ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কোনো লিখিত সরকারি নোটিশ বা উচ্চ আদালতের আদেশ ছাড়াই মসজিদগুলো থেকে লাউডস্পিকার অপসারণের জন্য পুলিশ প্রশাসন মৌখিক চাপ দিচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে একাধিক মসজিদ কমিটি ও ধর্মীয় সংগঠন। সম্প্রতি কলকাতার পর্ণশ্রী থানাসহ বিভিন্ন জেলায় মসজিদ কমিটিকে ডেকে পাঠায় পুলিশ। এ ঘটনায় রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মুসলিম ধর্মীয় নেতা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা একে বেআইনি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আঘাত আখ্যা দিয়ে রাজপথে এবং আদালতে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গে কোনো লিখিত সরকারি আদেশ বা আইনি ভিত্তি ছাড়াই মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার সরানোর জন্য পুলিশ সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে বলে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। রাজ্যটির রাজধানী কলকাতার পর্ণশ্রী থানাসহ একাধিক জেলায় সম্প্রতি পুলিশ ও মসজিদ কমিটির বৈঠক ঘিরে এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।
গত সোমবার রাতে কলকাতার পর্ণশ্রী থানা এলাকার অন্তর্গত গাড়াগাছা জামে মসজিদসহ প্রায় আটটি মসজিদ কমিটি এবং একটি মাজার কমিটির প্রতিনিধিদের থানায় ডেকে পাঠায় পুলিশ প্রশাসন। সেখানে উপস্থিত কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আগামী ৪ আগস্টের (সংবাদ প্রকাশের পূর্ববর্তী তারিখ) মধ্যে মসজিদের লাউডস্পিকার সম্পূর্ণ খুলে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। মসজিদ কমিটির প্রতিনিধিরা যখন এই নির্দেশের পেছনে কোনো লিখিত আদেশ, প্রজ্ঞাপন বা আদালতের নির্দেশিকা দেখতে চান, তখন পুলিশ তা দেখাতে ব্যর্থ হয় এবং কেবল মৌখিকভাবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে বলে।
অন্যান্য জেলাতেও একই চিত্র
শুধু কলকাতাই নয়, রাজ্যটির বিভিন্ন জেলাতেও স্থানীয় ইমাম ও মসজিদ পরিচালনা পর্ষদকে লাউডস্পিকার অপসারণের জন্য পুলিশি চাপের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তারা ইতোমধ্যে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন (Noise Pollution Rules) মেনে লাউডস্পিকারের সাউন্ড ডেসিবেল (শব্দমাত্রা) উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছেন এবং প্রশাসনকে পরীক্ষার সুযোগও দিয়েছেন। এরপরও কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ মাইক খুলে ফেলার এমন প্রশাসনিক চাপ তাদের হতবাক করেছে।
ডিজি ও পুলিশ কমিশনারকে চিঠি, আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি
বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (ISF)-এর চেয়ারম্যান ও ভাঙড়ের বিধায়ক নৌশাদ সিদ্দিকী। তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক (DGP) এবং কলকাতা পুলিশের কমিশনারের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা দাবি করেছেন।
চিঠিতে নৌশাদ সিদ্দিকী উল্লেখ করেন:
"রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে আমাদের কাছে খবর আসছে যে, স্থানীয় পুলিশ কোনো আইনি নোটিশ ছাড়া মসজিদে গিয়ে মাইক খুলে দিচ্ছে অথবা মসজিদ কমিটিকে হুমকি দিচ্ছে। এমন কি ফজর আজানের সময় লাউডস্পিকার ব্যবহারে বাধা দেওয়ার খবরও এসেছে। অথচ শব্দদূষণ বিধি অনুযায়ী মসজিদগুলো ইতোমধ্যে সাউন্ড কমিয়ে দিয়েছে। পুলিশের এই ধরনের বাধ্যতামূলক ও বেআইনি আচরণ সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি তৈরি করছে।"
তিনি আরও সতর্ক করেন যে, সংবিধানের ১৪, ১৯, ২১ এবং ২৫-২৮ অনুচ্ছেদে যে মৌলিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, আদালতের কোনো নির্দিষ্ট আদেশ ছাড়া কেবল মৌখিক নির্দেশে পুলিশি হস্তক্ষেপ তার স্পষ্ট লঙ্ঘন। পুলিশ প্রশাসন অনতিব্লিমে নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্পষ্ট 'স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর' (SOP) প্রকাশ না করলে তারা ক্যালকাটা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হবেন বলেও জানান।
উলামায়ে কেরাম ও ইমাম সমিতির তীব্র ক্ষোভ
এ বিষয়ে কলকাতা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী।
তিনি পুলিশি পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করে বলেন:
"পুলিশ মসজিদে গিয়ে লাউডস্পিকার খোলার হুমকি দিচ্ছে! এটা কী হচ্ছে? পুলিশ নিজেদের কী ভাবছে, এসব কি কোনো তামাশা? সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের স্পষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে যে, নির্দিষ্ট শব্দসীমার মধ্যে লাউডস্পিকার ব্যবহার করা যাবে। তাহলে পুলিশ কোন আইনি শক্তিতে তা অপসারণের নির্দেশ দেয়? তারা কি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ মানবে না?"
অন্যদিকে, 'অল বেঙ্গল ইমাম মুয়াজ্জিন অ্যাসোসিয়েশন'-এর রাজ্য সম্পাদক নিজামুদ্দিন বিশ্বাস বলেন, আইনে সাউন্ড সীমা মেনে লাউডস্পিকার ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে, কিন্তু কোনো আইনই লাউডস্পিকার পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার কথা বলে না। রাজ্য জুড়ে এই আতঙ্ক তৈরির বিষয়ে বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (OC) সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা লিখিত আদেশ বা নির্দেশের কথা অস্বীকার করছেন।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশ বা কলকাতা পুলিশের সদর দপ্তর থেকে এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য বা অফিসিয়াল বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কোনো লিখিত সরকারি নোটিশ বা উচ্চ আদালতের আদেশ ছাড়াই মসজিদগুলো থেকে লাউডস্পিকার অপসারণের জন্য পুলিশ প্রশাসন মৌখিক চাপ দিচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে একাধিক মসজিদ কমিটি ও ধর্মীয় সংগঠন। সম্প্রতি কলকাতার পর্ণশ্রী থানাসহ বিভিন্ন জেলায় মসজিদ কমিটিকে ডেকে পাঠায় পুলিশ। এ ঘটনায় রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মুসলিম ধর্মীয় নেতা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা একে বেআইনি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আঘাত আখ্যা দিয়ে রাজপথে এবং আদালতে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গে কোনো লিখিত সরকারি আদেশ বা আইনি ভিত্তি ছাড়াই মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার সরানোর জন্য পুলিশ সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে বলে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। রাজ্যটির রাজধানী কলকাতার পর্ণশ্রী থানাসহ একাধিক জেলায় সম্প্রতি পুলিশ ও মসজিদ কমিটির বৈঠক ঘিরে এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।
গত সোমবার রাতে কলকাতার পর্ণশ্রী থানা এলাকার অন্তর্গত গাড়াগাছা জামে মসজিদসহ প্রায় আটটি মসজিদ কমিটি এবং একটি মাজার কমিটির প্রতিনিধিদের থানায় ডেকে পাঠায় পুলিশ প্রশাসন। সেখানে উপস্থিত কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আগামী ৪ আগস্টের (সংবাদ প্রকাশের পূর্ববর্তী তারিখ) মধ্যে মসজিদের লাউডস্পিকার সম্পূর্ণ খুলে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। মসজিদ কমিটির প্রতিনিধিরা যখন এই নির্দেশের পেছনে কোনো লিখিত আদেশ, প্রজ্ঞাপন বা আদালতের নির্দেশিকা দেখতে চান, তখন পুলিশ তা দেখাতে ব্যর্থ হয় এবং কেবল মৌখিকভাবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে বলে।
অন্যান্য জেলাতেও একই চিত্র
শুধু কলকাতাই নয়, রাজ্যটির বিভিন্ন জেলাতেও স্থানীয় ইমাম ও মসজিদ পরিচালনা পর্ষদকে লাউডস্পিকার অপসারণের জন্য পুলিশি চাপের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তারা ইতোমধ্যে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন (Noise Pollution Rules) মেনে লাউডস্পিকারের সাউন্ড ডেসিবেল (শব্দমাত্রা) উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছেন এবং প্রশাসনকে পরীক্ষার সুযোগও দিয়েছেন। এরপরও কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ মাইক খুলে ফেলার এমন প্রশাসনিক চাপ তাদের হতবাক করেছে।
ডিজি ও পুলিশ কমিশনারকে চিঠি, আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি
বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (ISF)-এর চেয়ারম্যান ও ভাঙড়ের বিধায়ক নৌশাদ সিদ্দিকী। তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক (DGP) এবং কলকাতা পুলিশের কমিশনারের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা দাবি করেছেন।
চিঠিতে নৌশাদ সিদ্দিকী উল্লেখ করেন:
"রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে আমাদের কাছে খবর আসছে যে, স্থানীয় পুলিশ কোনো আইনি নোটিশ ছাড়া মসজিদে গিয়ে মাইক খুলে দিচ্ছে অথবা মসজিদ কমিটিকে হুমকি দিচ্ছে। এমন কি ফজর আজানের সময় লাউডস্পিকার ব্যবহারে বাধা দেওয়ার খবরও এসেছে। অথচ শব্দদূষণ বিধি অনুযায়ী মসজিদগুলো ইতোমধ্যে সাউন্ড কমিয়ে দিয়েছে। পুলিশের এই ধরনের বাধ্যতামূলক ও বেআইনি আচরণ সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি তৈরি করছে।"
তিনি আরও সতর্ক করেন যে, সংবিধানের ১৪, ১৯, ২১ এবং ২৫-২৮ অনুচ্ছেদে যে মৌলিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, আদালতের কোনো নির্দিষ্ট আদেশ ছাড়া কেবল মৌখিক নির্দেশে পুলিশি হস্তক্ষেপ তার স্পষ্ট লঙ্ঘন। পুলিশ প্রশাসন অনতিব্লিমে নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্পষ্ট 'স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর' (SOP) প্রকাশ না করলে তারা ক্যালকাটা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হবেন বলেও জানান।
উলামায়ে কেরাম ও ইমাম সমিতির তীব্র ক্ষোভ
এ বিষয়ে কলকাতা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী।
তিনি পুলিশি পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করে বলেন:
"পুলিশ মসজিদে গিয়ে লাউডস্পিকার খোলার হুমকি দিচ্ছে! এটা কী হচ্ছে? পুলিশ নিজেদের কী ভাবছে, এসব কি কোনো তামাশা? সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের স্পষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে যে, নির্দিষ্ট শব্দসীমার মধ্যে লাউডস্পিকার ব্যবহার করা যাবে। তাহলে পুলিশ কোন আইনি শক্তিতে তা অপসারণের নির্দেশ দেয়? তারা কি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ মানবে না?"
অন্যদিকে, 'অল বেঙ্গল ইমাম মুয়াজ্জিন অ্যাসোসিয়েশন'-এর রাজ্য সম্পাদক নিজামুদ্দিন বিশ্বাস বলেন, আইনে সাউন্ড সীমা মেনে লাউডস্পিকার ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে, কিন্তু কোনো আইনই লাউডস্পিকার পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার কথা বলে না। রাজ্য জুড়ে এই আতঙ্ক তৈরির বিষয়ে বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (OC) সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা লিখিত আদেশ বা নির্দেশের কথা অস্বীকার করছেন।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশ বা কলকাতা পুলিশের সদর দপ্তর থেকে এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য বা অফিসিয়াল বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আপনার মতামত লিখুন