শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
কওমী টাইমস

কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলের হাজার হাজার মসজিদ থেকে মাইক খুলে নেওয়ার অভিযোগে তোলপাড়; শুক্রবার আজান না শুনতে পেয়ে নামাজে ব্যাঘাতের পর গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কে সাধারণ মুসল্লিরা।

পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় স্বাধীনতায় আঘাত: জুমার আজান বন্ধের ঘটনায় হাইকোর্টে রিট, উদ্বেগে মুসলিম সম্প্রদায়



পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় স্বাধীনতায় আঘাত: জুমার আজান বন্ধের ঘটনায় হাইকোর্টে রিট, উদ্বেগে মুসলিম সম্প্রদায়

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও জুমার আজান প্রচারে বাধার সৃষ্টি হওয়ায় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। কোনো লিখিত নোটিশ ছাড়াই কলকাতা ও রাজ্যের প্রায় ৪ হাজার মসজিদ থেকে মাইক খুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠে আসার পর বিষয়টি হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। বিচার বিভাগের কাছে প্রতিকার চাওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় ইমাম ও মুসল্লিরা।

পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার চরম হুমকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একসময় জুমার দিনে কলকাতা ও আশপাশের প্রধান মসজিদগুলোর প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে রাস্তায় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের ভিড় জমে উঠলেও, বর্তমান রাজ্য সরকারের নীতি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের কারণে সেই ধর্মীয় আবহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি জুমার আজানের মাইক খুলে নেওয়া এবং প্রচারযন্ত্র ব্যবহারে বাধার ঘটনার পর শুক্রবার কলকাতা ও সংলগ্ন বিস্তর এলাকার মসজিদে সাউন্ড সিস্টেমে আজান ধ্বনিত হতে দেখা যায়নি। হঠাৎ আজান শুনতে না পেয়ে শত শত মুসল্লি সময়মতো নামাজে অংশ নিতে পারেননি, যা রাজ্যজুড়ে মুসলিম সমাজে গভীর উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে।

এই পীড়াদায়ক পরিস্থিতির বিবরণ দিতে গিয়ে কলকাতার পার্ক সার্কাস অঞ্চলের এক জ্যেষ্ঠ ইমাম অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, কোনো প্রকার প্রশাসনিক নিয়মকানুন না মেনে মাইক কেড়ে নিয়ে মুসলমানদের ওপর অন্যায্য চাপ তৈরি করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ থাকলেও আপাতত তারা ধর্য ধারণ করছেন। একই সাথে শনিবার (১৫ আগস্ট) ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে তিনি সর্বস্তরের মুসলিমদের নিজ নিজ বাসভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের আহ্বান জানান, যাতে রাজ্য প্রশাসন বা কোনো গোষ্ঠী সংখ্যালঘু সমাজকে ‘দেশদ্রোহী’ বা রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ না পায়। ইমামের এই মন্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, রাজ্যের মুসলিম নাগরিকরা বর্তমানে কতটা ভীতি ও আত্মরক্ষামূলক অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

ইতিমধ্যে মসজিদের মাইক খুলে নেওয়ার এই বিতর্কিত ও পক্ষপাতদুষ্ট পদক্ষেপের বিষয়টি কলকাতা হাইকোর্টে উত্থাপিত হয়েছে। হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি অতরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চে এক জনস্বার্থ মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। মামলাকারীর পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ তোলেন যে, কোনো আইনি নোটিশ প্রদান ছাড়াই স্রেফ আদালতের পুরোনো নির্দেশনার অজুহাতে পুলিশের সহায়তায় রাজ্যের প্রায় ৪ হাজার মসজিদ থেকে জোরপূর্বক মাইক খুলে নেওয়া হয়েছে। তিনি সাবেক বিচারপতি ভগবতী প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক রায়ের আলোকেই নির্দিষ্ট শব্দবিধি মেনে পুনঃমাইক ব্যবহারের অনুমতির জোর দাবি জানান। চাঁপদানি এলাকা থেকেই শতাধিক মসজিদের পক্ষ থেকে এই আবেদনের সপক্ষে নথি জমা দেওয়ার কথা আদালতে জানানো হয়।

অন্যদিকে, রাজ্যের অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেল (এএজি) আদালতে রিটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দাবি করেন যে, রাজ্য পুলিশ মাইক খোলার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশ দেয়নি এবং অভিযোগের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক আদেশনামা উপস্থাপন করা হয়নি। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন কোনো আদেশ না দিয়ে রাজ্যকে লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ চান। শুনানি শেষে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নির্দিষ্টভাবে কোন কোন জেলার কোন কোন মসজিদ থেকে মাইক সরানো হয়েছে এবং শব্দবিধি মানা হচ্ছিল কি না—তার সঠিক তথ্য আগামী ১৮ আগস্টের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক মহল থেকেও এই ইস্যুতে উত্তাপ ছড়ানো হচ্ছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, সরকার কোনো নতুন নীতি আনেনি; বরং ২০২০ সালের হাইকোর্টের নির্দেশানুসারেই কাজ করছে। তার দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যের ৪,২০০টি মসজিদ এবং ১,০৯৬টি মন্দির থেকে সাউন্ড সিস্টেম সরানো হয়েছে। তবে সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষা কর্মী ও সাধারণ মুসলিম সমাজ সরকারের এই সমতার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের মতে, এটি সুকৌশলে জুমার আজান ও মুসলিমদের ধর্মীয় অনুশীলনে বাধা সৃষ্টি করার একটি বৈষম্যমূলক প্রচেষ্টা। সার্বিক পরিস্থিতিতে এক দমবন্ধ ও ভীতিকর পরিবেশের মধ্যেই রাজ্যের মুসলিম নাগরিকরা তাদের নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় সুরক্ষার আকুল প্রার্থনা জানাচ্ছেন।

বিষয় : মসজিদ কলকাতা পশ্চিমবঙ্গ

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬


পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় স্বাধীনতায় আঘাত: জুমার আজান বন্ধের ঘটনায় হাইকোর্টে রিট, উদ্বেগে মুসলিম সম্প্রদায়

প্রকাশের তারিখ : ১৪ আগস্ট ২০২৬

featured Image

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও জুমার আজান প্রচারে বাধার সৃষ্টি হওয়ায় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। কোনো লিখিত নোটিশ ছাড়াই কলকাতা ও রাজ্যের প্রায় ৪ হাজার মসজিদ থেকে মাইক খুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠে আসার পর বিষয়টি হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। বিচার বিভাগের কাছে প্রতিকার চাওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় ইমাম ও মুসল্লিরা।

পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার চরম হুমকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একসময় জুমার দিনে কলকাতা ও আশপাশের প্রধান মসজিদগুলোর প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে রাস্তায় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের ভিড় জমে উঠলেও, বর্তমান রাজ্য সরকারের নীতি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের কারণে সেই ধর্মীয় আবহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি জুমার আজানের মাইক খুলে নেওয়া এবং প্রচারযন্ত্র ব্যবহারে বাধার ঘটনার পর শুক্রবার কলকাতা ও সংলগ্ন বিস্তর এলাকার মসজিদে সাউন্ড সিস্টেমে আজান ধ্বনিত হতে দেখা যায়নি। হঠাৎ আজান শুনতে না পেয়ে শত শত মুসল্লি সময়মতো নামাজে অংশ নিতে পারেননি, যা রাজ্যজুড়ে মুসলিম সমাজে গভীর উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে।

এই পীড়াদায়ক পরিস্থিতির বিবরণ দিতে গিয়ে কলকাতার পার্ক সার্কাস অঞ্চলের এক জ্যেষ্ঠ ইমাম অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, কোনো প্রকার প্রশাসনিক নিয়মকানুন না মেনে মাইক কেড়ে নিয়ে মুসলমানদের ওপর অন্যায্য চাপ তৈরি করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ থাকলেও আপাতত তারা ধর্য ধারণ করছেন। একই সাথে শনিবার (১৫ আগস্ট) ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে তিনি সর্বস্তরের মুসলিমদের নিজ নিজ বাসভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের আহ্বান জানান, যাতে রাজ্য প্রশাসন বা কোনো গোষ্ঠী সংখ্যালঘু সমাজকে ‘দেশদ্রোহী’ বা রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ না পায়। ইমামের এই মন্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, রাজ্যের মুসলিম নাগরিকরা বর্তমানে কতটা ভীতি ও আত্মরক্ষামূলক অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

ইতিমধ্যে মসজিদের মাইক খুলে নেওয়ার এই বিতর্কিত ও পক্ষপাতদুষ্ট পদক্ষেপের বিষয়টি কলকাতা হাইকোর্টে উত্থাপিত হয়েছে। হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি অতরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চে এক জনস্বার্থ মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। মামলাকারীর পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ তোলেন যে, কোনো আইনি নোটিশ প্রদান ছাড়াই স্রেফ আদালতের পুরোনো নির্দেশনার অজুহাতে পুলিশের সহায়তায় রাজ্যের প্রায় ৪ হাজার মসজিদ থেকে জোরপূর্বক মাইক খুলে নেওয়া হয়েছে। তিনি সাবেক বিচারপতি ভগবতী প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক রায়ের আলোকেই নির্দিষ্ট শব্দবিধি মেনে পুনঃমাইক ব্যবহারের অনুমতির জোর দাবি জানান। চাঁপদানি এলাকা থেকেই শতাধিক মসজিদের পক্ষ থেকে এই আবেদনের সপক্ষে নথি জমা দেওয়ার কথা আদালতে জানানো হয়।

অন্যদিকে, রাজ্যের অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেল (এএজি) আদালতে রিটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দাবি করেন যে, রাজ্য পুলিশ মাইক খোলার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশ দেয়নি এবং অভিযোগের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক আদেশনামা উপস্থাপন করা হয়নি। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন কোনো আদেশ না দিয়ে রাজ্যকে লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ চান। শুনানি শেষে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নির্দিষ্টভাবে কোন কোন জেলার কোন কোন মসজিদ থেকে মাইক সরানো হয়েছে এবং শব্দবিধি মানা হচ্ছিল কি না—তার সঠিক তথ্য আগামী ১৮ আগস্টের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক মহল থেকেও এই ইস্যুতে উত্তাপ ছড়ানো হচ্ছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, সরকার কোনো নতুন নীতি আনেনি; বরং ২০২০ সালের হাইকোর্টের নির্দেশানুসারেই কাজ করছে। তার দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যের ৪,২০০টি মসজিদ এবং ১,০৯৬টি মন্দির থেকে সাউন্ড সিস্টেম সরানো হয়েছে। তবে সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষা কর্মী ও সাধারণ মুসলিম সমাজ সরকারের এই সমতার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের মতে, এটি সুকৌশলে জুমার আজান ও মুসলিমদের ধর্মীয় অনুশীলনে বাধা সৃষ্টি করার একটি বৈষম্যমূলক প্রচেষ্টা। সার্বিক পরিস্থিতিতে এক দমবন্ধ ও ভীতিকর পরিবেশের মধ্যেই রাজ্যের মুসলিম নাগরিকরা তাদের নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় সুরক্ষার আকুল প্রার্থনা জানাচ্ছেন।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ