বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
কওমী টাইমস

সহপাঠীদের সাথে খাবার ভাগ করার ক্লাসরুমের ঘটনাকে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর উসকানিতে সাম্প্রদায়িক রূপ; মুসলিম অধ্যুষিত জেলায় একটি স্কুলের পাঁচ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের উদ্যোগ ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে

টিফিনে মাংস আনার অপরাধ: আসামে মুসলিম স্কুলছাত্র ও তার বিধবা মা গ্রেপ্তার, ৫ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের চক্রান্ত



টিফিনে মাংস আনার অপরাধ: আসামে মুসলিম স্কুলছাত্র ও তার বিধবা মা গ্রেপ্তার, ৫ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের চক্রান্ত

ভারতের আসামে উগ্র ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সংখ্যালঘু বিদ্বেষ এবার স্পর্শ করল অবুজ স্কুলশিশুদেরও। স্কুল টিফিনে গরুর মাংস নিয়ে আসার এবং তা সহপাঠীদের সাথে ভাগ করে খাওয়ার অজুহাতে এক নাবালক মুসলিম ছাত্র এবং তার অসহায় বিধবা মাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ গোয়ালপাড়া জেলার কৃষ্ণাই থানা এলাকার একটি স্কুলে ঘটা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় উগ্র ডানপন্থী সংগঠনগুলোর উসকানিতে চরম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়েছে। একই সাথে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে ওই নাবালকসহ মোট ৫ জন মুসলিম শিক্ষার্থীকে স্কুল থেকে চূড়ান্ত বহিষ্কারের চক্রান্ত চলছে, যা তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছে।

শ্রেণীকক্ষের একটি অতি সাধারণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির নোংরা রূপ প্রকাশ পেল আসামের গোয়ালপাড়া জেলায়। নবম শ্রেণীর ৫ জন মুসলিম শিক্ষার্থী দুপুরের খাবারে তাদের বাড়ি থেকে আনা খাবার দুই হিন্দু সহপাঠীর সাথে ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল—এমন একটি সরল বিষয়কে পুঁজি করে পুরো এলাকায় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের চেষ্টা চালাচ্ছে কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো।

যে বিষয়টি স্কুল কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণভাবে সমাধান করতে পারত, তা ক্যাম্পাস গেটের বাইরে নিয়ে গিয়ে বিশাল সাম্প্রদায়িক ইস্যুতে রূপ দেওয়া হয়। স্থানীয় উগ্রপন্থী সংগঠন ও কিছু গ্রামবাসীকে উসকে দিয়ে ঘটনাটিকে থানা-পুলিশ পর্যন্ত টেনে নেওয়া হয়। দুই হিন্দু শিক্ষার্থীর অভিভাবকের পক্ষ থেকে কৃষ্ণাই থানায় অভিযোগ দায়ের করার পর পুলিশ দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওই নাবালক মুসলিম ছাত্রকে আটক করে এবং তার বিধবা মাকে গ্রেপ্তার করে। জানা গেছে, স্বামী মারা যাওয়ার পর ওই নারী একটি স্থানীয় স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে অত্যন্ত কষ্ট করে তার এতিম সন্তানকে বড় করছিলেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার মতো কঠোর ধারা যুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্য ৪ জন মুসলিম শিক্ষার্থীকেও পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে জেলা কমিশনার এবং পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্কুল পরিদর্শন করেন। তবে উগ্রপন্থীদের চাপের মুখে প্রশাসন পক্ষপাতমূলক অবস্থান নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জেলা কর্তৃপক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছে যে, স্কুলে শিক্ষার্থীদের আনা খাবারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে, যেখানে কেবল নিরামিষ খাবার এবং বড়জোর ডিম আনার অনুমতি দেওয়া হবে।

এদিকে, ঘটনাটি আরও উদ্বেগজনক মোড় নেয় গত রবিবার। স্কুল পরিচালনা উন্নয়ন কমিটি (SMDC) এবং বিভিন্ন উগ্রপন্থী স্থানীয় সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধূলিসাৎ করে ওই ৫ জন মুসলিম শিক্ষার্থীকে স্কুল থেকে বহিষ্কারের পক্ষে একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগামী মঙ্গলবার SMDC-এর আনুষ্ঠানিক বৈঠকে এই বহিষ্কারের প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।

মানবাধিকার কর্মী এবং সচেতন নাগরিক সমাজ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, শিশুদের খাদ্যাভ্যাস এবং সহপাঠীদের সাথে খাবার ভাগাভাগি করার মতো একটি নিষ্পাপ বিষয়কে কেন্দ্র করে যেভাবে পুলিশ প্রশাসন ও উগ্রবাদীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তা ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। শিশুদের শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার এই চক্রান্ত এবং একটি অসহায় বিধবা পরিবারকে হেনস্থার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে তাদের মুক্তি ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬


টিফিনে মাংস আনার অপরাধ: আসামে মুসলিম স্কুলছাত্র ও তার বিধবা মা গ্রেপ্তার, ৫ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের চক্রান্ত

প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬

featured Image

ভারতের আসামে উগ্র ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সংখ্যালঘু বিদ্বেষ এবার স্পর্শ করল অবুজ স্কুলশিশুদেরও। স্কুল টিফিনে গরুর মাংস নিয়ে আসার এবং তা সহপাঠীদের সাথে ভাগ করে খাওয়ার অজুহাতে এক নাবালক মুসলিম ছাত্র এবং তার অসহায় বিধবা মাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ গোয়ালপাড়া জেলার কৃষ্ণাই থানা এলাকার একটি স্কুলে ঘটা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় উগ্র ডানপন্থী সংগঠনগুলোর উসকানিতে চরম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়েছে। একই সাথে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে ওই নাবালকসহ মোট ৫ জন মুসলিম শিক্ষার্থীকে স্কুল থেকে চূড়ান্ত বহিষ্কারের চক্রান্ত চলছে, যা তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছে।

শ্রেণীকক্ষের একটি অতি সাধারণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির নোংরা রূপ প্রকাশ পেল আসামের গোয়ালপাড়া জেলায়। নবম শ্রেণীর ৫ জন মুসলিম শিক্ষার্থী দুপুরের খাবারে তাদের বাড়ি থেকে আনা খাবার দুই হিন্দু সহপাঠীর সাথে ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল—এমন একটি সরল বিষয়কে পুঁজি করে পুরো এলাকায় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের চেষ্টা চালাচ্ছে কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো।

যে বিষয়টি স্কুল কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণভাবে সমাধান করতে পারত, তা ক্যাম্পাস গেটের বাইরে নিয়ে গিয়ে বিশাল সাম্প্রদায়িক ইস্যুতে রূপ দেওয়া হয়। স্থানীয় উগ্রপন্থী সংগঠন ও কিছু গ্রামবাসীকে উসকে দিয়ে ঘটনাটিকে থানা-পুলিশ পর্যন্ত টেনে নেওয়া হয়। দুই হিন্দু শিক্ষার্থীর অভিভাবকের পক্ষ থেকে কৃষ্ণাই থানায় অভিযোগ দায়ের করার পর পুলিশ দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওই নাবালক মুসলিম ছাত্রকে আটক করে এবং তার বিধবা মাকে গ্রেপ্তার করে। জানা গেছে, স্বামী মারা যাওয়ার পর ওই নারী একটি স্থানীয় স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে অত্যন্ত কষ্ট করে তার এতিম সন্তানকে বড় করছিলেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার মতো কঠোর ধারা যুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্য ৪ জন মুসলিম শিক্ষার্থীকেও পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে জেলা কমিশনার এবং পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্কুল পরিদর্শন করেন। তবে উগ্রপন্থীদের চাপের মুখে প্রশাসন পক্ষপাতমূলক অবস্থান নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জেলা কর্তৃপক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছে যে, স্কুলে শিক্ষার্থীদের আনা খাবারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে, যেখানে কেবল নিরামিষ খাবার এবং বড়জোর ডিম আনার অনুমতি দেওয়া হবে।

এদিকে, ঘটনাটি আরও উদ্বেগজনক মোড় নেয় গত রবিবার। স্কুল পরিচালনা উন্নয়ন কমিটি (SMDC) এবং বিভিন্ন উগ্রপন্থী স্থানীয় সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধূলিসাৎ করে ওই ৫ জন মুসলিম শিক্ষার্থীকে স্কুল থেকে বহিষ্কারের পক্ষে একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগামী মঙ্গলবার SMDC-এর আনুষ্ঠানিক বৈঠকে এই বহিষ্কারের প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।

মানবাধিকার কর্মী এবং সচেতন নাগরিক সমাজ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, শিশুদের খাদ্যাভ্যাস এবং সহপাঠীদের সাথে খাবার ভাগাভাগি করার মতো একটি নিষ্পাপ বিষয়কে কেন্দ্র করে যেভাবে পুলিশ প্রশাসন ও উগ্রবাদীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তা ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। শিশুদের শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার এই চক্রান্ত এবং একটি অসহায় বিধবা পরিবারকে হেনস্থার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে তাদের মুক্তি ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ