২০২৩ সালের মার্চে পঞ্চগড়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সালানা জলসা বন্ধের দাবিতে আয়োজিত আন্দোলনে নিহত তরুণ আরিফুর রহমান আরিফের পরিবার সাড়ে তিন বছর পর আজও বিচারহীনতার কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। তৎকালীন সময়ে তদন্তে গিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতা ও বর্তমান অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ পরিবারটিকে বিচারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। আজ তাঁর দল ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ বা বিচারকাজ সম্পন্ন না হওয়ায় গভীর ক্ষোভ ও আকুতি প্রকাশ করেছেন আরিফের বৃদ্ধ বাবা ফরমান আলী।
কাদিয়ানীবিরোধী আন্দোলনে আরিফ হত্যা: বিচারের প্রতীক্ষায় এক নিঃস্ব বাবা
পঞ্চগড়ে ২০২৩ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত কাদিয়ানীবিরোধী বিক্ষোভ ও সহিংসতায় প্রাণ হারানো তরুণ আরিফুর রহমান আরিফের পরিবার আজ পর্যন্ত সুবিচারের মুখ দেখেনি। পঞ্চগড় শহরের ইসলামবাগ এলাকার বৃদ্ধ ফরমান আলী তাঁর একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে আজ দিশেহারা। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর পার হয়ে গেলেও আরিফ হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটন কিংবা জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ওই দিনের সহিংসতা
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে পঞ্চগড়ের আহমদনগর এলাকায় আহমদিয়া (কাদিয়ানী) সম্প্রদায়ের তিন দিনব্যাপী বার্ষিক সালানা জলসা বন্ধ এবং কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে সম্মিলিত খতমে নবুওয়াত সংরক্ষণ পরিষদসহ স্থানীয় বিভিন্ন ধর্মপ্রাণ ইসলামি সংগঠন। ৩ মার্চ জুমার নামাজের পর পঞ্চগড় শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল জমায়েত হয়। মিছিলটি এগোতে চাইলে পুলিশ ও বিজিবি বাধা দেয়, যার ফলে পরিস্থিতি তীব্র সংঘর্ষে রূপ নেয়।
পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রেসের বিক্রয়কর্মী আরিফ জুমার নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে পঞ্চগড়-ঢাকা মহাসড়কের পাশে সংঘর্ষের মধ্যে পড়েন। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছোঁড়া গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যান তিনি। যদিও শুরুতে পুলিশ দাবি করেছিল কাঁদানে গ্যাস ও ইট-পাটকেলের আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফনে বাধ্য করা এবং পরবর্তীতে চাপ দিয়ে কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ তোলেন আরিফের বাবা।
আদালতের নির্দেশে লাশ উত্তোলন ও ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ
ঘটনার প্রায় চার মাস পর ২০২৩ সালের ৪ জুন পঞ্চগড় সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয় এবং ১০ জুলাই আদালতের নির্দেশে কবর থেকে আরিফের মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। আরিফের বাবার অভিযোগ, "আমার ছেলে কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। ঘটনার পর থানায় আমার কাছ থেকে একটি কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল, যেখানে লেখা ছিল ইট-পাটকেলের আঘাতে আরিফের মৃত্যু হয়েছে এবং পরিবারের কোনো দাবি নেই।" আজ পর্যন্ত সেই ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
মেজর হাফিজের প্রতিশ্রুতি ও বর্তমান আকুতি
ঘটনার পর সহিংসতার কারণ অনুসন্ধানে বিএনপির তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে আরিফের বাড়িতে গিয়েছিলেন দলের তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদের স্পিকারের দায়িত্বে থাকা অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি আরিফের বাবার কাঁধে হাত রেখে বিচার পাওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
ফরমান আলী আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, "মেজর হাফিজ আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, এই হত্যার বিচার একদিন হবে। আজ তাঁর দল ক্ষমতায় এবং তিনি দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্বে রয়েছেন। আমি তাঁর কাছে কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা চাই না, শুধু আমার সন্তান হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই। তিনি আমাকে যে কথা দিয়েছিলেন, আমি আজও সেই কথার অপেক্ষায় আছি।"
মুসলিম মানবাধিকার ও খতমে নবুওয়াত আন্দোলনের অংশ হিসেবে নিহত সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় 'শহীদ আরিফুর রহমান স্মৃতি পরিষদ'-এর পক্ষে বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ ও স্মারকলিপি প্রদান করা হলেও আজও সুরাহা মেলেনি।
বিষয় : পঞ্চগড় কাদিয়ানীবিরোধী আন্দোলন

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬
২০২৩ সালের মার্চে পঞ্চগড়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সালানা জলসা বন্ধের দাবিতে আয়োজিত আন্দোলনে নিহত তরুণ আরিফুর রহমান আরিফের পরিবার সাড়ে তিন বছর পর আজও বিচারহীনতার কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। তৎকালীন সময়ে তদন্তে গিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতা ও বর্তমান অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ পরিবারটিকে বিচারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। আজ তাঁর দল ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ বা বিচারকাজ সম্পন্ন না হওয়ায় গভীর ক্ষোভ ও আকুতি প্রকাশ করেছেন আরিফের বৃদ্ধ বাবা ফরমান আলী।
কাদিয়ানীবিরোধী আন্দোলনে আরিফ হত্যা: বিচারের প্রতীক্ষায় এক নিঃস্ব বাবা
পঞ্চগড়ে ২০২৩ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত কাদিয়ানীবিরোধী বিক্ষোভ ও সহিংসতায় প্রাণ হারানো তরুণ আরিফুর রহমান আরিফের পরিবার আজ পর্যন্ত সুবিচারের মুখ দেখেনি। পঞ্চগড় শহরের ইসলামবাগ এলাকার বৃদ্ধ ফরমান আলী তাঁর একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে আজ দিশেহারা। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর পার হয়ে গেলেও আরিফ হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটন কিংবা জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ওই দিনের সহিংসতা
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে পঞ্চগড়ের আহমদনগর এলাকায় আহমদিয়া (কাদিয়ানী) সম্প্রদায়ের তিন দিনব্যাপী বার্ষিক সালানা জলসা বন্ধ এবং কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে সম্মিলিত খতমে নবুওয়াত সংরক্ষণ পরিষদসহ স্থানীয় বিভিন্ন ধর্মপ্রাণ ইসলামি সংগঠন। ৩ মার্চ জুমার নামাজের পর পঞ্চগড় শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল জমায়েত হয়। মিছিলটি এগোতে চাইলে পুলিশ ও বিজিবি বাধা দেয়, যার ফলে পরিস্থিতি তীব্র সংঘর্ষে রূপ নেয়।
পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রেসের বিক্রয়কর্মী আরিফ জুমার নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে পঞ্চগড়-ঢাকা মহাসড়কের পাশে সংঘর্ষের মধ্যে পড়েন। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছোঁড়া গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যান তিনি। যদিও শুরুতে পুলিশ দাবি করেছিল কাঁদানে গ্যাস ও ইট-পাটকেলের আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফনে বাধ্য করা এবং পরবর্তীতে চাপ দিয়ে কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ তোলেন আরিফের বাবা।
আদালতের নির্দেশে লাশ উত্তোলন ও ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ
ঘটনার প্রায় চার মাস পর ২০২৩ সালের ৪ জুন পঞ্চগড় সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয় এবং ১০ জুলাই আদালতের নির্দেশে কবর থেকে আরিফের মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। আরিফের বাবার অভিযোগ, "আমার ছেলে কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। ঘটনার পর থানায় আমার কাছ থেকে একটি কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল, যেখানে লেখা ছিল ইট-পাটকেলের আঘাতে আরিফের মৃত্যু হয়েছে এবং পরিবারের কোনো দাবি নেই।" আজ পর্যন্ত সেই ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
মেজর হাফিজের প্রতিশ্রুতি ও বর্তমান আকুতি
ঘটনার পর সহিংসতার কারণ অনুসন্ধানে বিএনপির তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে আরিফের বাড়িতে গিয়েছিলেন দলের তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদের স্পিকারের দায়িত্বে থাকা অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি আরিফের বাবার কাঁধে হাত রেখে বিচার পাওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
ফরমান আলী আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, "মেজর হাফিজ আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, এই হত্যার বিচার একদিন হবে। আজ তাঁর দল ক্ষমতায় এবং তিনি দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্বে রয়েছেন। আমি তাঁর কাছে কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা চাই না, শুধু আমার সন্তান হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই। তিনি আমাকে যে কথা দিয়েছিলেন, আমি আজও সেই কথার অপেক্ষায় আছি।"
মুসলিম মানবাধিকার ও খতমে নবুওয়াত আন্দোলনের অংশ হিসেবে নিহত সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় 'শহীদ আরিফুর রহমান স্মৃতি পরিষদ'-এর পক্ষে বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ ও স্মারকলিপি প্রদান করা হলেও আজও সুরাহা মেলেনি।

আপনার মতামত লিখুন