শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
কওমী টাইমস

গাজিয়াবাদের সাততলা ‘আলা হযরত হাজি হাউজ’ মুসলমানদের ‘খামাখা’ দেওয়া হয়েছে বলে উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতার উস্কানিমূলক বক্তব্য; প্রশাসনিক উদাসীনতায় ৭ বছর ধরে বন্ধ ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনা

উত্তরপ্রদেশে হাজি হাউজকে গোশালা বানানোর দাবি উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতার, মুসলিমদের তীব্র ক্ষোভ



উত্তরপ্রদেশে হাজি হাউজকে গোশালা বানানোর দাবি উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতার, মুসলিমদের তীব্র ক্ষোভ

ভারতের উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘আলা হযরত হাজি হাউজ’কে একটি গোশালা (গরুর আশ্রয়স্থল) হিসেবে রূপান্তর করার ধৃষ্টতাপূর্ণ দাবি জানিয়েছে এক উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে 'জাতীয় হিন্দু বীর সেনা'র নেতা সত্যম পন্ডিতকে এই উস্কানিমূলক বক্তব্য দিতে দেখা যায়। ২০১৬ সালে উদ্বোধন হওয়া প্রায় দুই হাজার হজযাত্রী ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই বিশাল ভবনটি গত ৭ বছর ধরে রহস্যজনকভাবে তালাবদ্ধ করে রেখেছে যোগী আদিত্যনাথের প্রশাসন, যা নিয়ে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে।

ভারতের উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে মুসলিমদের ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ‘আলা হযরত হাজি হাউজ’কে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। হিন্দন বিহার এলাকায় অবস্থিত এই হাজি হাউজটিকে একটি গোশালায় রূপান্তর করার দাবি তুলেছেন স্থানীয় এক উগ্রপন্থী হিন্দু নেতা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে 'জাতীয় হিন্দু বীর সেনা'র নেতা সত্যম পন্ডিতকে দাবি করতে দেখা যায় যে, এই সরকারি স্থাপনাটি "সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না"। বিতর্কিত এই নেতা গাজিয়াবাদের অধিবাসীদের উদ্দেশে বলেন, "আমি সমস্ত গাজিয়াবাদবাসীকে জানাতে চাই যে, এই জায়গাটির সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। এটিকে গাজিয়াবাদের একটি বিশাল গোশালা বানিয়ে দেওয়া উচিত, যাতে স্থানটির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়।"

এখানেই ক্ষান্ত হননি এই উগ্রবাদী নেতা। মুসলিম বিদ্বেষ উস্কে দিয়ে তিনি দাবি করেন, এই জায়গাটি মুসলিম সম্প্রদায়কে "খামাখা" (অনর্থক) দেওয়া হয়েছে এবং অনর্থকভাবে এটিকে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। তিনি উত্তরপ্রদেশের যোগী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেন যত দ্রুত সম্ভব এটিকে গোশালায় রূপান্তর করা হয়। নিজের উস্কানিমূলক বক্তব্যের শেষে তিনি "জয় শ্রী রাম" এবং "ভারত মাতা কি জয়" স্লোগান দেন।

৭ বছর ধরে তালাবদ্ধ হাজি হাউজ

আলা হযরত হাজি হাউজটি মূলত পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের হজযাত্রীদের মক্কায় যাত্রার পূর্বে একটি ট্রানজিট পয়েন্ট বা অস্থায়ী শিবির হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। ২০১৬ সালে উত্তরপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব এই দৃষ্টিনন্দন সাততলা ভবনটি উদ্বোধন করেন। ১৮৮৬ জন হজযাত্রী একসঙ্গে থাকার ক্ষমতাসম্পন্ন এই ভবনে হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টিকাদান এবং হজ সংক্রান্ত যাবতীয় দিকনির্দেশনা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল।

তবে উত্তরপ্রদেশে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভবনটি অবহেলার শিকার হয় এবং গত ৭ বছর ধরে এটি সম্পূর্ণ তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের সংখ্যালঘু বিষয়ক দপ্তর থেকে একটি প্রস্তাব পেশ করা হয়, যেখানে ভবনটির জরাজীর্ণ দশা এবং অব্যবহারের অজুহাত দেখিয়ে এটিকে একটি সাধারণ 'গেস্ট হাউজ' বা বাণিজ্যিক অতিথি শালায় রূপান্তর করার কথা বলা হয়েছে।

মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিবাদ

সংখ্যালঘু দপ্তরের এই সরকারি প্রস্তাবের পরই মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ, মুসলিমদের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রয়োজনে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি পবিত্র আবেগের স্থানকে সরকার রাজস্ব আদায়ের বাণিজ্যিক উৎসে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করছে। এর ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতাদের এই স্থাপনাকে গোশালা বানানোর দাবি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। মানবাধিকার কর্মী ও স্থানীয় মুসলিমরা বিষয়টিকে ভারতের মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার এবং ওয়াকফ ও সংখ্যালঘু সম্পত্তির ওপর উগ্রপন্থীদের আগ্রাসনের আরেকটি নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।

বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু হাজি হাউজ

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬


উত্তরপ্রদেশে হাজি হাউজকে গোশালা বানানোর দাবি উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতার, মুসলিমদের তীব্র ক্ষোভ

প্রকাশের তারিখ : ২০ জুন ২০২৬

featured Image

ভারতের উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘আলা হযরত হাজি হাউজ’কে একটি গোশালা (গরুর আশ্রয়স্থল) হিসেবে রূপান্তর করার ধৃষ্টতাপূর্ণ দাবি জানিয়েছে এক উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে 'জাতীয় হিন্দু বীর সেনা'র নেতা সত্যম পন্ডিতকে এই উস্কানিমূলক বক্তব্য দিতে দেখা যায়। ২০১৬ সালে উদ্বোধন হওয়া প্রায় দুই হাজার হজযাত্রী ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই বিশাল ভবনটি গত ৭ বছর ধরে রহস্যজনকভাবে তালাবদ্ধ করে রেখেছে যোগী আদিত্যনাথের প্রশাসন, যা নিয়ে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে।

ভারতের উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে মুসলিমদের ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ‘আলা হযরত হাজি হাউজ’কে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। হিন্দন বিহার এলাকায় অবস্থিত এই হাজি হাউজটিকে একটি গোশালায় রূপান্তর করার দাবি তুলেছেন স্থানীয় এক উগ্রপন্থী হিন্দু নেতা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে 'জাতীয় হিন্দু বীর সেনা'র নেতা সত্যম পন্ডিতকে দাবি করতে দেখা যায় যে, এই সরকারি স্থাপনাটি "সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না"। বিতর্কিত এই নেতা গাজিয়াবাদের অধিবাসীদের উদ্দেশে বলেন, "আমি সমস্ত গাজিয়াবাদবাসীকে জানাতে চাই যে, এই জায়গাটির সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। এটিকে গাজিয়াবাদের একটি বিশাল গোশালা বানিয়ে দেওয়া উচিত, যাতে স্থানটির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়।"

এখানেই ক্ষান্ত হননি এই উগ্রবাদী নেতা। মুসলিম বিদ্বেষ উস্কে দিয়ে তিনি দাবি করেন, এই জায়গাটি মুসলিম সম্প্রদায়কে "খামাখা" (অনর্থক) দেওয়া হয়েছে এবং অনর্থকভাবে এটিকে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। তিনি উত্তরপ্রদেশের যোগী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেন যত দ্রুত সম্ভব এটিকে গোশালায় রূপান্তর করা হয়। নিজের উস্কানিমূলক বক্তব্যের শেষে তিনি "জয় শ্রী রাম" এবং "ভারত মাতা কি জয়" স্লোগান দেন।

৭ বছর ধরে তালাবদ্ধ হাজি হাউজ

আলা হযরত হাজি হাউজটি মূলত পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের হজযাত্রীদের মক্কায় যাত্রার পূর্বে একটি ট্রানজিট পয়েন্ট বা অস্থায়ী শিবির হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। ২০১৬ সালে উত্তরপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব এই দৃষ্টিনন্দন সাততলা ভবনটি উদ্বোধন করেন। ১৮৮৬ জন হজযাত্রী একসঙ্গে থাকার ক্ষমতাসম্পন্ন এই ভবনে হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টিকাদান এবং হজ সংক্রান্ত যাবতীয় দিকনির্দেশনা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল।

তবে উত্তরপ্রদেশে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভবনটি অবহেলার শিকার হয় এবং গত ৭ বছর ধরে এটি সম্পূর্ণ তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের সংখ্যালঘু বিষয়ক দপ্তর থেকে একটি প্রস্তাব পেশ করা হয়, যেখানে ভবনটির জরাজীর্ণ দশা এবং অব্যবহারের অজুহাত দেখিয়ে এটিকে একটি সাধারণ 'গেস্ট হাউজ' বা বাণিজ্যিক অতিথি শালায় রূপান্তর করার কথা বলা হয়েছে।

মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিবাদ

সংখ্যালঘু দপ্তরের এই সরকারি প্রস্তাবের পরই মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ, মুসলিমদের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রয়োজনে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি পবিত্র আবেগের স্থানকে সরকার রাজস্ব আদায়ের বাণিজ্যিক উৎসে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করছে। এর ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতাদের এই স্থাপনাকে গোশালা বানানোর দাবি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। মানবাধিকার কর্মী ও স্থানীয় মুসলিমরা বিষয়টিকে ভারতের মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার এবং ওয়াকফ ও সংখ্যালঘু সম্পত্তির ওপর উগ্রপন্থীদের আগ্রাসনের আরেকটি নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ