১৯৬৯ সালের ২১ আগস্ট অস্ট্রেলীয় খ্রিষ্টান উগ্রবাদী ডেনিস মাইকেল রোহানের দেওয়া আগুনে পুড়েছিল ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল-আকসা মসজিদ। ধ্বংস হয়েছিল ঐতিহাসিক সালাহউদ্দিন মিনবার। সেই বর্বরোচিত ঘটনার ৫৭ বছর অতিক্রম হলেও আজ আল-আকসার ওপর হুমকি কমেেনি, বরং বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ইসরায়েলি রাজনৈতিক দল ও চরমপন্থি উগ্রবাদীদের প্রত্যক্ষ সমর্থনে আল-আকসার ইসলামিক অস্তিত্ব মুছে দিয়ে তথাকথিত ‘তৃতীয় মন্দির’ নির্মাণের মহড়া চলছে।
আজ থেকে ঠিক ৫৭ বছর আগে, ১৯৬৯ সালের ২১ আগস্ট গোটা মুসলিম বিশ্ব এক স্তম্ভিত ও হৃদয়বিদারক সংবাদে জেগে উঠেছিল—ইসলামের প্রথম ক্বিবলা ও বিশ্ব মুসলিমের অন্যতম পবিত্র স্থান আল-আকসা মসজিদে আগুন জ্বলছে। তৎকালীন ইসরায়েলি বাহিনীর পূর্ব জেরুজালেম দখলের মাত্র দুই বছর পর এই ন্যক্কারজনক হামলা চালানো হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডে শত শত বছরের প্রাচীন সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর ঐতিহাসিক মিনবারসহ মসজিদের বিস্তর অংশ ভস্মীভূত হয়। সেই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মাঝে তুমুল বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে ‘অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন’ (OIC) গঠনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদও তৎকালীন সময়ে এই পবিত্র স্থানে অগ্নিকাণ্ডকে মানবতার অন্যতম সম্মানিত উপাসনালয়ের চরম অবমাননা হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল।
তবে ৫৭ বছর পর আজকের এই বার্ষিকী কেবল অতীত ইতিহাস স্মরণের দিন নয়, বরং বিশ্ব মুসলিমের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আল-আকসার ওপর যে হুমকি তা কোনো কাল্পনিক ভয় নয়। উগ্র ইহুদিবাদী ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের মাধ্যমে মসজিদের ঐতিহাসিক ও ইসলামিক রূপ সম্পূর্ণ বদলে ফেলার ষড়যন্ত্র এখন প্রকাশ্য।
সরকার সমর্থিত চক্রান্ত ও ‘স্টেটাস কো’ লঙ্ঘন
দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক চুক্তি বা 'স্টেটাস কো' অনুযায়ী, আল-আকসা চত্বরের প্রশাসন ইসলামিক ওয়াকফ ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হয় এবং ইসরায়েল কেবল প্রবেশদ্বার ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে। অমুসলিমরা পরিদর্শন করতে পারলেও সেখানে কোনো প্রকার অমুসলিম প্রার্থনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ইসরায়েলি কট্টরপন্থি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং উগ্রবাদীরা ক্রমাগত এই নিয়ম লংঘন করে আসছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব চরমপন্থি চিন্তা এখন আর কোনো সাধারণ উগ্র গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা স্বয়ং ইসরায়েলি সরকারের ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ও চরম বর্ণবাদী নেতা ইতামার বেন-গ্যভির একের পর এক উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের সাথে নিয়ে আল-আকসায় অনুপ্রবেশ করছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেন যে ইহুদিদের আল-আকসায় প্রার্থনা করার অনুমতি দেওয়া উচিত এবং তার ইচ্ছা হলে তিনি সেখানে একটি সিনাগগ (ইহুদি উপাসনালয়) নির্মাণ করবেন। পরবর্তীতে ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও তিনি একাধিকবার অনুসারীদের নিয়ে আল-আকসায় উসকানিমূলক মহড়া দিয়েছেন এবং প্রকাশ্য প্রার্থনা পরিচালনা করে বলেছেন, "ইহুদিরা এখন অনুভবে ও বাস্তবে এই জায়গার মালিক।"
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর দপ্তর মুখে আন্তর্জাতিক চুক্তি বজায় রাখার কথা বললেও বাস্তবে বেন-গ্যভিরের মতো উগ্র মন্ত্রীদের অপকর্মের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
মুসলিম বিশ্বের নিষ্ক্রিয়তা ও জর্ডানের সতর্কতা
পবিত্র স্থানের তত্ত্বাবধায়ক রাষ্ট্র জর্ডানের বাদশা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইমান সাফাদি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বারবার সতর্ক করে বলেছেন যে, আল-আকসার বর্তমান অবস্থান পরিবর্তন করার যেকোনো চেষ্টা আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক ধর্মীয় যুদ্ধ ডেকে আনবে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জর্ডান বা অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলো কূটনৈতিক সতর্কবার্তার বাইরে কার্যকর কোনো শক্ত পদক্ষেপ না নেওয়ায় ইসরায়েল আরও বেশি সাহসী হয়ে উঠেছে। গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর সংঘটিত নির্মম গণহত্যার মুখেও যখন মুসলিম বিশ্বের পরাশক্তিগুলো কোনো কার্যকর সামরিক বা রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি, তখন ইসরায়েলি উগ্রবাদীরা মনে করছে আল-আকসা দখল করে নিলেও তাদের জবাবদিহি করতে হবে না।
ফিলিস্তিনি ঐতিহ্য ও ইতিহাস মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র
ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার সতর্ক করে আসছে যে, চরমপন্থি বসতি স্থাপনকারী সংগঠনগুলো আল-আকসা ভেঙে ফেলে সেখানে ‘তৃতীয় মন্দির’ নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগোচ্ছে। এটি কেবল একটি মসজিদ বা ভবনের ওপর আক্রমণ নয়, বরং এটি জেরুজালেমের শত শত বছরের ইসলামিক ও ফিলিস্তিনি ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার উগ্র ইহুদিবাদী (Zionist) এজেন্ডার অংশ।
সুতরাং, ১৯৬৯ সালের অগ্নিকাণ্ডের ৫৭তম বার্ষিকী কেবল শোক প্রকাশের দিন নয়; এটি আল-আকসা রক্ষায় উম্মাহর জাগ্রত হওয়া এবং এই ঐতিহাসিক চক্রান্তের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার এক চূড়ান্ত আহ্বান।
বিষয় : আল-আকসা

শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬
১৯৬৯ সালের ২১ আগস্ট অস্ট্রেলীয় খ্রিষ্টান উগ্রবাদী ডেনিস মাইকেল রোহানের দেওয়া আগুনে পুড়েছিল ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল-আকসা মসজিদ। ধ্বংস হয়েছিল ঐতিহাসিক সালাহউদ্দিন মিনবার। সেই বর্বরোচিত ঘটনার ৫৭ বছর অতিক্রম হলেও আজ আল-আকসার ওপর হুমকি কমেেনি, বরং বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ইসরায়েলি রাজনৈতিক দল ও চরমপন্থি উগ্রবাদীদের প্রত্যক্ষ সমর্থনে আল-আকসার ইসলামিক অস্তিত্ব মুছে দিয়ে তথাকথিত ‘তৃতীয় মন্দির’ নির্মাণের মহড়া চলছে।
আজ থেকে ঠিক ৫৭ বছর আগে, ১৯৬৯ সালের ২১ আগস্ট গোটা মুসলিম বিশ্ব এক স্তম্ভিত ও হৃদয়বিদারক সংবাদে জেগে উঠেছিল—ইসলামের প্রথম ক্বিবলা ও বিশ্ব মুসলিমের অন্যতম পবিত্র স্থান আল-আকসা মসজিদে আগুন জ্বলছে। তৎকালীন ইসরায়েলি বাহিনীর পূর্ব জেরুজালেম দখলের মাত্র দুই বছর পর এই ন্যক্কারজনক হামলা চালানো হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডে শত শত বছরের প্রাচীন সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর ঐতিহাসিক মিনবারসহ মসজিদের বিস্তর অংশ ভস্মীভূত হয়। সেই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মাঝে তুমুল বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে ‘অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন’ (OIC) গঠনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদও তৎকালীন সময়ে এই পবিত্র স্থানে অগ্নিকাণ্ডকে মানবতার অন্যতম সম্মানিত উপাসনালয়ের চরম অবমাননা হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল।
তবে ৫৭ বছর পর আজকের এই বার্ষিকী কেবল অতীত ইতিহাস স্মরণের দিন নয়, বরং বিশ্ব মুসলিমের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আল-আকসার ওপর যে হুমকি তা কোনো কাল্পনিক ভয় নয়। উগ্র ইহুদিবাদী ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের মাধ্যমে মসজিদের ঐতিহাসিক ও ইসলামিক রূপ সম্পূর্ণ বদলে ফেলার ষড়যন্ত্র এখন প্রকাশ্য।
সরকার সমর্থিত চক্রান্ত ও ‘স্টেটাস কো’ লঙ্ঘন
দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক চুক্তি বা 'স্টেটাস কো' অনুযায়ী, আল-আকসা চত্বরের প্রশাসন ইসলামিক ওয়াকফ ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হয় এবং ইসরায়েল কেবল প্রবেশদ্বার ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে। অমুসলিমরা পরিদর্শন করতে পারলেও সেখানে কোনো প্রকার অমুসলিম প্রার্থনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ইসরায়েলি কট্টরপন্থি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং উগ্রবাদীরা ক্রমাগত এই নিয়ম লংঘন করে আসছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব চরমপন্থি চিন্তা এখন আর কোনো সাধারণ উগ্র গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা স্বয়ং ইসরায়েলি সরকারের ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ও চরম বর্ণবাদী নেতা ইতামার বেন-গ্যভির একের পর এক উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের সাথে নিয়ে আল-আকসায় অনুপ্রবেশ করছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেন যে ইহুদিদের আল-আকসায় প্রার্থনা করার অনুমতি দেওয়া উচিত এবং তার ইচ্ছা হলে তিনি সেখানে একটি সিনাগগ (ইহুদি উপাসনালয়) নির্মাণ করবেন। পরবর্তীতে ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও তিনি একাধিকবার অনুসারীদের নিয়ে আল-আকসায় উসকানিমূলক মহড়া দিয়েছেন এবং প্রকাশ্য প্রার্থনা পরিচালনা করে বলেছেন, "ইহুদিরা এখন অনুভবে ও বাস্তবে এই জায়গার মালিক।"
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর দপ্তর মুখে আন্তর্জাতিক চুক্তি বজায় রাখার কথা বললেও বাস্তবে বেন-গ্যভিরের মতো উগ্র মন্ত্রীদের অপকর্মের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
মুসলিম বিশ্বের নিষ্ক্রিয়তা ও জর্ডানের সতর্কতা
পবিত্র স্থানের তত্ত্বাবধায়ক রাষ্ট্র জর্ডানের বাদশা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইমান সাফাদি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বারবার সতর্ক করে বলেছেন যে, আল-আকসার বর্তমান অবস্থান পরিবর্তন করার যেকোনো চেষ্টা আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক ধর্মীয় যুদ্ধ ডেকে আনবে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জর্ডান বা অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলো কূটনৈতিক সতর্কবার্তার বাইরে কার্যকর কোনো শক্ত পদক্ষেপ না নেওয়ায় ইসরায়েল আরও বেশি সাহসী হয়ে উঠেছে। গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর সংঘটিত নির্মম গণহত্যার মুখেও যখন মুসলিম বিশ্বের পরাশক্তিগুলো কোনো কার্যকর সামরিক বা রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি, তখন ইসরায়েলি উগ্রবাদীরা মনে করছে আল-আকসা দখল করে নিলেও তাদের জবাবদিহি করতে হবে না।
ফিলিস্তিনি ঐতিহ্য ও ইতিহাস মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র
ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার সতর্ক করে আসছে যে, চরমপন্থি বসতি স্থাপনকারী সংগঠনগুলো আল-আকসা ভেঙে ফেলে সেখানে ‘তৃতীয় মন্দির’ নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগোচ্ছে। এটি কেবল একটি মসজিদ বা ভবনের ওপর আক্রমণ নয়, বরং এটি জেরুজালেমের শত শত বছরের ইসলামিক ও ফিলিস্তিনি ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার উগ্র ইহুদিবাদী (Zionist) এজেন্ডার অংশ।
সুতরাং, ১৯৬৯ সালের অগ্নিকাণ্ডের ৫৭তম বার্ষিকী কেবল শোক প্রকাশের দিন নয়; এটি আল-আকসা রক্ষায় উম্মাহর জাগ্রত হওয়া এবং এই ঐতিহাসিক চক্রান্তের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার এক চূড়ান্ত আহ্বান।

আপনার মতামত লিখুন