বাংলাদেশের পাসপোর্টে আবারও যুক্ত হতে যাচ্ছে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ (Except Israel) শব্দবন্ধটি। একই সঙ্গে ই-পাসপোর্টের ভেতরের জলছাপ বা ব্যাকগ্রাউন্ড ছবিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে বর্তমান বিএনপি সরকার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাদ পড়া ইসরায়েল সংক্রান্ত শর্ত পুনর্বহাল এবং শেখ মুজিবুর রহমান ও বিগত সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর ছবি বাদ দিয়ে নতুন জাতীয় প্রতীক ও ঐতিহাসিক চিত্র যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, জনমত এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে দেশের দীর্ঘদিনের অনড় অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সব ধরনের পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধটি পুনর্বহাল করার চূড়ান্ত উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। ছয় বছর আগে ২০২০ সালে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে যখন ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট বা ই-পাসপোর্ট পরিষেবা চালু করে, তখন কোনো ঘোষণা ছাড়াই পাসপোর্ট থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ শর্তটি বাদ দেওয়া হয়েছিল। এর আগে বাংলাদেশের পাসপোর্টে স্পষ্টভাবে লেখা থাকত, "এই পাসপোর্ট বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ, ইসরায়েল ছাড়া।"
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গত বছরের ৭ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক চিঠির মাধ্যমে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে এই শর্ত পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছিল। তবে সেই সিদ্ধান্তটি তখন কেবল কূটনৈতিক পাসপোর্টের বাইরে বড় পরিসরে পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান বিএনপি সরকার সব ধরনের পাসপোর্টে এটি কার্যকর করার জন্য এপ্রিল ও চলতি মাসের শুরুতে একাধিক নীতিগত সভা সম্পন্ন করেছে। সরকারের শীর্ষ মহল থেকে এ বিষয়ে সবুজ সংকেতও মিলেছে।
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে নতুন ই-পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধটি যুক্ত করা হবে। তবে এতে পুরোনো পাসপোর্টধারীদের তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জটিলতায় পড়তে হবে না। বর্তমান পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নবায়নের সময় নাগরিকেরা নতুন সংস্করণের পাসপোর্ট হাতে পাবেন।
পাসপোর্টের জলছাপ থেকে যা বাদ যাচ্ছে
পাসপোর্টের শর্ত পরিবর্তনের পাশাপাশি এর ভেতরের পৃষ্ঠার জলছাপগুলোতে (Watermark) বড় ধরনের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বৈঠক অনুযায়ী, বিগত সরকারের আমলের ব্যক্তিপূজা, মেগা প্রকল্প ও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলসংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক স্থাপনার ছবি বাদ দেওয়া হচ্ছে।
বাদ পড়ার তালিকায় রয়েছে— গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধ, রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ, মডেল মসজিদ, বঙ্গবন্ধু সেতু (যমুনা সেতু), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির, মেহেরপুরের মুজিবনগর সরকারের স্মৃতিসৌধ এবং কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের নৌকার ছবি।
নতুন জলছাপে যা যুক্ত হচ্ছে
নতুন ই-পাসপোর্টে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংযোজন হচ্ছে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতীক, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষার্থী আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে বীরত্বগাথা দাঁড়িয়ে থাকার সেই ঐতিহাসিক ছবি।
এ ছাড়া বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটাতে যুক্ত হচ্ছে— ঐতিহাসিক বঙ্গভবন, ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য জামদানি শাড়ি, জাতীয় ফল কাঁঠাল, জাতীয় মাছ ইলিশ, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত (নৌকা বাদে), মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, ঢাকার ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিল, কুমিল্লার শালবন বিহার, বান্দরবানের নীলগিরি পর্বত, রাজশাহীর আমবাগান, সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে অবস্থিত ঐতিহাসিক পানামনগরীর ছবি।
অপরিবর্তিত থাকছে যেসব ছবি
পাসপোর্টের আগের সংস্করণ থেকে কিছু ঐতিহ্যবাহী ছবি অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে— জাতীয় ফুল শাপলা, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, জাতীয় পাখি দোয়েল, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, সুপ্রিম কোর্ট, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা অনির্বাণ, লালবাগ দুর্গ, হাতিরঝিল, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, কার্জন হল, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, সোনালি আঁশ পাট, চা-বাগান, সুন্দরবন এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘সংগ্রাম’।
স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, পাসপোর্টের ভেতরের কয়েকটি জলছাপ পুনর্বিন্যাস ও নতুন ছবি যুক্ত করার কাজ প্রায় শেষ। শিগগিরই এ বিষয়ে সরকারপ্রধানের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়া যাবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন সরকার রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রতীকী বিষয়গুলোতে নিজেদের নীতিগত অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে।
বিষয় : পাসপোর্ট

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬
বাংলাদেশের পাসপোর্টে আবারও যুক্ত হতে যাচ্ছে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ (Except Israel) শব্দবন্ধটি। একই সঙ্গে ই-পাসপোর্টের ভেতরের জলছাপ বা ব্যাকগ্রাউন্ড ছবিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে বর্তমান বিএনপি সরকার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাদ পড়া ইসরায়েল সংক্রান্ত শর্ত পুনর্বহাল এবং শেখ মুজিবুর রহমান ও বিগত সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর ছবি বাদ দিয়ে নতুন জাতীয় প্রতীক ও ঐতিহাসিক চিত্র যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, জনমত এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে দেশের দীর্ঘদিনের অনড় অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সব ধরনের পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধটি পুনর্বহাল করার চূড়ান্ত উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। ছয় বছর আগে ২০২০ সালে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে যখন ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট বা ই-পাসপোর্ট পরিষেবা চালু করে, তখন কোনো ঘোষণা ছাড়াই পাসপোর্ট থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ শর্তটি বাদ দেওয়া হয়েছিল। এর আগে বাংলাদেশের পাসপোর্টে স্পষ্টভাবে লেখা থাকত, "এই পাসপোর্ট বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ, ইসরায়েল ছাড়া।"
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গত বছরের ৭ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক চিঠির মাধ্যমে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে এই শর্ত পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছিল। তবে সেই সিদ্ধান্তটি তখন কেবল কূটনৈতিক পাসপোর্টের বাইরে বড় পরিসরে পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান বিএনপি সরকার সব ধরনের পাসপোর্টে এটি কার্যকর করার জন্য এপ্রিল ও চলতি মাসের শুরুতে একাধিক নীতিগত সভা সম্পন্ন করেছে। সরকারের শীর্ষ মহল থেকে এ বিষয়ে সবুজ সংকেতও মিলেছে।
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে নতুন ই-পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধটি যুক্ত করা হবে। তবে এতে পুরোনো পাসপোর্টধারীদের তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জটিলতায় পড়তে হবে না। বর্তমান পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নবায়নের সময় নাগরিকেরা নতুন সংস্করণের পাসপোর্ট হাতে পাবেন।
পাসপোর্টের জলছাপ থেকে যা বাদ যাচ্ছে
পাসপোর্টের শর্ত পরিবর্তনের পাশাপাশি এর ভেতরের পৃষ্ঠার জলছাপগুলোতে (Watermark) বড় ধরনের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বৈঠক অনুযায়ী, বিগত সরকারের আমলের ব্যক্তিপূজা, মেগা প্রকল্প ও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলসংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক স্থাপনার ছবি বাদ দেওয়া হচ্ছে।
বাদ পড়ার তালিকায় রয়েছে— গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধ, রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ, মডেল মসজিদ, বঙ্গবন্ধু সেতু (যমুনা সেতু), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির, মেহেরপুরের মুজিবনগর সরকারের স্মৃতিসৌধ এবং কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের নৌকার ছবি।
নতুন জলছাপে যা যুক্ত হচ্ছে
নতুন ই-পাসপোর্টে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংযোজন হচ্ছে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতীক, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষার্থী আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে বীরত্বগাথা দাঁড়িয়ে থাকার সেই ঐতিহাসিক ছবি।
এ ছাড়া বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটাতে যুক্ত হচ্ছে— ঐতিহাসিক বঙ্গভবন, ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য জামদানি শাড়ি, জাতীয় ফল কাঁঠাল, জাতীয় মাছ ইলিশ, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত (নৌকা বাদে), মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, ঢাকার ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিল, কুমিল্লার শালবন বিহার, বান্দরবানের নীলগিরি পর্বত, রাজশাহীর আমবাগান, সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে অবস্থিত ঐতিহাসিক পানামনগরীর ছবি।
অপরিবর্তিত থাকছে যেসব ছবি
পাসপোর্টের আগের সংস্করণ থেকে কিছু ঐতিহ্যবাহী ছবি অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে— জাতীয় ফুল শাপলা, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, জাতীয় পাখি দোয়েল, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, সুপ্রিম কোর্ট, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা অনির্বাণ, লালবাগ দুর্গ, হাতিরঝিল, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, কার্জন হল, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, সোনালি আঁশ পাট, চা-বাগান, সুন্দরবন এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘সংগ্রাম’।
স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, পাসপোর্টের ভেতরের কয়েকটি জলছাপ পুনর্বিন্যাস ও নতুন ছবি যুক্ত করার কাজ প্রায় শেষ। শিগগিরই এ বিষয়ে সরকারপ্রধানের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়া যাবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন সরকার রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রতীকী বিষয়গুলোতে নিজেদের নীতিগত অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন