১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে বসনিয়ার শ্রেব্রেৎসায় বোসনিয়াক মুসলিমদের ওপর সংঘটিত ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও সাজাপ্রাপ্ত সায়বেরীয় যুদ্ধাপরাধী রাতকো মলাদিচ আর নেই। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে আমৃত্যু কারাদণ্ড ভোগরত অবস্থায় তার জীবনাবসান ঘটে।
সাবেক যুগোস্লাভিয়ার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICTY) ২০১৭ সালে মলাদিচকে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধ আইন লঙ্ঘনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে মলাদিচকে বসনীয় মুসলিম বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্যাতন, গণহত্যার মাধ্যমে নিধন, হত্যা, বিতাড়ন এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার মূল কারিগর হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। এ ছাড়া দীর্ঘ সারায়েভো অবরোধের সময় নিরীহ বেসামরিক মানুষদের ওপর স্নাইপার ও কামানের গোলা বর্ষণ করে নির্বিচারে হত্যা এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের জিম্মি করার অপরাধেও তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
মুসলিম নিধনে তার বীভৎস ও বর্বরোচিত ভূমিকার জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সে "বসনিয়ার কসাই" হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে জাতিসংঘের আদালতের সুনির্দিষ্ট রায় এবং হাজারো প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সার্বিয়া এবং বসনিয়ার সায়বীয় নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে উগ্র চরমপন্থীদের একটি অংশ তাকে এখনও 'নায়ক' হিসেবে আখ্যা দেয়, যা উগ্র হিন্দুত্ববাদী বা বর্ণবাদী মতাদর্শের মতোই চরম মানবাধিকার ও মানবতাবিরোধী মানসিকতার বহির্প্রকাশ।
১৬ বছর আত্মগোপনে থাকা যুদ্ধাপরাধী
রাতকো মলাদিচ ১৯৪২ সালে পূর্ব বসনিয়ার কালিনোভিকের কাছে বোজানোভিচি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বেলগ্রেডে সামরিক শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি যুগোস্লাভ পিপলস আর্মিতে (JNA) যোগ দেন। ১৯৯২ সালের মে মাসে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় গঠিত নতুন সায়বীয় সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সেই পদে বহাল থাকেন।
১৯৯৫ সালের ২৪ জুলাই ট্রাইব্যুনাল প্রথম তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করে। কিন্তু যুদ্ধ শেষের পর মলাদিচ সার্বিয়ায় পালিয়ে যায় এবং প্রায় ১৬ বছর আত্মগোপনে থাকে। সার্বিয়া সরকার তাকে খুঁজে পাচ্ছে না বলে দাবি করলেও, মূলত তৎকালীন সায়বীয় প্রশাসনের উগ্রপন্থীদের ছত্রচ্ছায়াতেই সে সুরক্ষিত ছিল। পরবর্তীতে একাধিক ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, ফেরারি থাকা অবস্থাতেও সে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াত এবং লোকজনের সঙ্গে উদযাপন করত।
অবশেষে ২০১১ সালের ২৬ মে সার্বিয়ার জ্রেঞ্জানিনের কাছে লাজারেভো গ্রাম থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং ৩১ মে হেগের ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তর করা হয়। ২০১২ সালের ১৬ মে তার বিচার শুরু হলে সে সমস্ত অপরাধ অস্বীকার করে। তবে ইতিহাস তাকে ক্ষমা করেনি—১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে ৮,৩৭২ জন নিরীহ বসনীয় মুসলিমকে গণহত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে বিশ্ববাসী তাকে চিরকাল এক অভিশপ্ত ও নির্মম জল্লাদ হিসেবেই মনে রাখবে।
বিষয় : বসনিয়া

শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ আগস্ট ২০২৬
১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে বসনিয়ার শ্রেব্রেৎসায় বোসনিয়াক মুসলিমদের ওপর সংঘটিত ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও সাজাপ্রাপ্ত সায়বেরীয় যুদ্ধাপরাধী রাতকো মলাদিচ আর নেই। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে আমৃত্যু কারাদণ্ড ভোগরত অবস্থায় তার জীবনাবসান ঘটে।
সাবেক যুগোস্লাভিয়ার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICTY) ২০১৭ সালে মলাদিচকে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধ আইন লঙ্ঘনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে মলাদিচকে বসনীয় মুসলিম বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্যাতন, গণহত্যার মাধ্যমে নিধন, হত্যা, বিতাড়ন এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার মূল কারিগর হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। এ ছাড়া দীর্ঘ সারায়েভো অবরোধের সময় নিরীহ বেসামরিক মানুষদের ওপর স্নাইপার ও কামানের গোলা বর্ষণ করে নির্বিচারে হত্যা এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের জিম্মি করার অপরাধেও তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
মুসলিম নিধনে তার বীভৎস ও বর্বরোচিত ভূমিকার জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সে "বসনিয়ার কসাই" হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে জাতিসংঘের আদালতের সুনির্দিষ্ট রায় এবং হাজারো প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সার্বিয়া এবং বসনিয়ার সায়বীয় নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে উগ্র চরমপন্থীদের একটি অংশ তাকে এখনও 'নায়ক' হিসেবে আখ্যা দেয়, যা উগ্র হিন্দুত্ববাদী বা বর্ণবাদী মতাদর্শের মতোই চরম মানবাধিকার ও মানবতাবিরোধী মানসিকতার বহির্প্রকাশ।
১৬ বছর আত্মগোপনে থাকা যুদ্ধাপরাধী
রাতকো মলাদিচ ১৯৪২ সালে পূর্ব বসনিয়ার কালিনোভিকের কাছে বোজানোভিচি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বেলগ্রেডে সামরিক শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি যুগোস্লাভ পিপলস আর্মিতে (JNA) যোগ দেন। ১৯৯২ সালের মে মাসে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় গঠিত নতুন সায়বীয় সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সেই পদে বহাল থাকেন।
১৯৯৫ সালের ২৪ জুলাই ট্রাইব্যুনাল প্রথম তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করে। কিন্তু যুদ্ধ শেষের পর মলাদিচ সার্বিয়ায় পালিয়ে যায় এবং প্রায় ১৬ বছর আত্মগোপনে থাকে। সার্বিয়া সরকার তাকে খুঁজে পাচ্ছে না বলে দাবি করলেও, মূলত তৎকালীন সায়বীয় প্রশাসনের উগ্রপন্থীদের ছত্রচ্ছায়াতেই সে সুরক্ষিত ছিল। পরবর্তীতে একাধিক ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, ফেরারি থাকা অবস্থাতেও সে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াত এবং লোকজনের সঙ্গে উদযাপন করত।
অবশেষে ২০১১ সালের ২৬ মে সার্বিয়ার জ্রেঞ্জানিনের কাছে লাজারেভো গ্রাম থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং ৩১ মে হেগের ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তর করা হয়। ২০১২ সালের ১৬ মে তার বিচার শুরু হলে সে সমস্ত অপরাধ অস্বীকার করে। তবে ইতিহাস তাকে ক্ষমা করেনি—১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে ৮,৩৭২ জন নিরীহ বসনীয় মুসলিমকে গণহত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে বিশ্ববাসী তাকে চিরকাল এক অভিশপ্ত ও নির্মম জল্লাদ হিসেবেই মনে রাখবে।

আপনার মতামত লিখুন