ভারতের উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনের থানো এলাকায় ঐতিহ্যবাহী জামে মসজিদ সিল করে দেওয়ার পর সেখানে হিন্দুত্ববাদী দলগুলোর যজ্ঞ অনুষ্ঠান ও উসকানিমূলক স্লোগানকে কেন্দ্র করে তীব্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মুসৌরি-দেরাদুন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (MDDA) গত ১ জুন (সোমবার) মসজিদটি সিল করে দেয়। এরপরই কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী কর্মীরা সেখানে জড়ো হয়ে ‘মসজিদ স্বাহা’ স্লোগান দিয়ে যজ্ঞ সম্পন্ন করে, যা স্থানীয় সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি সৃষ্টি করেছে।
ভারতের উত্তরাখণ্ড ও উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে মসজিদ ও ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে চলমান বিরোধের ধারাবাহিকতায় এবার নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেরাদুনের থানো এলাকা। স্থানীয় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর—বিশেষ করে ‘কালী সেনা’র লাগাতার চাপের মুখে পড়ে গত সোমবার থানোর জামে মসজিদটি সিল গালা করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। কালী সেনার রাজ্য আহ্বায়ক ভূপেশ জোশী এর আগে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, মন্দিরের কাছে কোনো মসজিদ থাকতে পারে না। তিনি এই মসজিদটিকে একটি "অবৈধ দখলদারিত্ব" হিসেবে আখ্যায়িত করে এটি খালি করার জন্য ১ জুনের সময়সীমা (ডেডলাইন) বেঁধে দিয়েছিলেন।
বিতর্কের সূত্রপাত
সমগ্র বিতর্কটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি অননুমোদিত কক্ষ নির্মাণের অভিযোগ। এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তরাখণ্ড হাইকোর্ট জামে মসজিদ সোসাইটির দায়ের করা একটি আবেদন খারিজ করে দিয়ে জানিয়েছিল যে, আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কোনো আইনি স্বস্তি বা ছাড় দেওয়া যায় না, তবে তারা চাইলে নিয়মানুযায়ী আবেদন করতে পারে। বজরং দল এবং কালী সেনার মতো হিন্দু সংগঠনগুলোর দাবি, প্রশাসন কেবল সরকারি জমি, বিশেষ করে মন্দিরের চারপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের তীব্র আপত্তি ও ক্ষোভ
তবে প্রশাসন যেভাবে পুরো মসজিদটি সিল করেছে, তার বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি ও ক্ষোভ জানিয়েছে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়। তাদের দাবি, আদালতের নির্দেশ এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া নোটিশটি ছিল কেবল ২০২৩ সালে মসজিদের ভেতরে নির্মিত একটি নির্দিষ্ট অননুমোদিত কক্ষের (আনুমানিক ২০×৪০ ফুট) বিরুদ্ধে। কিন্তু প্রশাসন সেই নির্দিষ্ট অংশটি বাদে পুরো মসজিদ কমপ্লেক্সটিই সিল করে দিয়েছে, যার ফলে স্থানীয় মুসলিমদের নামাজ পড়ার বা ইবাদত করার অধিকার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। মসজিদ কমিটির প্রতিনিধিদের অভিযোগ, তাদের নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার বা আইনি উপায়ে বিষয়টির সুরাহা করার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ কোনোটিই দেওয়া হয়নি।
মসজিদের সামনে যজ্ঞ ও উসকানিমূলক স্লোগান
মসজিদটি সিল করার পরপরই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যরা দলবল নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়। তারা মসজিদের সামনেই একটি বৈদিক ‘হব্বন’ বা ‘যজ্ঞ’ অনুষ্ঠান পরিচালনা করে এবং উচ্চস্বরে "মসজিদ স্বাহা" (মসজিদ ধ্বংস হোক বা বিলীন হোক)-র মতো উসকানিমূলক ও আপত্তিকর স্লোগান দিতে থাকে। এই ঘটনার বেশ কিছু ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় মুসলিমদের অভিযোগ, তাদের মধ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিরাপত্তাহীনতা ও ভয় তৈরি করতেই এই উন্মাদনা ছড়ানো হচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ ও সামাজিক বিভাজন
এই ঘটনাটি উত্তরাখণ্ড ও উত্তরপ্রদেশে মসজিদগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক গভীর ও পদ্ধতিগত সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ। হিন্দু সংগঠনগুলো একে ‘অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযান’ বলে দাবি করলেও, মুসলিম নেতৃবৃন্দের স্পষ্ট অভিযোগ—প্রশাসন পুরোপুরি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে। মুসলিম পক্ষ থেকে এই অন্যায্য সিলের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে থানো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ছোট ছোট শহর ও গ্রামগুলোতে এভাবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিস্তারে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এলাকার শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে এবং জনগণের আস্থা ফেরাতে প্রশাসনকে পক্ষপাতহীনভাবে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।
উত্তরাখণ্ডে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তথাকথিত "ল্যান্ড জিহাদ" বা সরকারি জমি দখলের অভিযোগ তুলে একাধিক ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙা ও সিলগালা করার ঘটনা ঘটেছে। থানোর এই জামে মসজিদটির একটি অংশ সম্প্রসারণ নিয়ে গত বছর থেকেই স্থানীয় হিন্দুত্ববাদী দলগুলো জনমত গঠন ও প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছিল, যা গত ১ জুনের ঘটনার মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ নেয়।
ধর্মীয় উপাসনালয় সংক্রান্ত যেকোনো সংবেদনশীল বিরোধের নিষ্পত্তি কেবল মাত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ আইনি যাচাই-বাছাই এবং উভয় পক্ষের সমান অধিকার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে উস্কানিমূলক স্লোগান দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। এলাকার শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রশাসনের এখন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা জরুরি।
বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুন ২০২৬
ভারতের উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনের থানো এলাকায় ঐতিহ্যবাহী জামে মসজিদ সিল করে দেওয়ার পর সেখানে হিন্দুত্ববাদী দলগুলোর যজ্ঞ অনুষ্ঠান ও উসকানিমূলক স্লোগানকে কেন্দ্র করে তীব্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মুসৌরি-দেরাদুন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (MDDA) গত ১ জুন (সোমবার) মসজিদটি সিল করে দেয়। এরপরই কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী কর্মীরা সেখানে জড়ো হয়ে ‘মসজিদ স্বাহা’ স্লোগান দিয়ে যজ্ঞ সম্পন্ন করে, যা স্থানীয় সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি সৃষ্টি করেছে।
ভারতের উত্তরাখণ্ড ও উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে মসজিদ ও ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে চলমান বিরোধের ধারাবাহিকতায় এবার নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেরাদুনের থানো এলাকা। স্থানীয় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর—বিশেষ করে ‘কালী সেনা’র লাগাতার চাপের মুখে পড়ে গত সোমবার থানোর জামে মসজিদটি সিল গালা করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। কালী সেনার রাজ্য আহ্বায়ক ভূপেশ জোশী এর আগে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, মন্দিরের কাছে কোনো মসজিদ থাকতে পারে না। তিনি এই মসজিদটিকে একটি "অবৈধ দখলদারিত্ব" হিসেবে আখ্যায়িত করে এটি খালি করার জন্য ১ জুনের সময়সীমা (ডেডলাইন) বেঁধে দিয়েছিলেন।
বিতর্কের সূত্রপাত
সমগ্র বিতর্কটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি অননুমোদিত কক্ষ নির্মাণের অভিযোগ। এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তরাখণ্ড হাইকোর্ট জামে মসজিদ সোসাইটির দায়ের করা একটি আবেদন খারিজ করে দিয়ে জানিয়েছিল যে, আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কোনো আইনি স্বস্তি বা ছাড় দেওয়া যায় না, তবে তারা চাইলে নিয়মানুযায়ী আবেদন করতে পারে। বজরং দল এবং কালী সেনার মতো হিন্দু সংগঠনগুলোর দাবি, প্রশাসন কেবল সরকারি জমি, বিশেষ করে মন্দিরের চারপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের তীব্র আপত্তি ও ক্ষোভ
তবে প্রশাসন যেভাবে পুরো মসজিদটি সিল করেছে, তার বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি ও ক্ষোভ জানিয়েছে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়। তাদের দাবি, আদালতের নির্দেশ এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া নোটিশটি ছিল কেবল ২০২৩ সালে মসজিদের ভেতরে নির্মিত একটি নির্দিষ্ট অননুমোদিত কক্ষের (আনুমানিক ২০×৪০ ফুট) বিরুদ্ধে। কিন্তু প্রশাসন সেই নির্দিষ্ট অংশটি বাদে পুরো মসজিদ কমপ্লেক্সটিই সিল করে দিয়েছে, যার ফলে স্থানীয় মুসলিমদের নামাজ পড়ার বা ইবাদত করার অধিকার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। মসজিদ কমিটির প্রতিনিধিদের অভিযোগ, তাদের নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার বা আইনি উপায়ে বিষয়টির সুরাহা করার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ কোনোটিই দেওয়া হয়নি।
মসজিদের সামনে যজ্ঞ ও উসকানিমূলক স্লোগান
মসজিদটি সিল করার পরপরই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যরা দলবল নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়। তারা মসজিদের সামনেই একটি বৈদিক ‘হব্বন’ বা ‘যজ্ঞ’ অনুষ্ঠান পরিচালনা করে এবং উচ্চস্বরে "মসজিদ স্বাহা" (মসজিদ ধ্বংস হোক বা বিলীন হোক)-র মতো উসকানিমূলক ও আপত্তিকর স্লোগান দিতে থাকে। এই ঘটনার বেশ কিছু ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় মুসলিমদের অভিযোগ, তাদের মধ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিরাপত্তাহীনতা ও ভয় তৈরি করতেই এই উন্মাদনা ছড়ানো হচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ ও সামাজিক বিভাজন
এই ঘটনাটি উত্তরাখণ্ড ও উত্তরপ্রদেশে মসজিদগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক গভীর ও পদ্ধতিগত সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ। হিন্দু সংগঠনগুলো একে ‘অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযান’ বলে দাবি করলেও, মুসলিম নেতৃবৃন্দের স্পষ্ট অভিযোগ—প্রশাসন পুরোপুরি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে। মুসলিম পক্ষ থেকে এই অন্যায্য সিলের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে থানো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ছোট ছোট শহর ও গ্রামগুলোতে এভাবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিস্তারে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এলাকার শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে এবং জনগণের আস্থা ফেরাতে প্রশাসনকে পক্ষপাতহীনভাবে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।
উত্তরাখণ্ডে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তথাকথিত "ল্যান্ড জিহাদ" বা সরকারি জমি দখলের অভিযোগ তুলে একাধিক ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙা ও সিলগালা করার ঘটনা ঘটেছে। থানোর এই জামে মসজিদটির একটি অংশ সম্প্রসারণ নিয়ে গত বছর থেকেই স্থানীয় হিন্দুত্ববাদী দলগুলো জনমত গঠন ও প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছিল, যা গত ১ জুনের ঘটনার মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ নেয়।
ধর্মীয় উপাসনালয় সংক্রান্ত যেকোনো সংবেদনশীল বিরোধের নিষ্পত্তি কেবল মাত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ আইনি যাচাই-বাছাই এবং উভয় পক্ষের সমান অধিকার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে উস্কানিমূলক স্লোগান দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। এলাকার শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রশাসনের এখন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন