যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান নিজেকে একটি ‘কঠোর ও অপরাজেয় শক্তি’ হিসেবে প্রমাণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তাঁর দাবি, যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ চাইলেও প্রায় ২০ দিন পর একই পক্ষ আলোচনার জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে।
মঙ্গলবার আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থার সম্প্রচারিত এক টেলিভিশন সংবাদ সম্মেলনে আরাঘচি এসব মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
আরাঘচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলসহ পশ্চিমা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে সংঘাতে প্রবেশ করেছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বদলে যায় এবং আলোচনার প্রয়োজন দেখা দেয়।
তবে আরাঘচির এই আত্মবিশ্বাসী বক্তব্যের বিপরীতে সংযত অবস্থান নিয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যকে ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’—এমন অনিশ্চিত অবস্থায় আটকে রাখা যাবে না।
গারগাশের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভবিষ্যৎ যেকোনো সমঝোতা আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং সুস্পষ্ট আন্তর্জাতিক নিয়মের ভিত্তিতে হওয়া প্রয়োজন। তিনি একটি টেকসই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার দিকে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের বড় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিতে। রয়টার্সের উদ্ধৃত কেপলার তথ্য অনুযায়ী, সোমবার মাত্র ছয়টি জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করেছে। গত ১০ দিনে দৈনিক গড় ছিল প্রায় ১১টি জাহাজ। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করত।
সমুদ্রপথে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ইরানের অভ্যন্তরীণ বাজারেও চাপ বাড়ছে। ইরানি ব্যবসায়ী নেতা মাজিদ রেজা হারিরি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক অবরোধের সঙ্গে তেহরানকে দীর্ঘমেয়াদে মানিয়ে নেওয়া উচিত হবে না।
হারিরির হিসাব অনুযায়ী, সমুদ্রপথের পরিবর্তে স্থলপথে আমদানি করতে হলে ইরানের বার্ষিক আমদানি ব্যয় প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, চীন থেকে সমুদ্রপথে একটি কনটেইনার আনতে যেখানে প্রায় ৩ হাজার ডলার লাগে, স্থলপথে সেই ব্যয় প্রায় ১২ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। মঙ্গলবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম ৮৪ ডলারের ওপরে ওঠে।
মার্কিন সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার এ পরিস্থিতির জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ট্রাম্প কোনো সুস্পষ্ট প্রস্থান পরিকল্পনা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘অবৈধ যুদ্ধে’ জড়িয়েছেন। যুদ্ধের কৌশল ও আলোচনার সক্ষমতার ঘাটতি মার্কিন সেনাদের ঝুঁকিতে ফেলছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননেও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ২৬ জুন মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির কাঠামোতে সম্মতি হলেও ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নাবাতিয়ার কাছে আলি আল-তাহের পাহাড় এলাকায় একযোগে কামান হামলা চালানো হয়েছে। একই সময়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ভারী যন্ত্রপাতি দক্ষিণ লেবাননের জাওতার আল-শারকিয়েহ ও জাওতার আল-গারবিয়েহ এলাকায় কয়েকটি বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে জানানো হয়।
লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন ইউনিফিল জানিয়েছে, শুক্রবার থেকে রবিবার পর্যন্ত ৪৫৫টি ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং লেবাননের আকাশসীমা লঙ্ঘনের ৯৭টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, শুধু শনিবারেই ২২৯টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়, যা ২১ জুনের পর এক দিনে সর্বোচ্চ।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এসব হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, হামলায় বেসামরিক মানুষ হতাহত হওয়ার পাশাপাশি ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রোমে লেবানন-ইসরায়েল আলোচনার সপ্তম দফার পর নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও মাঠের সামরিক পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিষয় : যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ইরান

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ আগস্ট ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান নিজেকে একটি ‘কঠোর ও অপরাজেয় শক্তি’ হিসেবে প্রমাণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তাঁর দাবি, যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ চাইলেও প্রায় ২০ দিন পর একই পক্ষ আলোচনার জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে।
মঙ্গলবার আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থার সম্প্রচারিত এক টেলিভিশন সংবাদ সম্মেলনে আরাঘচি এসব মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
আরাঘচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলসহ পশ্চিমা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে সংঘাতে প্রবেশ করেছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বদলে যায় এবং আলোচনার প্রয়োজন দেখা দেয়।
তবে আরাঘচির এই আত্মবিশ্বাসী বক্তব্যের বিপরীতে সংযত অবস্থান নিয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যকে ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’—এমন অনিশ্চিত অবস্থায় আটকে রাখা যাবে না।
গারগাশের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভবিষ্যৎ যেকোনো সমঝোতা আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং সুস্পষ্ট আন্তর্জাতিক নিয়মের ভিত্তিতে হওয়া প্রয়োজন। তিনি একটি টেকসই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার দিকে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের বড় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিতে। রয়টার্সের উদ্ধৃত কেপলার তথ্য অনুযায়ী, সোমবার মাত্র ছয়টি জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করেছে। গত ১০ দিনে দৈনিক গড় ছিল প্রায় ১১টি জাহাজ। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করত।
সমুদ্রপথে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ইরানের অভ্যন্তরীণ বাজারেও চাপ বাড়ছে। ইরানি ব্যবসায়ী নেতা মাজিদ রেজা হারিরি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক অবরোধের সঙ্গে তেহরানকে দীর্ঘমেয়াদে মানিয়ে নেওয়া উচিত হবে না।
হারিরির হিসাব অনুযায়ী, সমুদ্রপথের পরিবর্তে স্থলপথে আমদানি করতে হলে ইরানের বার্ষিক আমদানি ব্যয় প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, চীন থেকে সমুদ্রপথে একটি কনটেইনার আনতে যেখানে প্রায় ৩ হাজার ডলার লাগে, স্থলপথে সেই ব্যয় প্রায় ১২ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। মঙ্গলবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম ৮৪ ডলারের ওপরে ওঠে।
মার্কিন সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার এ পরিস্থিতির জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ট্রাম্প কোনো সুস্পষ্ট প্রস্থান পরিকল্পনা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘অবৈধ যুদ্ধে’ জড়িয়েছেন। যুদ্ধের কৌশল ও আলোচনার সক্ষমতার ঘাটতি মার্কিন সেনাদের ঝুঁকিতে ফেলছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননেও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ২৬ জুন মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির কাঠামোতে সম্মতি হলেও ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নাবাতিয়ার কাছে আলি আল-তাহের পাহাড় এলাকায় একযোগে কামান হামলা চালানো হয়েছে। একই সময়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ভারী যন্ত্রপাতি দক্ষিণ লেবাননের জাওতার আল-শারকিয়েহ ও জাওতার আল-গারবিয়েহ এলাকায় কয়েকটি বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে জানানো হয়।
লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন ইউনিফিল জানিয়েছে, শুক্রবার থেকে রবিবার পর্যন্ত ৪৫৫টি ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং লেবাননের আকাশসীমা লঙ্ঘনের ৯৭টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, শুধু শনিবারেই ২২৯টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়, যা ২১ জুনের পর এক দিনে সর্বোচ্চ।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এসব হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, হামলায় বেসামরিক মানুষ হতাহত হওয়ার পাশাপাশি ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রোমে লেবানন-ইসরায়েল আলোচনার সপ্তম দফার পর নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও মাঠের সামরিক পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আপনার মতামত লিখুন