২০১৯ সালের বাবরি মসজিদ রায়কে চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করার অপরাধে আরোপিত ৬ লাখ রুপি জরিমানা অনাদায়ে তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছে দিল্লির একটি আদালত।
নিউ দিল্লি ডিস্ট্রিক্ট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি (NDLSA)-র দায়ের করা এক কার্যকর আবেদনের পরিপ্রক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আদালতের নথি অনুযায়ী, জরিমানার বিষয়ে আপত্তি জানানোর জন্য মাহমুদ প্রাছাকে একাধিক সুযোগ দেওয়া হলেও তিনি কোনো আপত্তি দাখিল করেননি।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে মাহমুদ প্রাছার দায়ের করা একটি দেওয়ানি মামলাকে কেন্দ্র করে, যেখানে তিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ২০১৯ সালের বিতর্কিত অযোধ্যা রায়কে "বাতিল ও অকার্যকর" ঘোষণার দাবি জানিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, তৎকালীন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ অযোধ্যার ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের বিতর্কিত জমিটি রাম মন্দির ট্রাস্টকে হস্তান্তরের একপাক্ষিক রায় দেয় এবং মুসলিমদের বিকল্প স্থানে ৫ একর জমি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।
প্রাছা এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করলে নিম্ন আদালত শুরুতেই তার মামলাটি খারিজ করে এবং ১ লাখ রুপি জরিমানা করে। পরবর্তীতে এই আদেশের বিরুদ্ধে মাহমুদ প্রাছা জেলা আদালতে রিভিশন আবেদন করলে, গত বছরের ১৮ অক্টোবর বিচারক ধর্মেন্দার রানা আবেদনটি খারিজ করার পাশাপাশি জরিমানা বাড়িয়ে ৫ লাখ রুপি যোগ করে মোট ৬ লাখ রুপি নির্ধারণ করেন। বিচারক রানা তার আদেশে উল্লেখ করেছিলেন, আগের ১ লাখ রুপি জরিমানা যথেষ্ট ছিল না এবং এ ধরনের মামলা নিরুৎসাহিত করতে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
মাহমুদ প্রাছা তার মামলার মূল ভিত্তি করেছিলেন ভারতের সাবেক প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের ২০২৪ সালের একটি বিতর্কিত বক্তব্যের ওপর। পুনেতে দেওয়া ওই বক্তব্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন যে, বাবরি মসজিদ-অযোধ্যা বিবাদের সমাধানের জন্য তিনি "ভগবান শ্রী রাম লালা ভিরাজমান"-এর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন।
আইনজীবী মাহমুদ প্রাছা আদালতে যুক্তি দেন, সাবেক বিচারপতির এই বক্তব্য পরিষ্কার প্রমাণ করে যে রায়ে নিরপেক্ষতার অভাব ছিল এবং পক্ষপাতমূলক মনোভাব নিয়ে রায় প্রদান করা হয়েছিল।
তবে জেলা আদালত প্রাছার এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে দাবি করে, চন্দ্রচূড়ের প্রার্থনা ছিল কেবলই একটি "আধ্যাত্মিক অভিব্যক্তি" এবং এটাকে আদালতের নিরপেক্ষতা ভঙ্গের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। এছাড়া আদালত প্রাছার আইনি অধিকার (Legal Standing) নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং 'জাজেস (প্রোটেকশন) অ্যাক্ট, ১৯৮৫'-এর অজুহাত দিয়ে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার তীব্র সমালোচনা করে।
ভারতের চরমপন্থী রাজনৈতিক পরিবেশ এবং হিন্দুত্ববাদী প্রভাবের মধ্যে সংখ্যালঘু ও মুসলিম অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া আইনি কণ্ঠস্বরগুলোকে কীভাবে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোণঠাসা করা হচ্ছে, মাহমুদ প্রাচার এই ঘটনাকে তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে দেখছেন মানবাধিকার কর্মীরা। তবে আদালত বর্তমানে কেবল ৬ লাখ রুপি জরিমানার অর্থ আদায়েই সীমাবদ্ধ থেকে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়ে বেলিফ পাঠিয়েছে।
.png)
আপনার মতামত লিখুন